ভালোবাসার মর্ম হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ

ফারহানা আফরোজ রেইনী:

টিভির চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ভারতীয় একটি চ্যানেলে খুব সম্ভবত কোনো একটা সিরিয়ালে দুজন মানুষের মধ্যে কথোপকথনে আটকে গেলাম। এই দুজন মানুষ ছিল স্বামী- স্ত্রী। তাদের মধ্যে যে কথা হচ্ছিল, তা ছিল অনেকটা এই রকম:

স্বামী: তোমাকে আমি ভালো বাসি না? ম্যারেজ ডেতে দামি উপহার দেই, বছরে দুই বার বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাই, পূজায় সবচেয়ে দামি পোশাকটা আমি তোমাকে দেই। তাহলে আমার ভালোবাসার কমতি কোথায়?
স্ত্রী: ও আচ্ছা এগুলো বুঝি ভালোবাসা? আমাকে যদি ভালোবাসবে, তাহলে অন্য মেয়েদের সাথে অযাচিত সম্পর্ক তৈরির কথা তোমার মনে আসে কী করে?
স্বামী: দেখো অন্য মেয়েদের সাথে মেলামেশার সাথে তোমাকে ভালোবাসার তো কোনো সম্পর্ক নেই.. তোমার সব চাহিদা পূরণ করে আমি যদি বাইরে একটু সময় কাটাতে চাই, তাতে তোমার এতো সমস্যা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না।
স্ত্রী: (স্ত্রী মোটামুটি বাক্যহারা) তোমার কী মনে হয় শুধু দামি কাপড়, গয়না দেয়া এগুলোই ভালোবাসা? সেখানে শ্রদ্ধাবোধের কোনো জায়গা নেই?

এইবার স্বামী বেচারা বাক্যহারা। এই মহিলা বলে কী? তাই সে জানতে চায়, এতো কিছু দিয়েও যদি না হয়, তাহলে আর কী দিলে তোমাকে শ্রদ্ধা করা হবে? এই পর্যন্ত দেখে মনে হলো এই ভদ্রলোক ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা দুটোকেই দেয়া-নেয়ার মধ্যেই খুঁজে পায়। এটা হয়তো কোনো নাটকের সংলাপ ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছে সংলাপগুলোর মধ্যে বাস্তবিক জীবনের চিত্র হুবহু ফুটে উঠেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিয়ের সময় মেয়েকে তুলে দেয়া হয় স্বামীর হাতে, এটা মুসলিম রীতিতে। আর হিন্দু রীতিতে সম্প্রদান করার পরেও ভাত-কাপড় বলে একটা অনুষ্ঠান হয়, যেখানে স্ত্রীর ভরণপোষণ এর দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বামী নেয়। আমি জানি না স্ত্রীকে ভালোবাসা মানে তাকে ভালো কাপড় দেয়া, গয়না দেয়া আর বেড়াতে যাওয়া
.. এই সংজ্ঞাটা এই প্রচলিত রীতি থেকেই এসেছে কিনা? তবে যাই হোক এইটা কোনোভাবেই ভালোবাসা নয়। সব স্বামীর ভালো কাপড় দেয়া, গয়না দেয়া আর বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে না। তবে কি এই ধরনের পরিবারে ভালোবাসা নেই?

স্বামীরা যদি স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সেটা অবশ্যই ভালো বিষয়। কিন্তু কোনোটাই শর্তহীন হয় না। আমাদের সমাজে স্বামীরা স্ত্রীদের দায়িত্ব কতোটা নেয়, সেটা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। যে বৌ ধনী পরিবার সন্তান সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন অছিলায় বাবার বাড়ি থেকে এটা-সেটা নিয়ে আসে, সেটা অর্থই হোক, আর সামগ্রীই হোক। যে বৌ চাকরি করে সে সংসারে আর্থিক ভাবে অবদান রাখে। আর যার দুটোর একটাও নেই সে কারণে অকারণে অপমানিত হয়, মার খায়।

ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা আসলে কোনোটাই চেয়ে পাওয়ার জিনিস নয়, আবার শিখিয়ে পরিয়ে দেয়ারও নয়। এগুলো মানুষের সহজাত বিষয়। দুটোই ভিতর থেকে আসে এবং মানুষের আচার আচরণে তার প্রকাশ পায়।

একদিন আমার হাসব্যান্ড ঘুম থেকে উঠে অফিস এ যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো এবং বলছিলো, দেরি হয়ে গেছে, অফিসে মিটিং আছে। সেখানে আমি ছাড়াও আমার শ্বশুর উপস্থিত ছিলেন। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার শ্বশুর বললেন, বাবা একটু দেরি হলেও তুমি কিন্তু জোরে মোটর সাইকেল চালিও না। ওনার কথার মধ্যে আমি ওনার ভিতরের ব্যাকুলতা টের পেয়েছিলাম। সত্যিকারের ভালোবাসা না থাকলে এটা সম্ভব না।

