ডিপ্রেশন বা হতাশা: খুঁজে বের করুন মন ভালো রাখার উপায়

0

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা:

দিনের মধ্যে কতবার তো কত কারণেই মন খারাপ হয়! সব মন খারাপের মাত্রা এক রকম নয়। পরীক্ষা খারাপের জন্য মন খারাপ আর জীবনসঙ্গী হারানোর কারণে মন খারাপ এক লেভেলের নয়। কিন্তু প্রতিটা পরিস্থিতিতে নিজের সমস্যাটাই নিজের কাছে সবচেয়ে জটিল মনে হয়।

আমি একটা কথা বলি সবসময়, এই পৃথিবীতে কোনো অনুভূতিই অমূলক নয়। এই মুহূর্তে আপনার যে অনুভূতি, তা এই মুহূর্তের জন্যই প্রযোজ্য, এই মুহূর্তেই আপনার জন্য ঠিক। হয়তো একদিন এই অনুভূতিটা আপনার নিজের কাছেই অমূলক মনে হবে, কিন্তু এই মুহূর্তের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার অনুভূতি একান্ত আপনার নিজস্ব। কেউ আপনার মতো করে আপনার অনুভূতি বুঝবে না, কাজেই সেটা আশাও করবেন না। হতাশাও এমনই একটি অনুভূতি মাত্র, যা আমরা সবাই জীবনের কোন না কোন অংশে অনুভব করি, কখনো বেশি কখনো কম।

জীবনের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্যবার হতাশায় ডুবেছি। মনে হয়েছে, এ জীবনটা অর্থহীন, কী প্রয়োজন এ মূল্যহীন জীবনের! চারপাশের সবকিছু ভেঙেচুরে শেষ করে দিতে চেয়েছে মন। কষ্ট দিতে চেয়েছি নিজেকে। তারপর? তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। নিজে নিজেই আবিষ্কার করেছি, নিজের ভালো থাকার মন্ত্র।

আমি জানি, মন খারাপ হলে উপদেশ শুনতেও ভালো লাগে না। কোনো উপদেশ নয়, বরং নিজের মন ভালো করার যে ছোট ছোট থিওরিগুলো আবিষ্কার করেছি ঠেকে ঠেকে, তাই শেয়ার করতে বসেছি আজ। হয়তো কারো উপকারে আসতে পারে, হয়তো কেউ পেয়েও যেতে পারেন মন ভালো থাকার উপাদান।

১) মন খারাপ হলে কাঁদুন। খোলা জায়গায় গিয়ে চিৎকার করে কাঁদুন। সম্ভব না হলে দরজা বন্ধ করে কাঁদুন। সময় নিয়ে কাঁদুন। ছাত্রজীবনে আমার একটা মজার অভ্যাস ছিল, আমি সবসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতাম। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কান্না দেখুন। দেখবেন, একসময় আপনার চোখই আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

২) খুব আস্থাশীল একজন মানুষের সাথে কথা বলুন। সান্ত্বনার জন্য নয়, উপদেশের জন্য নয়, মনের সকল কথা মনখুলে বলার জন্য একজন শ্রোতা দরকার আপনার। যে খুব মনোযোগ দিয়ে আপনার সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা, সব আক্ষেপের কথা শুনবে, আপনার সমব্যথী নয়, সহমর্মী এমন একজনকে খুঁজে বের করুন। হতে পারে সে আপনার বন্ধু কিংবা আপনার কোন আত্মীয় যিনি প্রতিক্রিয়াশীল হবেনা । নিজের মা-বাবা,ভাই-বোন, সন্তানও হতে পারে, তবে এরা সাধারণত: প্রতিক্রিয়াশীল হয়, তাই এদের বাদ দিয়ে অন্য কোন আপনজন সিলেক্ট করলেই ভাল। আমি সাধারণত: আমার এক চাচী অথবা আমার খালাতো বোনের সাথে শেয়ার করতাম যাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই মূখ্য।

