শৈশবে দেখা ভাটির জীবন

0

কাকলী তালুকদার:

অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ভোর চারটা থেকে হালের বলদ নিয়ে চলে যেতো আমাদের ঘরের সহযোগী মানুষগুলো। রাতে ঘুমের মাঝে দূরের জমিতে একসাথে হাল ধরা জন্ম কৃষক ‘এই তি তি, বাঁয়ে বাঁয়ে, ডানে ডানে বলে গরুগুলো দিয়ে হাল শুরু করতো।

ভরা শীতের রাতে লুঙ্গি পরে, চাদর জড়িয়ে হাঁটুসম কাদায় চলতো জমিতে হালের কাজ। সকাল আটটা নাগাদ হাল থেকে ফিরে আসতো সবাই। ঘরে একটা ছোট্ট বোতলে ঘানি ভাঙা সরিষার তেল রাখা হতো প্রতিদিন। ১৫/১৬ জন সহযোগী সকালে হাল শেষ করে স্নান করে এই সরিষার তেল গায়ে মেখে নিতো। তারপর সবাই এক সাথে সকালের ভাত খেয়ে উঠানে রোদে বসে হুক্কা টেনে নিজের কাজে চলে যেতো। সেই হুক্কা চুরি করে আমিও টেনেছি অনেকবার। ধোঁয়ার বদলে তামাকের পানি মুখে চলে আসতো, শুরু হয়ে যেতো কাশি।

সহযোগীদের আট মাসের চুক্তিতে নির্দিষ্ট বেতন, লুঙ্গি, গামছা, চাদর আর থাকা খাওয়া ফ্রি দিয়ে নির্ধারণ করা হতো। গ্রামে যাদের বাড়ি ছিলো, তারা রাতে নিজেদের বাড়ি চলে যেতো।

বাবা সবার জন্য লুঙ্গি, গামছা, চাদর কিনে নিয়ে আসতো। যেদিন সবাইকে হাতে তুলে দিতো কাপড়গুলো তাদের মুখে ছোট্ট একটা হাসি দেখতে পেতাম। এটা হয়তো নতুন কাপড়ের আনন্দ। তাদের মাঝে রাখালের বয়স থাকতো ১৫/১৬ বছর। মাঝে মাঝে এর চেয়েও কম। রাখালের কাজ ছিলো ঘরের গরুর যত্ন নেয়া এবং ঘরের সবার খাবারের জন্য মাছ ধরে নিয়ে আসা।

হাওড়ে মাছের যোগান সব সময়ই ভালো ছিলো সেইসময়।
স্বচ্ছল কৃষকের ঘরে ৩০/৪০টি গরু থাকতো। হাল আর গরুর গাড়ি টানার জন্য ষাঁড় গরু কয়েকটিকে বলদ বানিয়ে নেয়া হতো। এক দুইটা রাখা হতো ষাঁড় গরু, দুধের গাভী থাকতো বেশ কয়েকটি।

বোরো ফসল প্রধান হওয়াতে আশ্বিন মাস থেকেই ভাটি অঞ্চলের কর্ম প্রস্তুতি শুরু হতো। আশ্বিন মাসে হাওড়ের পানি নেমে যাওয়ার সময় তুলনামূলক উঁচু জমিগুলো ভেসে উঠতো কিছুটা আগেই। সেগুলোতেই হাল দিয়ে সরিষা চাষ করা হতো। অগ্রহায়ণ/পৌষ মাসে সরিষা ফুলগুলো যখন ফুটতো, আমাদের ভাটি অঞ্চল হয়ে উঠতো হলুদ। ভাটির সেই সৌন্দর্য এখন কেবল অতীত বর্ণনায় উঠে আসতে পারে। সেই সরষে ফুল চুরি করে নিয়ে আসতাম বড়া খাওয়ার জন্য।
পৌষ মাসের আগেই সরিষা কেটে উঠানে রাখা হতো মাড়াই করার জন্য। সরিষা গাছের একটা গন্ধ আছে, বাড়ি তখন সরিষার গন্ধে মৌ মৌ করতো। এখনও সে গন্ধ নাকে এসে লাগে আমার।

