সন্তানকে মিথ্যাবাদী ও স্বার্থপর বানাচ্ছেন আপনারা

0

গোধূলি খান:

আমরা সন্তান উচ্ছন্নে গেছে বলে হায় হায় করি। সন্তানকে এতো কষ্ট করে লালন-পালন করেও কেন তাকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারছি না। আমার সন্তান কেন মিথ্যা বলছে আমার সাথে! আমার সন্তান কেন গোপন করছে সব কিছু! আমার সন্তান কেন ভুল পথে যাচ্ছে! আমার সন্তান কেন এতো স্বার্থপর হয়ে উঠছে দিন দিন! কারণ কি জানেন? কারণ আপনি আমি আমাদের সন্তানকে ভুল শিক্ষা দিচ্ছি। আপনি আমি সন্তানকে মিথ্যা বলা শেখাচ্ছি। হ্যাঁ, আপনিই শেখাচ্ছেন আপনার সন্তানকে মিথ্যা বলা। অবাক হচ্ছেন! ভেবে দেখুন আমাদের অধিকাংশ পরিবারের চিত্র-

১. ক্রিং ক্রিং ক্রিং ফোন বাজছে ঘরের, জাহানারা শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছেন। ফোন ধরতে চাইছেন না। কারণ ফোনে কথা বলতে গেলে নাটকের এপিসোড মিস হয়ে যেতে পারে। তাই নয় বছরের বাচ্চা ছেলেকে ডেকে বললেন, বাবা ফোন ধর। আরো বলে দিলেন, কেউ আমাকে চাইলে বল আমি ঘুমাচ্ছি, এখন কেন ঘুমাচ্ছি জিজ্ঞাসা করলে বলবে, আম্মুর শরীরটা ভালো না তাই, কী হয়েছে জানতে চাইলে বলবে, প্রেসার বেড়েছে, বা খুব মাথা ব্যথা।

 ২. মিজান সাহেব পাওনাদারদের এড়িয়ে চলছেন। মোবাইল ফোন প্রায় বন্ধ রাখেন। ছুটির দিনেও পারলে বন্ধ রাখেন ফোন। তাকে বলতে গেলে ফোনে কেউ পায়ই না। হুট করে কল এলে তিনি আট বছরের মেয়েকে দিয়ে বলান, বাবা ফোন ভুলে বাসায় রেখে গেছে। কখন আসবে বাসায় কেউ বলতে পারছে না। ফোন কেন বন্ধ থাকে জানতে চাইলে আগেই শিখিয়ে রেখেছেন, বাবার কাছে টাকা নেই, তাই মোবাইলেও টাকা নেই। 

৩. বাসিত সাহেবের বাসায় একজন আত্মীয় বা বন্ধু বা পরিচিতের সাথে ফোনে কথা বলছেন, ভাই, কাজের চাপে মাথা তুলতে পারছি না, আপনি আসবেন কিন্তু আমি তো সেই ভোরে বাইরে যাই, ফিরতে ফিরতে মাঝরাত, আর আপনার ভাবীর শরীরটা খুব খারাপ, সে নিজের বা বাচ্চার টেক কেয়ার করতে পারছে না। বাসায় কাজের মানুষ নাই, হেল্প করার কেউ নাই। দোকান থেকে চা’টাও এনে খাই। বাসাবাড়ি ময়লা হয়ে আছে। আর বলেন না ভাই, বাসার অবস্থা খুব খারাপ, না হলে আমিই আপনাকে আমার এখানে থাকতে বলতাম। নতুন শহরে আপনি তো একা কোথাও যেতে পারবেন না। আপনার বাসায় সপ্তাহখানেক থেকে আসলাম ভাই, না ভাই, খুব অসুবিধার মধ্যে আছি। বাসার এ অবস্থা না হলে তো আমিই যেয়ে আপনাকে নিয়ে আসতাম, হে হে হে, ভাবীকে বলবেন, তার হাতের হেদোল শুটকি খুব মজার। ফোন রেখেই তিনি কাজের মেয়ে ডেকে এক কাপ হালকা লিকারের চায়ের হুকুম দিলেন। বাসিত সাহেব যখন এসব বলছেন ফোনে, তখন তার দুই সন্তান পাশেই বসে খেলছে বা পড়ছে বা টিভি দেখছে।

