সহনশীল, পারস্পরিক বোধের জীবন চাই

0

শিল্পী জলি:

দেশে এসএসসি. এবং এইচএসসি’র রেজাল্ট বেরুলেই দেখি ছাত্র/ছাত্রীদের আত্মহত্যার খবর। পড়লে ভীষণ মন খারাপ হয়। ভাবি, কী করে এই বয়সে তারা আত্মহত্যার মতো একটি কঠিন পথ বেছে নিলো- একটিবার বাবা-মায়ের কথা পর্যন্ত ভাবলো না? 
জীবনের চেয়েও পড়লেখা/রেজাল্ট কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? 
কখনও হতে পারে? না-কি হয়? পরক্ষণেই ভাবি, কী জানি! মাঝে মঝে বাবা-মাওতো এমনই ভাব দেখান যে সন্তানের চেয়ে পড়ালেখাই বেশি অর্থপূর্ণ।

লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, ঘরে ঘরে বাবা-মা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের সাথে নানা উপহার জুড়ে দেন। পরিবারে পড়ালেখায় ভালো সন্তানটিকে অধিক আদর-কদরে আগলে রাখেন। আবার সেই সন্তানটিরই কখনও রেজাল্ট খারাপ হলে তাকে মানুষ করার খরচের হিসেবটি নির্ভুলভাবে তুলে ধরতেও দ্বিধা করেন না। সন্তান বড় হয় খোঁটায় খোঁটায়। তখন কোমলমতি সন্তানটির মনে নিজের জীবনের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং তার ফলাফলকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

কিছুদিন আগেই দেখলাম এক সন্তানের রেজাল্ট আশানুরূপ ভালো না হওয়ায় তার মা বলছেন, ‘পড়ালেখা করিয়ে আর পয়সা নষ্ট নয়, এবার একটি মুদির দোকানে বসিয়ে দেবো– যার পড়ালেখায় মনই নেই তার পেছনে কাড়ি কাড়ি পয়সা ঢেলে আর কী লাভ ? নিজেদেরও তো জীবন আছে, ভবিষ্যত আছে !’ 

ছেলেটি সবে খেতে বসেছিল। তার আর খাওয়া হলো না কথার চাপে। না খেয়েই উঠে গেলো সে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে আউট সাইডার হিসেবে দেখলাম সবই। ঘটনাটি আমার সামনে ঘটায় বিব্রতও হচ্ছিলাম। হালকায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম, বাইরের লোকের সামনে, এভাবে খাবার সময়, এসব উথ্থাপন করা কী ঠিক হলো? 
অবিরত তদারকি এবং যথাযথ মেন্টরিং ছাড়া কী আশানুরূপ ফলাফল এবং বিকাশ ঘটে?

বাবা-মা হলেও পৃথিবীতে সবাই কি একই রকম বাবা-মা হতে পারেন? 
না-কি সবার একই রকম প্রজ্ঞা থাকে? দেশে ক’জন বাবামাই বা নিঃশর্তভাবে তাদের সন্তানদেরকে ভালোবাসা দেখাতে সক্ষম হন?
ক’জন তাদের জীবনের উত্থানপতন, আবেগ, এবং পরিবর্তনকে বোঝেন?

একজন অটিষ্টিক সন্তানের মা যেভাবে শুধু একটি সুস্হ (সাউন্ড) সন্তানের কদর উপলব্ধি করেন, তাদের প্রতি যতোটা সহনশীল হোন, ত্যাগ করেন, সহনুভূতিশীলতা দেখান, ধৈর্যের অনুশীলন করেন, দেশের সব মা’ই কি সন্তান পালনে তেমনই দক্ষতা অর্জন করেন? না-কি সেই বোধটি হয় যে সন্তানের উপরে তার শিক্ষা বা ক্য়ারিয়ার নয়– সন্তান যেমনই হোক বাবা-মায়ের নিঃশর্ত ভালোবাসা পাবার অধিকারী!