পৌষ মাসে সংক্রান্তির আগেই অনেকগুলো কাজ শেষ করতো প্রতিটা কৃষকের ঘরে। সরিষা মাড়াই করে সেই গাছগুলো পুড়িয়ে ছাই বানানো হতো। সেই ছাইয়ের সাথে গোবর মিশিয়ে ছোট ছোট টিক্কা বানানো হতো। সেই টিক্কা দিয়ে তামাকের হুক্কা আর সন্ধ্যায় ধূপ জ্বালানো হতো। ভাটি এলাকায় সেইসময় টিক্কা ছিলো খুব জনপ্রিয়। সরিষার কিছু গাছ শুকিয়ে রাখা হতো জ্বালানির জন্য। জ্বালানি হিসেবে তখন পাটখড়ি, আর ধৈঞ্চাও ব্যবহার হতো। জৈষ্ঠ্য মাসে পাটের জন্য নাইল্যা আর জ্বালানির জন্য ধৈঞ্চা চাষ করা হতো। সারা বছর ধরে কৃষকের যে পাটের চাহিদা, তা নিজের চাষ করা জমি থেকে উঠে আসতো।
এই সবকিছুই কৃষকের জমিতে চাষ করা হতো।
ভাটি অঞ্চলে একমাত্র বোরো ফসলই ছিলো কৃষকের প্রধান ফসল। বোরো আর সাইল ধান খাওয়ার জন্য, লাখাই করা হতো মুড়ির জন্য।
প্রতিটি ধানের বীজ কৃষক নিজে সংরক্ষণ করতো। তখনও ধান ভাঙানোর মেশিন ভাটি এলাকায় জনপ্রিয় হয়নি। তাই ঢেঁকির ঘর ছিলো ভরসা। সেই সময় আমাদের ১০০০/১২০০ মন ধান ঘরে আসতো। ফলন ভালো হলে আরেকটু বেশি।

পৌষ সংক্রান্তির আগেই জমিতে ধানের চারা লাগানো শেষ করতো কৃষক। মনে পড়ে, যেদিন ধানের চারা লাগানো শেষ হতো জমিতে, সেদিন সেই জমিতেই একটা প্রসাদের আয়োজন করা হতো। আমরা ‘ক্ষেতের প্রসাদ’ নামেই সেই পার্বনটিকে জানতাম। চালের গুঁড়া, দুধ, গুড়,কলা আর কমলা দিয়ে সেই প্রসাদের আয়োজন করা হতো। পৌষ মাসের শেষে সকল কৃষকের জমিতেই ক্ষেতের প্রসাদ দেয়া হতো। তখন আমরা বাচ্চারা দলবেঁধে হাতে বাটি- মগ নিয়ে প্রসাদ খাওয়ার জন্য হাওরে যেতাম। অনেকেই একটার বদলে দুই তিনটা মগ নিয়ে যেতো, বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য।

পৌষ মাসে ভাটি এলাকায় আরেকটি বড় আয়োজন পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ মাসে সকলের উঠানে দেখা যেতো, মাসকালাইয়ের ডাল, তিল, বিভিন্ন রঙের পাপড় রোদে শুকাতে দিয়েছে কৃষাণী। যার পাপড় যতো চিকন হতো, সে ততো দক্ষ। পৌষ সংক্রান্তির কয়েকদিন আগে সবার ঘরে ঘরে মুড়ি ভাজা, চিড়া কোটা শুরু হতো। সংক্রান্তির দুই/তিন দিন আগে মুড়ি-চিড়া-সোয়াই-তিলের মোয়া, মাশকালাইয়ের জিলাপি বানানোর ধুম পড়ে যেতো। দিনের কাজগুলো শেষ করে রাতে অবসরে কিষানীরা সবাই মিলে একজন আরেকজনের ঘরে গিয়ে সহযোগিতা করতো।

তখনও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ যায়নি। রাতে আমরা হারিকেন নিয়ে বাচ্চারা ঘুরে ঘুরে পাড়ায় গিয়ে দেখতাম সেই মোয়া, পাপড়, জিলাপি বানানোর দৃশ্য। যারা ভালো জিলাপি বা পাপড় বানাতো, তাদেরকে অনুরোধ করে নিয়ে যেতো অনেকেই।
পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ছেলেরা একটা ঘর বানাতো। সেই রাতে ছেলেরা চড়ুইভাতি করে ওই ঘরেই রাত কাটাতো। সূর্য ওঠার আগেই সেই ঘর পুড়ে দেয়া হতো।