৪. মাসুদ সাহেবের ভাই-বোন, আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশী কারো না কারো সাথে মনোমালিন্য আছে। প্রকাশ্যে কিছু তাদের বলেন না। মনে মনে তিনি রাগ পুষে রেখেছেন। সেই ব্যক্তির সম্পর্কে মাসুদ সাহেব বাসায় যা মুখে আসে তাই বলছেন, আবার ওই ব্যক্তির সাথে হেসে হেসে মিষ্টি করে কথা বলছেন। তার প্রশংসা করছেন। মাসুদ সাহেব প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করছেন, আবার তার সাথে কাজ শেষে অচেনার মতো আচরণ করছেন।

৫. রমিলাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান, বড়সড় পরিবার। ভাইবোন, ভাগ্নাভাগ্নি, ভাস্তাভাস্তি অনেক। রমিলার বাচ্চা শুধু তাদের থেকে অবস্থাপন্ন পরিবারের বাচ্চাদের সাথে মিশছে, রমিলাও অনুষ্ঠানে বেশি সময় কাটাচ্ছে, তার সম বা তার থেকে উচ্চবিত্ত আত্মীয়দের সাথে, আর বাকিদের সাথে জাস্ট মেকি হাসছেন। বা কোন রকম কুশল বিনিময় করে সরে পড়ছেন। বাচ্চাকেও শিখিয়ে নিয়ে এসেছে কাদের সাথে মিশবে, বা কাদের সাথে মিশবে না। বাচ্চা জিজ্ঞাসা করলে বলেছেন, মেশা তাদের সাথেই উচিত, যাদেরকে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে বা যাদের ক্ষমতা আছে।

৫. মোবিন বাসায় নিজের মা-বাবা, ভাইবোন, বন্ধু আত্মীয়দের, কথা বার্তা-আচরণ নিয়ে স্ত্রী মিলির সাথে বসে সমালোচনা করে। তীব্র নিন্দা করে, কটুক্তি করে। তাদের পোশাক নিয়ে উপহাস করে। আবার তারা সামনে এলে হেসে হেসে প্রশংসা করে। বাচ্চাদের শেখায় কার সাথে কী আচরণ করতে হবে।

৬. তিতলি তার ছয় বছর বয়সী মেয়ের স্কুলের ক্লাসে কারা পড়ে খোঁজ নেয়। তারপর বাচ্চাকে বলে কার সাথে মিশবে ও কার সাথে বন্ধু করবে। অবস্থাপন্ন ও ক্ষমতাবানের বাচ্চার সাথে মিশতে শেখায়।

৭. মাধুরী বাচ্চাকে শেখায়, আমার এই ভাই বা বোনকে ও তাদের সন্তানদের পাত্তা দিও না বা তাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখবে না। আবার অবস্থাপন্ন ভাইবোন বা তাদের সন্তানদের সাথে ভালোভাবে মিশতে বলে, সব সময় যোগাযোগ করতে শেখায়।

৮. মারুফ শেখায় তার মেয়েকে কেউ বিপদে পরলে চুপ করে যেন সরে আসে। বিপদে পরার কোনো সম্ভাবনা দেখলেই যেন আগেই সরে আসবে। কোনো ঝামেলার মধ্যে যাবে না। সবার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেখায়।

৯. জাফরের সাহেবের ছেলেবেলায় তার পাড়াতো মামা-খালা, চাচা-ফুফুরা তাকে শাসন করতে পারতো। কিন্তু আজ উনার নিজের বাবা-মা, ভাইবোন পর্যন্ত তার সন্তানকে শাসন করতে পারে না। জাফর সাহেব মনে করেন আত্মীয়-বন্ধু, প্রতিবেশী বা ভাইবোন শুধু বাচ্চাদেরকে আদর করবে, আর মজার মজার গিফট কিনে দেবে। তাদের কোনো শাসনের এক্তিয়ার নাই। কিন্তু উনি ভাবেন না, শাসন করার অধিকার না থাকলে আদর করার বা গিফট কিনে দেবারও এক্তিয়ার থাকা উচিত না।