এবার দেশে গিয়ে দেখলাম প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে ছেলেপেলে ইয়াবার নেশা ধরেছে। তাদের বেশির ভাগই কিশোর অথবা বাইশ-পঁচিশের মধ্যে বয়স। সবচেয়ে অবাক হবার মতো বিষয়টি ছিল, আজকাল নারীরা এই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। যারা নিজেরাই একেকজন সন্তানের মা। কী করে এক মা আরেক মায়ের সন্তানকে ইয়াবা সরবরাহ করেন? 
মা’ইতো-তাহলে কোথায় সেই তথাকথিত মায়ের ভালোবাসা এবং মনুষ্যত্ব? তাদের নৈতিকতা?

না হয় বাদ দেই সে কথা। আমরা সবাই-ই দেশে হিজড়া সম্প্রদায়ের অবস্হার কথা কম/বেশী জানি। দেশে একজন হিজড়াও তার নিজের পরিবারের সাথে আজীবন থাকতে পারে না। পরিবারের সম্পত্তি থেকেও তারা বঞ্চিত হয়- নিজের বাবা-মা, ভাইবোনই তাদেরকে বঞ্চিত করে। অথচ তারাও বাবা-মায়েরই সন্তান। একটি পরিবারেই তাদের জন্ম হয়, অতঃপর হয়ে যায় ভবঘুরে, নিঃস্ব।

তখন কোথায় যায় সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের সেই তথাকথিত ভালোবাসা? অথচ আমরা ক্ষণে ক্ষণে গর্ব করি, পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার কোনো তুলনা নেই, তাই মায়ের নামে জীবন উৎসর্গ করা সন্তানের কর্তব্য। ভুলে যাই মায়েরাও দোষেগুণেই সাধারণ মানুষ। সন্তানকে ভালোবাসলেও তাদের সীমাবদ্ধতা থাকে, জীবন দর্শনে ভুল থাকতে পারে, পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে, যা কখনও কখনও সন্তানের জন্যে ক্ষতিকারকও হয়।

সম্প্রতি ঐশীর রায়ের আগে একটি ভিডিও জরিপ দেখলাম। যেখানে বেশীর ভাগ টিনই তার ফাঁসি বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছে। তাদের একটিই কথা, সে যেহেতু নিজের বাবা-মাকে খুন করেছে, তাই ‘নো মার্সি’। আবেগতাড়িত মতামতে তারা একবারও ভাবেনি তার ইয়াবা আসক্তির কথা, অল্প বয়স থেকে মদ্য পানে আসক্ত হবার কথা, এবং তার মানসিক স্বাস্হ্য অথবা পরওয়ারিশের বিষয়াদি।

একজন পুলিশ অফিসারের সন্তান হয়েও সে যে ইয়াবা ধরেছিল, তাও বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, মেয়ে হয়ে। আবার ঘরেতেই সে এগারো/ বার বছরে মদ খেয়েছে বলে শুনেছি। যেখানে সন্ধ্যা হতেই দেশে মেয়ের মায়েরা মেয়ে ঘরে না ফিরলে পায়চারি করতে শুরু করে দেন, সেখানে ঐশীর মতো কম বয়সী একটি মেয়ে এতো গভীরভাবে নেশায় জড়ায় কী করে? আবার জড়ালেও তার বাবা-মা পদ্ধতিমাফিক নিরাময়ের ব্যবস্হা কতটুকু নিয়েছিলেন, সেটাও ভাবার বিষয়!

হয়তো তার ফাঁসিই বহাল থাকবে ভেবে তার বিচারের সময় ভয় পেয়েছিলাম। 
মনের মাঝে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো, যেভাবে সবাই ফাঁসির সুপারিশ করছে তাতে বিচারকও যদি তেমন করেই ভাবেন, তাহলে? তথাপি, কিছুটা সান্ত্বনা পাচ্ছিলাম টকশো এবং অনলাইনে ঐশীর সপোর্টে কিছু কথা এবং লেখালেখি থেকে। উল্লেখ্য, তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন পূর্ণবয়স্ক। ইয়াংদের মাঝে নানাদিক বিবেচনার বোধটিকে কার্যকর হতে দেখা যায়নি যেটা মানুষের ক্ষমাশীলতার দিকটিকে বিকশিত করে-সমাজের জন্যে জরুরিও।

যাই হোক, মানুষের কিশোরকাল থাকে লক্ষ জটিলতায় ভরা। শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মনের গভীরে হাজারও উথ্থানপতন ঘটে তখন হরমোনের নানাবিধ পরিবর্তনে-আমরা কতটুকুই বা বুঝি তার?

