রাজনীতিতে চমকে দিলেন মতি শিউলি

Moti Shiuli Royসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: রাজনীতিতে ‘নারী’ মানেই যেন কিসের গন্ধ খোঁজেন পুরুষেরা। যে দেশের সর্বোচ্চ রাজনীতির কান্ডারী  নারী, সেখানেও কি ব্যত্যয় আছে? চূড়ার আসনের নারীদের নিয়েও প্রতিনিয়ত নানা মুখরোচক গল্প শুনতে হয় নানা আসরে। যা শুনে মনে হয় যেন সমালোচকরা সেই নারী রাজনীতিবিদদের শোয়ার ঘরের পালঙ্কের নিচে বসে থাকেন। এমন আলোচনা থেকে বাদ যায় না তাদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ, রুচি, অভ্যাস, কোন কিছুই।

শুধু এমনটা হলে হয়তো ভালই হতো। ভেবে নেয়া যেত সমালোচকরা শিখরের সেই নারীদের আদর্শকে মডেল হিসেবে দেখতে চান নিজে নিখুঁত হওয়ার জন্য। তা কিন্তু হয় না। বরং শুধু নারী বলে তাদের হেনস্থা করেন সমস্ত  আলোচনায়। তৃণমুল পর্যায়ের একজন নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলে তাকে আরও অনেক বেশী তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। বাপ-ভাই-স্বামী ক্ষমতাধর হলে সেই ভয়াবহতা কিছুটা কমে। নচেৎ তাকে ঘিরে তৈরি হয় কাল্পনিক রোমাঞ্চের দেয়াল। সেই নারীটি যদি রাজনীতিতে দ্রুত ধাপ উতরে উপরে উঠতে থাকে তো সেই কল্পকাহিনীতে যোগ হয় কি সেই বিশেষ যোগ্যতা(!) বিষয়টি। যেখানে সেই নারীর পারিবারিক ও যৌনজীবনকেও কল্পরস ভরে পরিবেশিত হতে থাকে। যা দেখে রাজনীতিতে আসার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন অনেক নারী ভয়ে কুঁকড়ে যায়।

অথচ এই ব্যাপারে একজন পুরুষ রাজনীতিবিদ কতই না স্বাধীন! সাবেক রাষ্ট্রপতি থেকে তারেক রহমান পযর্ন্ত বাদ যায় না এমন আলোচনার দায় থেকে। তৃণমুল পর্যায়ের নেতারা যারা মনোনয়নের জন্য দৌড়াদৌড়ি করলেন তাদের অনেকেই নব্য আওয়ামী লীগ। চূড়ান্ত মনোনয়ন দিতে না পেরে প্রধানমন্ত্রীকে নাকি অনেক বেগ পেতে হয়েছে। সেই নেতাদের পারিবারিক ব্যক্তিজীবন নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নাই। যদিও তারা ক্ষমতার দম্ভের সিংহাসনে বসে দিনকে রাত করতে জানে!

কুড়িগ্রামে মনোনয়ন দৌড়ে বাঘা বাঘা নেতাদের ছিটকে ফেলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন জিতে বাজিমাত করেছেন উলিপুরের এক অখ্যাত নারী মতি শিউলি। রাজনীতিতে অংশ নেয়ার তিন বছরের মাথায় গত বছর তিনি কাউন্সিলরদের ভোটে উপজেলার সভাপতি নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান। একজন সাবেক এমপিসহ ১২ জন মনোনয়ন প্রার্থীকে পেছনে ফেলে দলের টিকেট লাভ করেন তিনি।

মনোনয়ন যুদ্ধে জয়ী মতি শিউলিকে নিয়ে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সর্বত্র চলছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মনোনয়ন বঞ্চিতদের পক্ষে কুড়িগ্রামে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মতি শিউলিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উমর ফারুক মঙ্গা ও বুড়াবুড়ি ইউপির আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ সরকার। সংবাদ সম্মেলনে মতি শিউলির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে মনগড়া ইতিহাস নিয়ে বিষোদগার করা হয়। বাদ যায়নি ড্রইং রুমের গল্পও। পর্দার আড়ালে থেকে মনোনয়ন বঞ্চিতরা এ কলকাঠি নাড়ছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

দলীয় সুত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর ও চিলমারীর আংশিক) আসনে মনোনয়ন সংগ্রহ করেন ১৩ জন। এদের মধ্যে ছিলেন সাবেক এমপি আমজাদ হোসেন তালুকদার, ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া অধ্যক্ষ নাসিমা বানু (মহাজোটের কারণে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন), উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতি শিউলী রায়, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি ফুলু সরকার, চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত আলী বীর বিক্রম, উলিপুর উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হোসেন মন্টু।

মনোনয়ন যুদ্ধে হেরে যাবার আশঙ্কায় মনোনয়ন প্রার্থীদের কয়েকজন শেষ মুহূর্তে মতি শিউলির বিপক্ষে অবস্থান নেন। দলীয় সভানেত্রীর কাছে তার বিরুদ্ধে আনেন নানা অভিযোগ। কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়ায় হতাশ এসব মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা। তাই মুখে মুখে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে মতি শিউলির বিপক্ষে নানা অপপ্রচার। তা সত্বেও বেশীর ভাগ নেতা-কর্মী দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। শুক্রবার রাতে মনোনয়ন পাওয়ার সংবাদ প্রচারের পর আনন্দ মিছিল করে দলের নেতা-কর্মীরা।

এ ব্যাপারে মতি শিউলি বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে শিষ্টাচার বহির্ভুত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি চিহ্নিত চক্র দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট  করছে। আমি এতে ভীত নই। সবার সহযোগিতায় আমি নির্বাচনী যুদ্ধে জয়ী হয়ে দলের নেত্রী শেখ হাসিনার আস্থার প্রতিদান দিতে চাই। আমি গঠনমূলক সমালোচনা পছন্দ করি। আশা করি একদিন তারা  সত্য বলতে শুরু করবে। আমি নিজেকে নারী নয়, একজন মানুষ মনে করি।

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.