১০. নাদিরা-সাদিফের ১৫ বছরের সংসার। বিয়ের এক বছর পর থেকেই চলছে লড়াই, ঝগড়া, চিৎকার, এমনকি গায়ে হাত তোলা। কেউ কারো সাথে কথা বলে না, ঠিকমতো কথা বলা মানেই এক কথা দু কথা ঝগড়াতে রূপ নেয়। বাসায় কেউ এলে বা তারা কোথাও গেলে বোঝার উপায় নাই, নাদিরা-সাদিফ কেউ কারো সাথে কথা বলে না। এক বাসায় থাকলেও প্রায় তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। বাইরের মানুষের সামনে গা ঘেঁষে বসা, জানু সোনা বাবু বলে একে অন্যকে ডাকা, মুখে তুলে খাওয়ানো, সেলফি তোলা, এক সেকেন্ড না দেখলে চক্ষু হারায় অবস্থা। বাইরের মানুষের আড়াল হলেই আবার তাদের মারমার, কাটকাট চেহারা বের হয়ে পরে।

১১. নীলিমার হাত থেকে স্বামীর পছন্দের দামী ফুলদানিটা পড়ে ভেঙ্গে গেল, স্বামী অফিস থেকে ফেরার পর তাকে বললো, বান্ধবীর বাচ্চা খেলতে খেলতে বল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। চার/পাঁচ বছরের বাচ্চাকেও শিখিয়ে দিয়েছে একই কথা বলতে। না হলে স্বামী ভয়ঙ্কর রাগ হবেন।   

১২. রিনি-সুমনের মধ্য চরম গণ্ডগোল, কারণ রিনি জেনে গেছে সুমনের সাথে তার সহকর্মীর এক্সট্রা ম্যারিটাল প্রেমের কথা। রিনি সংসার ছাড়বে কিনা বুঝতে পারছে না। সমাজে মুখ দেখাবে কী করে ভাবে। বাসায় সারাদিন কান্নাকাটি করে। সাত ও য় বছরের বাচ্চাদের কাছে কেঁদে কেঁদে স্বামীর বদনাম করে। যখনি দেখে সুমন তাকে ছেড়ে দেবে বলে হুমকি দেয়, রিনি তখন কাছের বন্ধুদের কাছে স্বামীর নোংরা চরিত্রের কথা বলে, তার বিভিন্ন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের কথা বলে। ছেলে ও মেয়েকে বাবা সম্পর্কে বাজে ও ভয়ের ধারণা দিতে থাকে। ছেলে-মেয়েও দিনে দিনে বাবা বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।  

১৩. নীরা তার বিশেষ বন্ধুর সাথে কথা বলে প্রতিদিন বিকেলে। ছয় বছরের বাচ্চাকে বলে বান্ধবীর সাথে কথা বলছে। আব্বুকে কিন্তু বলবে না। তাহলে তোমাকে চকলেট কিনে দেব, খেলনা কিনে দেব।

১৪. চা কড়া হওয়াতে মোস্তফা সাহেব কান মলে দিলেন ১৩ বছরের কাজের মেয়ে মিনির। মোস্তফা সাহেবের বউ তুলি এসে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললেন, তোকে না কতবার বললাম যা চুলা বন্ধ কর, না হলে চা কড়া হয়ে যাবে। কথা কানে যায় না। বলে দিলেন পিঠের উপর ধুম করে কিল। মিনি ব্যথায় চিৎকার দিতেই মোস্তফা সাহেব বা গালে এক চড় দিয়ে বললেন, একদম চুপ নাইলে গলা কেটে ফেলবো। জীবনেও গ্রামে ফিরতে পারবি না। সেই সময় কেউ বেল বাজালে তুলি মিনিকে নিয়ে মেয়ে সাইনার ঘরে চলে যায়। সাইনার একটা অল্প ব্যবহার করা ফ্রক জলদি করে মিনিকে পরিয়ে দেয়। বলে যা মুখ-চোখ ধুয়ে আয়। চুলটাও আঁচড়ে নিস। তারপর আসবি বাইরের মানুষের সামনে। সবকিছুই ঘটে ১৪ বছরের সাইনার সামনে।