‘তোমাকে প্রথম দেখেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি’। এই কথাটা আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবো যে এটা বলা হয় শুধুমাত্র একটা বিশেষ ক্ষেত্রে, যেখানে সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিণতি বিয়ে। আমরা কোনো দিন কোনো ছোট্ট বাচ্চাকে অথবা বয়স্ক মানুষকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটা বলতে শুনি নাই। তার মানে এই কথাটার মধ্যে কিছু একটা পাওয়ার আকাঙ্খা থাকে।

দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ পায় অনেক ক্ষেত্রেই, এ কথা সত্যি বলেই মনে হয়। যাকে আমরা ভালোবাসি না, তার প্রতি দায়িত্ব পালনের কোনো দায় আমাদের নেই, এভাবেও ভাবা যায়। দায়িত্ব পালন একটা সম্পর্কের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে, যেখানে ভালোবাসা অবধারিতভাবে বা অযাচিতভাবে উপস্থিত থাকে। কিন্তু শ্রদ্ধা বিষয়টি নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল। সকল সম্পর্কের ঊর্ধ্বে থেকে শ্রদ্ধাবোধ বিষয়টি মানুষের মনুষ্য সত্তাকে আরও বেশি গৌরবময় করে তুলতে পারে।

আবার তর্কের খাতিরে উল্টো কথাও বলা হয়। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা অর্জন করতে হয়। কারো প্রতি এটা এমনি এমনি আসে না। তবে নাটকের ওই ভদ্রলোকের মতো কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কী দিলে শ্রদ্ধা করা হবে, তাহলে সেটার তালিকা করাটা নিশ্চয় খুব দুরূহ ব্যাপার হবে। তবে নিত্য দিনের ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েও অন্যের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা প্রকাশ পেতে পারে। কেউ যদি শ্রদ্ধা অর্জন করতে নাও পারে, তবুও একজন মানুষ হিসেবে ন্যূনতম কিছু মর্যাদা তো সে পেতেই পারে। আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে বিষয়টি আরো সহজ।

একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে একজন নারী হিসেবে, তার সহধর্মিনী হিসেবে তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দেয়, তাহলে স্বামীও তার কাছ থেকে শ্রদ্ধাই পাবে। ও মেয়ে মানুষ, ও কী বোঝে? বৌ এর কথা পাত্তা দেয়ার দরকার নেই, বৌ এর বেশি কিছু লাগে না, অল্প কিছু দিলেই খুশি হয়ে যাবে, মেয়ে মানুষ কথা কম বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি খুব প্রচলিত কিছু কথা। মেয়ে মানুষ যে কম বোঝে না, দুনিয়া জুড়ে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে। সংসারটা বৌ-ই ভালো বোঝে, তার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই দেখেন না, সংসারে লাভ বই ক্ষতি হবে না, আর সে যে অল্পতে খুশি হয়, সেটাকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে, শ্রদ্ধা করুন।

কাউকে ভালোবাসেন কিনা বিভিন্নভাবে তার প্রমাণ দিতে হয়, আর্থিক সঙ্গতিটাও জড়িত এর সাথে। কিন্তু শ্রদ্ধা বিষয়টি একান্তই আমাদের, আমাদের ভিতরের জিনিস। কেউ যদি আমাকে শ্রদ্ধা করে, বা আমি যদি কাউকে শ্রদ্ধা করি, তাহলে তা এমনকি আমাদের কথা বলা, তাকানোর মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। আমরা যদি কাউকে শ্রদ্ধা করি, তাহলে ভালোবাসাটা এর মধ্যেই নিহিত আছে। আলাদা করে প্রমাণ করার দরকার নেই। আর কিছু না হোক, মানুষ হিসেবেও যদি আমরা আরেক জনকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি, তাহলেও কিন্তু কঠিন ও জটিল সমীকরণগুলো সুন্দর ও সাবলীল হয়ে উঠতে পারে।

ব্যক্তিগত জীবনের বাইরেও আমাদের প্রতিনিয়ত অনেক মানুষের সান্নিধ্যে আসতে হয়। কারণে-অকারণে কাউকে ভালোবেসে ফেলি আবার কাউকে অপছন্দ করি। সেটা মানুষ ভেদে হতেই পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকু যদি আমরা সব মানুষকে দেখতে পারি, তাহলে আমরা ছোট হয়ে যাবো না। বরং অন্যের কাছ থেকে শ্রদ্ধাই পাবো।

শেয়ার করুন:
  • 268
  •  
  •  
  •  
  •  
    268
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.