৩) কাউকে বলতে না পারলে চোখ বন্ধ করে নিজের সামনে নিজের একজন খুব প্রিয় মানুষকে কল্পনা করুন। এমন একজন কেউ যাকে আপনি ভালবাসেন, যে আপনাকে ভালবাসে। হতে পারে সে এখন আপনার থেকে অনেক দূরে আছে, হতে পারে তার সাথে আপনার যোগাযোগই নেই বহুদিন, কিন্তু আপনি জানেন যতদূরেই থাকুক সে আপনাকে বোঝে আপনার মত করেই। কল্পনায় তার সাথে সব কথা শেয়ার করুন, মন খুলে কথা বলুন।বলতে বলতে কাঁদুন, হাসুন। প্রয়োজনে তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদুন। সময় নিয়ে সময় কাটান সেই কল্পনার মানুষের সাথে। সে আপনার কথা শুনবে, মনোযোগ দিয়ে শুনবে, উত্তর দিবেনা, শুধু আপনার মনে হবে, সে আপনার প্রতিটা যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে। আমি সবসময় আমার হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার বন্ধুকে কল্পনা করতাম যার সামনে আমি কেঁদে কেঁদে কথা বলতে বলতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলতাম।

৪) উপরের কোনটিই না পারলে, কাগজ-কলম নিয়ে লিখে ফেলুন মনের সকল যন্ত্রণা , আক্ষেপ। আপনার লেখা নিখুঁত হতে হবে এমন কোন কথা নেই। প্রিয় কাউকে সম্বোধন করে চিঠির মতো করে লিখতে পারেন। লেখার পর পড়ে দেখতে পারেন। পড়লে যদি কষ্ট লাগে তাহলে রেখে দিন, আর রাখতে না চাইলে ছিঁড়ে ফেলুন কুটিকুটি করে। আমার অবশ্য রেখে দিতেই ভালো লাগে, নিজের লেখা নিজেই পড়ি অসংখ্যবার। আমার মনে হয়, প্রতিবার আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

৫) কাছাকাছি নদী বা সমুদ্র থাকলে, নিরিবিলিতে সেখানে গিয়ে বসে থাকুন কিছুক্ষণ। প্রকৃতির এক বিশেষ গুণ হলো, এরা নিজেদের বিশালতা নি:স্বার্থভাবে ছড়িয়ে দেয় তার আশেপাশের সবার মাঝে। আমার যেহেতু সমুদ্রই বেশি পছন্দ, তাই আমি কল্পনায় চলে যাযই সমুদ্রতীরে। সমুদ্রের কোলে একটা পাথরে বসে থাকি পা ঝুলিয়ে। সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ এসে আমাকে ভিজিয়ে যায়, আমি কাঁদতে থাকি আপন মনে।

৬) আয়নার সামনে দাঁড়ান, নিজেকে দেখুন। কী নিঁখুত, কী অপূর্ব সৃষ্টি আপনি! আপনি দেখতে পাচ্ছেন, অনুভব করতে পারছেন পৃথিবীর রং,রূপ,সৌন্দর্য্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপ-লাবণ্যকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখুন, ভালবাসা নিয়ে দেখুন। মনের মতো করে সাজুন, নিজের চোখে নিজেকে অপরূপ করে তুলুন। কড়া করে সাজতে হবে এমন কথা নেই। কিছু না হলে অন্তত: চোখে কাজল পরুন, কপালে টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপষ্টিক, মোটকথা যেভাবে সাজলে আপনার চোখে আপনাকে ভালো লাগে সেভাবেই সাজুন।

৭) সেজেগুজে পছন্দের শাড়ি বা ড্রেস পরে ছবি তুলুন। ছবি তুলে দেয়ার লোক না পেলে সেলফি তুলুন। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে। ছবি তুলে নিজের ছবি নিজেই দেখুন সময় নিয়ে। যে ছবিটা সবচেয়ে বেশি সুন্দর মনে হয় নিজের চোখে, সেটা পোস্ট করুন ফেসবুকে।

৮) শপিং করতে ভালো লাগলে বেরিয়ে পড়ুন, ইচ্ছেমতো পছন্দের জিনিস কিনুন। যদিও এই কাজটি আমার চরম অপছন্দের, মার্কেটে ঘোরাকে আমার শক্তির সবচেয়ে বড় অপচয় মনে হয়। আমি তাই অনলাইনে বসে পছন্দের শাড়ি কিনে কিনে ঘর ভরে ফেলেছি।

৯) নিজের পছন্দের কোনো লেখকের বই পড়ুন, গান শুনুন, কবিতা আবৃত্তি শুনুন। নিজে আবৃত্তি করুন গলা ছেড়ে, পছন্দের গান গাইতে পারেন গুনগুন করে, ছবি আঁকতে পারেন, সিনেমা দেখতে পারেন টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে ইচ্ছেমতো। মোট কথা, যা করতে আপনার ভালো লাগে, তাই করুন।