১৫. আপন ভাই-বোনের বাচ্চাদের সাথে নিজের বাচ্চার বিভেদ করি, আপন বাচ্চাকে শেখায় তোমার মা-বাবা বিত্তশালী, তাই তুমি সুপিরিয়র। তুমি ডাক্তার বা ইঞ্জিনারিং পড়ছো, পরিবারে আর কেউ পড়ছে না, তাই তুমি সুপিরিয়র।  তুমি এক্সপেন্সিভ ইউনিভার্সিটিতে পড়ো, তাই তুমি সুপিরিয়র। তুমি ফ্যামিলির একমাত্র ছেলে বাচ্চা, তাই তুমি সুপিরিয়র, তুমি যেচে কারো সাথে কথা বলবে না। তোমার সাথে সবাই কথা বলতে চাইবে। তুমি ওদের সাথে মিশে ওদেরকে ধন্য করবে।

১৬. লিপি ও পাভেল সব সময় বাচ্চাকে খাওয়াতে গেলে বড় পিস খোঁজে মাছের, মাংসের। বাচ্চাকে মুরগির রান ছাড়া তারা খাওয়াতে পারে না। নিজের বাসা হোক বা অন্যের বাসা বাচ্চাকে রানের মাংস না দিতে পারলে তাদের মুখ কালো হয়ে যায়। সব থেকে বড় কেকের টুকরা না হলে হয় না। কে পেলো বা কে খেলো তার দিকে লিপি বা পাভেলের দৃষ্টি নেই। শুধু তার নিজের সন্তানের জন্য বড় ও বেশি বেশির খোঁজ।

১৭. আশ্রাফ আলী পার্টনারকে বোকা বানিয়ে, ঠকিয়ে নিজের ভাগে বেশি টাকা নিচ্ছেন, সেটা বাসায় ফলাও করে বউকে এসে গল্প করছেন খাবার টেবিলে বসে। তার ছেলে মেয়েও শুনছে বাবার পার্টনারের বোকামীর গল্প।

১৮. ইয়াসিন সাহেব চাকরি করেন একটা সরকারি অফিসের পারচেজ সেকশনে বেতন পান মাসে ৪০ হাজার টাকা, কিন্তু প্রতিমাসে তিনি বউয়ের হাতে তুলে দেন চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। বউ জানতে চাইলে বলেন স্পি মানি। ছেলেমেয়ে পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে। উনার সংসার খরচ মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা। সবকিছুই করছেন সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ আর আরাম আয়েশের জন্য।

১৯. রীতু ও মঈন দম্পতি তাদের সন্তানের বায়না মেটান দামি দামি খেলনা দিয়ে। চাওয়ার আগেই হাজির করেন দামি খেলনা, পোশাক, খাবার। বাজারে নতুন কিছু আসলেই তারা নিয়ে আসেন তাদের একমাত্র পুত্রের জন্য। একই জিনিস বিভিন্ন রঙের সাইজের কিনে আনেন যেটা বাচ্চার পছন্দ হবে খেলবে না হলে রেখে দেবে।

২০. পাশের বাড়ির ভাবী লন্ডন গেছে সামার ভেকেশনে, তাই শিলা ও কবীরের যেতেই হবে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সুইডেন বা আমেরিকা। ব্যাংক লোন নিয়ে, গহনা বেঁচে, জমি মর্টগেজ দিয়ে হলেও তাদের বেড়াতে যেতে হবে আমেরিকা। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে দেখোনোর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে, এদিকে গ্রাম থেকে বাবা ৫০০০ হাজার টাকা চেয়েছে তিন মাস আগে, হাত খালির অজুহাতে ঘুরিয়ে চলেছে কবীর।   

২১. রব্বানী সাহেব পাশের বাসার মমতাজ সাহেবের উপর রেগে আগুন, কারণ উনি ছেলের নামে অভিযোগ করেছেন, তার ১৬ বছরের ছেলে নাকি টং দোকানে বসে সিগারেট টানতে টানতে অন্য বখাটে ছেলেদের সাথে বসে মেয়েদের টিজ করছিলো, তার দুধের শিশু এখনো মায়ের হাতে ছাড়া ভাত খায় না, তার নামে এতো বড় অপবাদ, বেটা মমতাজ একটা হিংসুটে, ফকির কাজ করে একটা ব্যাংকে, রোজগার দুই টাকা, সে নাকি অপবাদ দেয় তার মাসে ২০ হাজার টাকা হাতখরচ করা ছেলের নামে।

এরকম হাজারো ঘটনা আছে লিখলে মহাভারতের থেকেও বড় গ্রন্থ লেখা হয়ে যাবে। আবার আছে বিপরীত ঘটনা।

আমরা সব বাবা-মা বাচ্চাকে শেখাই মিথ্যা কথা না বলতে, কোন কিছু গোপন না করতে। মা-বাবা, ভাইবোনকে ভালবাসতে। আদব-কায়দা-নম্রতা শেখাই। সততা ও আদব-কায়দা শেখানোর পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন আচার-ব্যবহার যে দ্বৈততা, তা একটা শিশুর মনে কী রেখাপাত করে তা কখনও কি আমরা ভেবেছি?