অনেকের ধারণা ছিলো, এই কনকনে শীতের ভোরে, হলুদ গায়ে মেখে পুকুর থেকে ডুব দিয়ে সেই আগুন জ্বালানো ঘরের পাশে এসে দাঁড়ালে খুব পূণ্য হয়। সেই পূণ্যের আশায় আমিও কয়েকবার শীতের ভোরে পুকুরে ডুব দিয়েছিলাম তখন। ঘর পুড়তে পুড়তে সকাল হয়ে যেতো। সবাই শীতে তখন সেই আগুনের পাশে বসে থাকতাম। ঘরে ফিরে দেখতাম, চিড়া, মুড়ি, দই, বাতাসা, কদমা, জিলাপি, মোয়া, পাপড় সবকিছু দিয়ে মা প্লেইট সাজিয়ে রেখেছে। সেদিন সবার ঘরে সবার নিমন্ত্রণ থাকতো।

মাঘে বাঘ- মাঘ মাসের সংক্রান্তিতে এখনও ভাটি এলাকায় রূপক বাঘের ব্রত হয়। সেইদিন কয়েক রকম পিঠা আর পায়েস নিয়ে কিষাণীরা হাওরে গিয়ে প্রসাদ দিয়ে আসে বাঘের উদ্দেশ্যে। ছোট ছোট বাচ্চারা চালের গুঁড়া দিয়ে মুখে এঁকে বাঘ সেজে হামাগুড়ি দিয়ে সেই প্রসাদ খেতে আসে। বাঘ সেজে প্রসাদ খাওয়ার জন্য আমরা দলবেঁধে হাওরে যেতাম।

তখন কৃষকের ক্ষেতে পানি দেবার জন্য কাঠের একটা লম্বা পাইপের মতো জিনিষ ব্যবহার হতো। ভাটি এলাকায় ঐটিকে বলে খুন্দা। রাত জেগে কৃষক ক্ষেতে পানি দিতো সেই খুন্দা দিয়ে। নদী-পুকুরগুলোতে তখন পানি থাকতো। বড় কৃষকরা তখন মেশিন আর পাইপ দিয়ে নদী থেকে পানি জমিতে দিতো।

ফাল্গুন মাস এলেই মাচা থেকে নামানো হতো গরুর গাড়ি। চৈত্রের আগেই চাকা লাগিয়ে গরুর গাড়ি ঠিক করে নেয়া হতো হাওর থেকে ধান বাড়িতে আনার জন্য। এই সময়, একটু বড় কৃষকরা ধান কাটার বেপারির জন্য চলে যেতো টাঙ্গাইলে। ধান কাটতে আসার জন্য বেপারীর সর্দারকে অগ্রিম কিছু টাকা হাতে দিয়ে আসতো কৃষক। ধান মাচায় উঠানোর জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি হতো খলই, কাঠা, খুঁচি।
বাড়ির পিছনের উঠানে এই সময় শীতের সব্জি আলু, টমেটো, মূলা, শিম, লাউ, পিঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচগুলো বড় হতে থাকে।

এক ফসলের উপর নির্ভরশীল কৃষক, পরিশ্রমের ফসলটিও সহজে ঘরে তুলতে পারতো না। বোরো ফসল কাটার সময় ছিলো চৈত্রের শেষে। চৈত্র মাসেই শুরু হতো কালবৈশাখী ঝড়। সেই ঝড়, শিলা-বৃষ্টিতে কৃষকের পাকা ধান নষ্ট হয়ে যেতো। মনে পড়ে, চৈত্র মাসে ঝড়ের সম্ভাবনা দেখা দিলেই প্রতিটি কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যেতো।

