কাউকে বিশ্বাস করা যায় না আজকাল

0

রামিছা পারভীন প্রধান:

এই সমাজে আরমানের মতো অনেক ছদ্মবেশী মানুষ হয়তো আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারাও হয়তো আরমানের মতোই কোনো ‘অসামাজিক কাজে’ লিপ্ত আছে। তারা হয়তো ভাবছে, কেউ দেখছে না, কেউ জানছে না। তাদের বলছি, দিন কিন্তু পাল্টে গেছে, একদিন না একদিন আপনার মুখোশ উন্মোচিত হবেই। আট বছর অনেক দেরি হলেও যে মেয়েটা সাহস করে তার সৎ বাবার অমানবিক নির্যাতনের কথা সমাজের সামনে তুলে ধরেছে, এজন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

যেদিন এই ঘটনাটা শুনেছি সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি বার বার মনে হয়েছে মেয়েরা জেগে উঠো, আর যেন দ্বিতীয়বার এই রকম ঘটনার জন্ম না হয়। মেয়েরা বলতে মায়েদেরও জেগে উঠতে হবে, জেগে থাকতে হবে। একজন মা কেন সব কিছু শোনার পর সন্তানের পাশে দাঁড়াবে না? সন্তানের কথাকে কেন গুরুত্ব দিবে না, এতে করে মায়ের প্রতি সন্তানের বিশ্বাস ও ভরসাটুকুর জায়গাটা সরে যায়। পরবর্তীতে মেয়েটার সাথে যত বড় অপরাধই ঘটুক না কেন, মেয়েটা তার মাকে আর কিছু বলতে চাইবে না। তাই আমাদের মায়েদের সচেতন থাকতে হবে, মেয়েদের কথা শুনতে হবে এবং তাদেরকে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু মা না মা-বাবা দুজনকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমার ছোট বোন পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতো। তার কাছে শুনেছি তের-চৌদ্দ বছরের একটি মেয়েকে তার বাবা ঘরের মধ্যে পরপুরুষ ঢুকিয়ে, তাকে আটকিয়ে রাখতো, এটা ছিল তার বাবার তাকে নিয়ে একটা ব্যবসামেয়েটার মা ছিলো না, সে তার বাবাকে তার কষ্টের কথা বলেও যখন ঠিক হয় না, তখন সে বাসা থেকে পালিয়ে NGO তে আশ্রয় নেয়

চারদিকের এতো এতো ঘটনার কারণে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না আজকাল। না বন্ধু, না প্রেমিক, না স্বামী, না বাবা। গোটা পুরুষ জাতিকে একটা সন্দেহের চোখে দেখতে হচ্ছে যা আমাদের জন্য কাম্য নয়। মেয়েরা কোথাও নিরাপদ না,  না বাড়িতে না বাইরে। বাসে উঠেছেন, পাশের সিটে বসা ভদ্রলোকটির বয়স পঞ্চাশ হোক আর ষাট হোক, একটু পর পর আপনার পিঠে হাত রাখে, আপনি সাবধান করে দেওয়ার পরও যখন সে চালিয়ে যায়, তখন তার কপালে চড়-থাপ্পড়ও তো জোটে। আর এই থাপ্পড়টা দিতে পেরেছিল আমার বান্ধবীর ছোট বোন। কিন্তু অনেক মেয়ে আছে লজ্জায় কিছু বলতে পারে না।  আর তখনই এ ধরনের সুযোগসন্ধানী লোকগুলো সুযোগের ব্যবহার করতে চায়।

ভারতের একটা সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রোল, যেখানে সমাজের বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো তুলে ধরা হয় সেখানে দেখেছিলাম এক স্বামী তার অফিসের পদোন্নতির জন্য বউকে তার নিজের বাসায় প্রায় রাতে অন্যজনের হাতে তুলে দেয়। এটা তার শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবাই জানতো। মেয়েটা এক সময় তার বাবার কাছে পালিয়ে গিয়ে আইনের আশ্রয় নেয়।

আবার আর একটি বিষয় ক্রাইম পেট্রোলে দেখেছিলাম, ক্লাসে মিস যখন যৌন শিক্ষা বিষয়ে সচেতনমূলক আলোচনা করছিল, তখন এগারো-বারো বছরের একটি মেয়ের চোখে মুখে ভয় ভীতি, কষ্ট, লজ্জা, আশংকা ফুটে উঠেছিল। কী যেন সে বলতে চায়, কিন্তু কিছুতেই মিসকে সে কিছু বলতে পারে না। একদিন সে মিসকে একটা চিঠি লিখে, সেখানে সে লিখেছিল তার নিজের বাবা তাকে যৌন নির্যাতন করে, সেদিন চিঠিটার কোনো উত্তর মিস দিতে পারেনি পড়ে শুধু কান্না করেছিল।

আমাদের স্কুলে এক শিক্ষক ছিল তিনি ক্লাসে আসলে আমরা ঠিকঠাক হয়ে বসতাম। কারণ উনি ক্লাসে এলে মোটা মেয়েদের কাছে গিয়ে পিঠে হাত থাপড়িয়ে বলতো, কীরে কেমন আছিস, আর মুচকি হাসতো তিনি শুধু আমাদের ক্লাসে না সব ক্লাসে এরকম করতো উনার কুনজরে আমরা খুব অস্বস্তি ফিল করতাম। উনাকে আমরা দুচোখে কেউ দেখতে পারতাম না।

অশিক্ষিত, মুর্খ মানুষদের পাশাপাশি যখন শিক্ষিত ভদ্র সমাজের মুখোশ পরা মানুষেরা এই ধরনের অসমাজিক কার্যক্রমে জড়িত থাকে তখন অবশ্যই তাদের মনমানসিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় তাই শিক্ষার শুধু বড় বড় ডিগ্রি নিজের ঝুড়িতে রাখলে হবে না, নিজেদেরকে উন্নত মনমানিসকতার পরিচয় দিতে হবেকথায় আছে দুর্জন বিদ্বান হলেও  পরিত্যাজ্য

তাই বলছি মেয়েরা নিজেরাই আত্মবিশ্বাসী ও মানসিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হও। সব রকম পরিস্থিতি যেন মোকাবিলা করতে পারো সেই সাহস অর্জন করতে হবে। এজন্য পরিবার ও প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন সচেতনামুলক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য মেয়েদেরকেই এ ব্যাপারে সমাজে সচেতনতামুলক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ছোট থেকে মেয়েদেরকে এ বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে যাতে পরবর্তীতে সে কোন খারাপ ঘটনার শিকার না হয় ।

তাই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা মেয়েরা যতই শিক্ষিত হই আমাদেরকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা সবসময় চলে চলবেই। তাই এই সমাজের মানুষের মনমানসিকতার পরির্বতন শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। আপনার ছেলে সন্তানটির পাশাপাশি মেয়ে সন্তানটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বড় করুন ।তখন দেখবেন মেয়েটার মধ্যে আর কোন সংশয় থাকবেনা, ভয় ভীতি কাজ করবে না, আপনাকে বন্ধুর মতো খোলা মনে সব কথা বলবে। তাহলে হয়তো এই সমাজ একদিন আলোর মুখ দেখবে। প্রতিটা ভোর হবে আলোকিত, প্রতিটা সকাল হবে আরও সুন্দর।

লেখাটি ১,২২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.