পুত্র সন্তানের গর্বিত মাতাপিতা, আপনাদেরই বলছি 

0

পৃথা শারদী:

আমার বোন এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিচ্ছে, ঢাকা কলেজে সিট পড়েছে। ওকে আনতে একদিন আমি গিয়েছিলাম, প্রচন্ড ভিড়। এর মাঝেও আমি একদম গেটের সামনে দাঁড়ানো, স্রোতের মতো ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিয়ে বের হচ্ছে। এক লম্বা ছেলে, পরীক্ষার্থী, অনেক দূর থেকে আমাকে খেয়াল করে যাচ্ছিল। মেয়েরা অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার বুঝতে পারে, আমিও বুঝলাম, আমলে নেইনি। ঠিক পাশ দিয়ে যাবার সময় ছেলেটা আমাকে বলে গেল, ” এই, নাম্বারটা দাও, তোমাকে ভালো লেগেছে”। 

চারপাশে এতো অশান্তি আর নিতে পারছিলাম না, বাচ্চা ছেলেটার কথা শুনে নিজেকে থামাতে পারলাম না। ছেলেটার হাত ধরে টেনে পাশে এনে বললাম ,”আমাকে তোমার ভালো লাগে? লাগতেই পারে, ভালো লাগা তো দোষের কিছু না!ফোন নাম্বার চাও আমার?” ছেলে তো ভয়ে শেষ! বারবার বলে, “আমার ভুল হইসে আপু, সরি”, আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলে আছি ছেলেটার গালে জোরে দুটা থাপ্পর মারা থেকে।

তখনো ছেলের কব্জি আমার হাতের মুঠোয়, কব্জি ছেড়ে দু আঙ্গুলে ছেলের গাল চেপে বললাম, “তোমার গালের দাড়ি এখনো ঘাসের মতো, ব্যাটা হও নাই এখনো, গালে রেজারও পড়ে নাই, জানো তুমি, আমি তোমার থেকে সাত বছরের বড়? পরীক্ষা দিতে এসেও মাথায় ফ্যান্টাসি ঘোরে? চলো, আমার সাথে,আমার বোন বের হবে, তাকে আর তোমাকে নিয়ে খেতে যাবো”।

বাচ্চা ছেলে ভয়ে প্রায় কান্না করে দেয় দেয়, মায়া লাগলো ছেড়ে দিলাম, খুব জোরে হয়তো গাল ধরেছিলাম, গালে হাত বুলাতে বুলাতে দৌড়। বাসায় এসে ঘটনাটা বলার পরে আমাকে বলা হলো, “এমন কোরো না রাস্তাঘাটে, সবাই তোমাকেই ফলো করবে”। 
এক বন্ধু বললেন, “ তাই বলে রাস্তায় সিন ক্রিয়েট! এগুলো কী!”
আমি অবাক হয়ে বলি, “আর আমার সাথে যে একটা ছেলে এমন টিজ করে চলে যাচ্ছিল, সেটা কী!”

মোদ্দা কথায় আসি, এমন ঘটনার শিকার হয়তো আমরা প্রায়ই হই, আমরা পাত্তা দেই না, মাঝে মাঝে ভাবি, আরে, বাচ্চা ছেলে, বাদ দেই। আসলেই কি এমন ঘটনা বাদ দেয়ার মতো? একবারও কি মনে হয় না, এসব বাচ্চা ছেলেরাই পরবর্তীতে মেয়েদের হ্যারেস করতে আরো এক পা আগানো থাকবে? আমরা ভেবেই নিচ্ছি ছেলেরা এমন করবেই! কেন ছেলেরা এমন করবে? তারা কি দানব নাকি? তারা কি পরিবার থেকে উঠে আসেনি? তাদের কি সেই শিক্ষাটা দেয়া হয়নি যে কাকে মা ডাকতে হবে, কাকে বোন বলতে হবে, রাস্তায় কোন মেয়েকে দেখলেই তাঁকে দু’টো কথা শোনানো অন্যায়?