একটা কাজ শুরু করলেন, ভালো লাগছে না? বাদ দিন ওটা, আরেকটা ট্রাই করুন। ততোক্ষণ চেষ্টা করতে থাকুন, যতোক্ষণ আপনার মনের মতো কাজটি খুঁজে না পান। একসময় ঠিক খুঁজে পাবেন আপনার ভাললাগার উপকরণটি। প্রয়োজনে নতুন কিছু ট্রাই করতে পারেন। ধরেন, এতোদিন আপনি রোমান্টিক ধাঁচের বই পড়েছেন, এখন ভালো লাগছে না, থ্রিলার পড়ুন।

কোনদিন বাগান করেননি, বাইরের ছোট্ট লনে বা বারান্দায় টবে গাছ লাগান, ফুল ফোঁটান। কখনো সেলাই করেননি, ইউটিউব দেখে নতুন একটা নক্সা ট্রাই করেন। রান্না করতে না পারলেও রেসিপি দেখে একটা আইটেম ট্রাই করুন। নতুন করে কোনকিছু চেষ্টা করে সফল হওয়ার পর দেখবেন বিশ্বজয়ের আনন্দ হচ্ছে। আমি কিন্তু ভালো থাকার জন্য একটা ছেড়ে আরেকটা ট্রাই করি। যতোক্ষণ যেটা করতে ভালো লাগে,ততক্ষণ তাই করি।

১০) যার সাথে গল্প করতে ভালো লাগে, গল্প করুন। যতোক্ষণ সময় কাটাতে ভালো লাগে, ততোক্ষণই কাটান। জীবনটা আপনার একটাই। এক জীবনে একজন মানুষকে ভালবেসে জীবন উৎসর্গ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই, আপনি গতানুগতিক বাংলা সিনেমার নায়িকা নন। নিজেকে ভালবাসুন, নিজে ভালো থাকার জন্য প্রয়োজনে অন্যকেও ভালবাসুন, দরকার হলে আবার প্রেমে পড়ুন।

১১) দিনে একবার হলেও নিজের ধর্মগ্রন্থ পড়ুন নিজের ভাষায়। বাংলা ভাষায় পড়ুন, বুঝে পড়ুন। কী যে শান্তি লাগবে, কীভাবে যে আপনার মন ভালো হবে, কল্পনাও করতে পারবেন না।

১২) বিছানায় শুতে যাবার আগে বা পরে বুক ভরে শ্বাস নিন কয়েকবার। পারলে মেডিটেশন করুন ঘুমানোর আগে।মেডিটেশন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লে তো কথাই নেই। আর ঘুম না আসলে স্বল্পমেয়াদের জন্য ঘুমের ওষুধ লো ডোজে খেতে পারেন। ডিপ্রেশনের সময়টা পার হলে অবশ্যই ওষুধ ছেড়ে দেবেন।

১৩) কোনকিছুতেই কাজ না হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান অথবা কোনো কাউন্সিলরের সাহায্য নিন।

তের নাম্বারটি আমার মোটেই পছন্দের নয়, তারপরেও কীভাবে যেন লিখতে লিখতে তেরোটা পয়েন্ট হয়ে গেল। কমালাম বা বাড়ালাম না ইচ্ছে করেই। নিজের অনেক কিছুই বদলানোর প্রয়োজন আছে। লাকি বা আনলাকি এই শব্দগুলো মানুষেরই সৃষ্টি করা, বিধাতার নয়। এই তেরোটি পয়েন্টের কোনো একটি হয়তো আপনার মন ভালো করতে সাহায্য করবে। এসবের সবই হয়তো আপনি জানতেন, তবু যদি আবার নতুন করে পড়ে আপনার কোনো উপকার হয়, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।

জীবন একটাই, আর সেটা আপনারই জীবন। না আপনার মা-বাবার, না জীবনসঙ্গীর, না সন্তানের, না বন্ধুবান্ধবের। একান্ত আপনার এ জীবনের মূল্যায়ন আপনার নিজেকেই করতে হবে।

সবশেষ কথা, নিজেকে ভালবাসুন, নিজের প্রেমে পড়ুন সবার আগে। কেউ স্বপ্নের মতো এসে আপনার পৃথিবীর সব অশান্তি সরিয়ে আপনার মনের মতো করে সাজিয়ে দিয়ে যাবে না। আপনার পৃথিবী আপনাকেই সাজাতে হবে নতুন করে, নিজের মনের মতো। নিজের ভালবাসার পৃথিবীতে সবাই ভাল থাকুন নিজের মতো করে।

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস ; এফসিপিএস (গাইনী)
ফিগো ফেলো(ইটালী)
গাইনী কনসালট্যান্ট
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 529
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    530
    Shares

লেখাটি ৩,৫০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.