আমরা অধিকাংশ বাবা-মা নিজের বাচ্চাকে স্পেশাল করে তুলতে গিয়ে তাদের কী শিক্ষা দিচ্ছি তা কি কখনও চিন্তা করি। আমাদের চরিত্রের দ্বৈততা তাদের তাদের মনে জন্ম দেয় দ্বিধাদ্বন্দ্বের। আমাদের যাপিত জীবন তাদের শেখাচ্ছে স্বার্থপরতা, মিথ্যা বলা, আত্নকেন্দ্রিকতা। আমরা মনে করছি আমরা সব কষ্ট সহ্য করে, নিজেকে বঞ্চিত করে বাচ্চাকে বেস্ট সবকিছু দিচ্ছি। তারা তো ভালোই হবে, এতো ত্যাগ স্বীকার করছি, রিস্ক নিচ্ছি সবই তো ছেলে-মেয়ের জন্য।

কিন্তু এই বেস্ট দিতে গিয়ে আমরা তাদের ভুল শিক্ষা দিচ্ছি। আমাদের শেখানো পথে তারা হেঁটে ধীরে ধীরে আমাদের জীবন থেকে দূরে সরে যাবে। কারণ আমাদের দেয়া শিক্ষা তাদের স্বার্থপর করে তুলবে। আমাদের প্রয়োজনে তাদের কাছে পাবো না। তারা নির্দ্বিধায় আমাদের মিথ্যা গল্প শোনাবে। আমাদের এভয়েড করতে শিখবে। নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।আপন ভাইবোনদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। আখের গোছানোর জন্য ক্ষমতাবানদের জন্য সময় দেবে। বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়-পরিজন থেকে দূরে সরে যাবে। কারো বিপদে পাওয়া যাবে না। সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যাপ্ত থাকবে। আমাদের কি বলার কিছু থাকবে?

আমরা আমাদের সন্তানকে আমাদের থেকে দূরে সরে যাওয়া শিক্ষা দিচ্ছি। তারা যখন দূরে সরে যায়, তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারি, কিন্তু তা অনেক দেরিতে। কদিন আগে মিডিয়াতে খবর হলো, কোটিপতি সন্তানের বাবা, যে এক সময় কোটিপতি ছিল তার নামকরা ডাক্তার সন্তান বাবার মৃত্যুর সংবাদে বিচলিত না হয়ে লাশ আঞ্জুমান মফিদুলে দিয়ে দিতে বলেছে। কি নিষ্ঠুর আচরণ তাই না?

বৃদ্ধা মা কে হাত-পা বেঁধে রাস্তায় ফেলে গেছে সন্তান, উফ কী হৃদয় বিদারক ঘটনা! সন্তান আরো দামি গাড়ি বা মোটর বাইকের জন্য বাবা-মাকে আগুন দিয়ে পোড়ায়। এসবই আমাদের কর্মফল। পাশাপাশি আছে বিপরীত ঘটনা, বাবা-মামা, ভাইবোনের আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি ভালবাসার, টানের উদাহরণ। কারণ আর কিছুই না শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা। আপনি আমি যে শিক্ষা সন্তানকে দেব, আমার আপনার সন্তান সেইভাবেই বড় হবে। সেই মানসিকতার হবে। আসুন সন্তানকে মিথ্যাবাদী স্বার্থপর না বানাই। তাদের টাকা পয়সা, দামি খেলনা পোশাকের বদলে, অনেক সময় দিই, তাদের সারাদিনের খবর নেই, তাদের মনোজগতের পরিবর্তনের সাথে পরিচিত হই, তাদের ভালবাসা দেই। তাদের পাশে থাকি, তাদের সত্যিকারের মানুষ বানাই।

লেখাটি ১১,৯৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.