একই পরিবারে একজন মেয়ে যথেষ্ট পরিমাণ আদবকেতা জানা হলেও, সেই পরিবারের ছেলেই বিক্ষিপ্ত অরুচিশীল মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। আমরা সবাই জানি শিশুরা অনুকরণ প্রিয়, ছোটবেলা থেকে যদি একজন ছেলে শিশু দেখে আসে তার মায়ের প্রতি তার বাবার ব্যবহার ঠিক শোভন নয়, কথায় কথায় তার মা’কে হেয় করা হচ্ছে, গা’য়ে হাত তোলা হচ্ছে, তো ছেলেটা শিখবে কী? এমন ছেলের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক কতটা ভালো হবে? তার মাথায় অজান্তেই নারীর প্রতি শ্রদ্ধাভাব কমে যাবে। একজন ছেলেকে এমন বর্বর এক মানসিকতার অধিকারী করে তুলতে আমরাও কি দায়ী নই? এই সমাজ কি দায়ী নয়?

আমরা এই সমাজে বসে থেকে মেয়েদের অনেক কিছু শিখিয়ে যাচ্ছি। এই পরিবার, এই সমাজ একজন মেয়েকে জন্মের পর থেকে বুঝিয়ে আসছে, তুমি মেয়ে, বুকে কাপড় দিয়ে চলো, মাথা নিচু করে চলো, উঁচু গলায় কথা বোলো না, জোরে হেসো না, একা কোথাও যেয়ো না, সেই সমাজ এবং পরিবারকে বলি, গোড়া কেটে আগায় জল ঢাললে কখনোই কোনো লাভ হয়নি, হবেও না। ছেলেদের মানসিকতাটা বদলে দিন।

একজন মেয়ের শরীর-মন সবটা জোর দিয়ে বন্ধ করেও যখন সমাজের এসব নোংরামি কমানো যায় না, বরং বেড়েই চলে, তখন বুঝতে হবে দোষটা মেয়েটির নয়, দোষটা মেয়েটির পোশাকের নয়, মেয়েটির মানসিকতার নয়, বরং দোষটা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের, দোষটা পুরুষের।

পরিবারের স্বামী মহাশয় আপনাদের প্রতি অনুরোধ, সহধর্মিনীর সাথে এমন কোনো ব্যবহার করবেন না, যা আপনার সন্তানের মনে দাগ কেটে যায়, কিংবা যে ঘটনাটির দ্বারা আপনার সন্তান প্রভাবিত হয়। বৌ পেটানো, পারভার্টেড বাপেরা যদি পুত্রের রোল মডেল হয়, তো সে ছেলে একজন কুলাঙ্গার হবে না তো কে হবে!

আপনারা আপনাদের ছেলেদের বোঝান যেখানে সেখানে, যাকে তাকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে যাওয়া কোনো সভ্যতার মধ্য পড়ে না, রাস্তা-ঘাটে একজন মেয়ের ওড়না ধরে টান মারা কিংবা তাকে কোনো বাজে ভাষায় দুটো কথা বলে দেয়াতে পুরুষত্বের প্রকাশ নয়, বরং পুরুষত্বের দৈন্যতাই প্রকাশ পায়।  

আমরা সবাই মাঝবয়সী পুরুষ কিংবা উঠতি বয়সী যুবকদের দ্বারা কম বেশি কথায় কিংবা শারীরিকভাবে হ্যারেসড হই , হয়তো মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করি, মাঝে মাঝে ছেড়ে দেই, আমরা ভাবি বয়সের দোষ। আসলে বয়সের দোষ না, মানসিকতার দোষ, আগে সাহসটা থাকে না, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাহস বাড়তে থাকে।

আপনারা পুরুষেরা নিজেদের মানসিকতাটা বদলান, যা দেখবেন সামনে তার দিকে হাভাতের মতো কেন হুমড়ি খেয়ে পড়েন? মেয়েরা কি কোন খাবার নাকি? নাকি আপনারা অভূক্ত? এতো শরীর লাগে?

অভিভাবকগণ নিজের ছেলের মানসিকতার লাগাম ধরুন , নয়তো নিজেরাই পস্তাবেন। দিন শেষে শক্ত এঁটেল মাটির ঢেলা দিয়ে নিশ্চয়ই আপনি কোন ফুলদানি বানাতে পারবেন না, না? ছেলের মা-বাপ হয়েছেন, দয়া করে ছেলেটাকে পুরুষ না বানিয়ে, মানুষ বানান।

লেখাটি ৭,৯২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.