প্রকৃতির এই পরিস্থিতিকে কেউ একজন সামাল দিতে পারে বলেই কৃষক বিশ্বাস করতো। ছোটবেলায় দেখতাম ফাল্গুন মাসে গ্রামে একজন মানুষ আসতো তাঁকে সবাই ‘হিরাল’ (বিপদ যে ফিরাতে পারে) বলেই চিনতো। সেই হিরাল এসে কৃষকের ঘরে একটা তাবিজ দিয়ে যেতো, সেই সাথে কিছু নিয়ম-কানুন। যেমন চৈত্র মাসে কেউ সাবান নিয়ে ঘাটে স্নান করতে যেতো না। হিরালের নিয়ম অনুযায়ী এই সময় মাথায় কেউ সাবান ব্যবহার করবে না, ঘাটে কাপড় ধোয়া যাবে না সাবান দিয়ে। যদি সেই বছর শিলা-বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হতো, সবাই বিশ্বাস করতো কেউ না কেউ হিরালের নিয়ম অমান্য করেছে। গ্রামে শুরু হয়ে যেতো কানা-ঘুষা, কে এই ভুলটা করেছে? মাঝে মাঝে প্রমাণস্বরূপ অনেকেই নিজের চোখে দেখেছে বলে কারো কারো নাম উঠে আসতো।
চৈত্রের শেষে প্রতিটি কৃষকের বাড়ির পিছনের সব্জির জমিগুলো হয়ে যেতো উঠান। যেখানে ধান শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়।

গ্রামে সমাজ ভাগ করা থাকে। একই সমাজের সবাই একসাথে তাদের কিছু সামাজিক যৌথ কাজগুলো করে থাকে। সে ক্ষেত্রে নিমন্ত্রণও হয় নিজের সমাজ অনুযায়ী। হাওরে ধান পাকা শুরু হলে, নিজের সমাজ নিয়ে পাকা ধানের কয়েকটি ছড়া কেটে আনা হয়। এটি আনুষ্ঠানিকভাবেই করা হয়। সেই সময় পাঁঠা বলি দিয়ে ঘরে একটি খাওয়ার আয়োজন করা হতো। অনুষ্ঠানটি ভাটি এলাকায় ‘আগ লওয়া’ নামেই পরিচিত এখনও।

টাঙ্গাইল থেকে বেপারির দল এসে হাওরে ঘর বাঁধতে শুরু করে দিতো এরই মধ্যে। বেপারীর দলে ৩০/৩৫ জন থাকতো। প্রথম এক দুই দিন বড় কৃষকদের ঘরেই বেপারীদের খাবারের ব্যবস্থা হতো। মনে পড়ে, বেপারীর সর্দার যখন আমাদের বাড়ি আসতো আমাদের জন্য টাঙ্গাইলের চমচম, খেজুরের গুড় নিয়ে আসতো।
আবহাওয়া ভালো থাকলে আনন্দে ভরে যেতো ভাটির কৃষকের ঘর। সেই সময় রোদে পুড়ে ভাটির মানুষগুলোর গায়ের রঙ হয়ে উঠে তামাটে।

১২ মাসে কৃষকের ঘরে প্রতিটি মাসের হিসেব করে চলতো কৃষি কাজ। প্রতি মাসের সংক্রান্তির আছে কিছু পার্বন। এই সবকিছুই আমার শৈশবে দেখা। এখন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে।
এখন আর ভাটির কৃষকের ঘরে পাট, ধৈঞ্চা, সরিষা কিছুই চাষ হয় না। বুরো, সাইল আর লাখাই ধানের পরিবর্তে হাইব্রিড এর ইরি ধান এর উপর নির্ভর কৃষক। কৃষকের ঘরে এখন আর বীজ সংরক্ষণ করা হয় না।

গত ৩০/৩৫ বছরে ভাটির কৃষক নিঃস্ব হয়েছে একটু একটু করে। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে জমির নিয়ন্ত্রণ কিছুই আর কৃষকের হাতে নেই। এর পেছনের কারণগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। জলবায়ু থেকে শুরু করে ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, সবকিছুই কৃষকের নাগালের বাইরে। ভাটির কৃষক আজ সর্বস্বান্ত। গ্রামে এখন মানুষ নেই, জীবন বাঁচাতে সবাই শহরমুখী হয়েছে।

মনে পড়ে ছোটবেলায় খাবারের থালায় ভাতের সমান মাছ না হলে আমি ভাত খেতে চাইতাম না। দুধ, দই, মাখন, ঘি,মুড়ি, চিড়া, খই সব আমাদের ঘরেই তৈরি হতো।
আমার শৈশবে দেখা কৃষকের জীবন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ৩০/৩৫ বছরে। এর পিছনের কারণগুলো মনের দূরবীন দিয়ে আমাদের চিন্তায় উঠে আসুক।

কাকলী তালুকদার
১২ ফেব্রুয়ারি ১৮
নিউইয়র্ক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.