আমেরিকায় একটি কারেকশন সেন্টারে যাবার সুযোগ ঘটেছিল। মনেই হয়নি তারা ওখানে কোনো অপরাধের সাজা ভোগ করছে। শুধু ভেতরে ঢোকার সময় বোঝা যাচ্ছিল চেকিং কত রকমের হতে পারে-কঠিন অবস্হা। তবে ভেতরে তাদের জন্যে নানা ধরনের এ্যাকটিভিটির আয়োজন রয়েছে, নিয়মিত সবার মেডিকেল চেক হয়, আবার অনলাইনে নানা ক্লাস নেবার সুযোগও পায় তারা। যারা কিছুটা হাল্কা মানের অপরাধী তাদের উপরের খোলা আকাশ দেখার সুযোগ আছে, নানারকম উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের ব্যবস্হা আছে- আটকা থাকলেও জীবন গতিশীল। সেইসাথে আছে সাজা শেষে বাইরে আসবার প্রতীক্ষা। তাই হালকা নিয়ম ভঙ্গেও উদগ্রীব হয় তারা যেনো ভালো আচরণ থেকে নম্বর না কাটা যায়, সাজার মেয়াদ না বাড়ে। ভিন্ন রঙের টি-শার্ট পরায় উদগ্রীব হতে দেখলাম এক অষ্টাদশীকে-যদি এই নিয়ম ভঙ্গে তার নম্বর হারায় সেই আশঙ্কায়।

তবে বেশি/ভারী অপরাধীদের মাথার উপর আকাশ দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাদের দলের এক নারীর মারামারিতে হাতের মাংস থেঁতলে গিয়েছে। না শুনলে বুঝতেই পারতাম না, আসল ঘটনাটি কী? জানার আগে ভাবছিলাম, এ আবার কেমন ধরনের জন্মদাগ, ভয়াবহ, একেবারে তাকানো যায় না-বাপের জনমে তো এমন দেখিনি!

আমেরিকার মতো দেশে এতো নিরাপতার মাঝেও রেখে যেখানে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি জেলে কয়েদীরা কতটা নিরাপদ থাকে? আর সে যদি ঐশীর মতো কোনো তরুণী হয়, তদুপরি আপনজন হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী?

মুভিতে সচরাচর দেখি, জেলের মেয়েদের যৌনসঙ্গী হবার কাজে যেখানে সেখানে জোর করে পাঠানো হয়-এসব পুরোটিই কী কোন বানোয়াট ঘটনা? 
নাকি, কিছুটা/অনেকটাই সত্য? 
যে দেশে অসততা, ধর্ষণ, ঘুষের কালচার বেশির ভাগ মানুষেরই রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁজে পাওয়া যায়, সেদেশে ঐশীরা জেলেও কি নিরাপদ থাকে? না-কী সাজার উপর আরও বাড়তি সাজার ভাগীদার হয়- বোঝার উপর শাকের আঁটি বয়ে বেড়ায়?

আমেরিকাতে জাজদের আসামীকে সাজা প্রদানে উদ্ভাবনী এবং সৃষ্টিশীলতা ঘটাতে দেখা যায়। অনেক সময় তারা গতানুগতিক ধারার সাজাটি না দিয়ে ভিন্নধর্মী একটি সাজার ব্যবস্হা করেন। মূলত সমাজকল্যাণমূলক। সেই সাজায় আবার আসামীরও সুযোগ থাকে সাজা ভোগ করে নিজেকে শুধরে নিয়ে একজন পরিশোধিত ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার।

ঐশীও যেনো আগামীতে তেমনই একটি সুযোগ পায় কোন এক বিচারকের উদ্ভাবনী একটি সাজার মাধ্যমে।

লেখাটি ৭৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.