মা দিবস ও নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া জৈবিক দায়

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

মাতৃত্ব কি নারীর একমাত্র পরিচয়? অবশ্যই না। কিন্তু মাতৃত্ব নারীর গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই মাতৃত্বের মাধ্যমেই এই ধরাধামে নারী মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে। নারী প্রতি পুরুষের বা পুরুষের প্রতি নারীর যৌণ আকাঙ্খার মূল উদ্দেশ্যও তাই। যেমন, এই প্রাণীকুলের অন্যান্য প্রাণীর।

মাতৃত্বে নারীর ভূমিকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, নারীর মতামত ততটাই উপেক্ষিত। নারী এই দায় নিতে চায় কিনা বা এই দায়িত্বের জন্য সে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা সেটা জানার স্বদিচ্ছা এই সমাজের নেই। তাই, নারীর চাওয়া না চাওয়াকে থোরাই কেয়ার করে মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার দায় চাপানো হয়েছে নারীর উপর। এবং নারী প্রজাতি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেই দায় পালন করে।

মানব প্রজাতি টিকিয়ে রাখার সেই দায় পালন করতে গিয়ে নারী কি ভীষণ অমানুষিক এবং অমানবিক পরিশ্রম এবং যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যায়, কতটা সে ত্যাগ করে বা করতে বাধ্য হয় সেটা এই সমাজ, যারা কিনা নারীরই গর্ভের ফসল, বুঝতে এবং মানতে নারাজ। তাই নারীর মাতৃত্বে পুরুষের একটা স্পার্মের অবদান নিয়ে আস্ফালনের শেষ নেই।

“জাতে মাতাল তালে ঠিক” এই সমাজ নারীর “মাতৃত্ব”কে যতটা মহত্বের মোড়কে সাজায়, ঠিক ততটাই এড়িয়ে যায় সেই মাতৃত্বকে যথাযথ সম্মান ও প্রাপ্য অধিকার দেয়ার বিষয়টি। যে কারণে নিজের “মা”কে নিয়ে মানুষের (বিশেষ করে, পুরুষের) যতটা আবেগীয়, লোকদেখানো প্রকাশ থাকে, অন্যের “মা” কে নিয়ে ঠিক ততটাই অবজ্ঞা আর অসম্মান দেখায়। তাই কাউকে গালি দেয়া থেকে শুরু করে অন্য যেকোন রকম ঝাল মেটাতে আমরা সেই মাকেই আক্রমণ করতে দেখি। অন্যের মাকে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ করে এবং করার হুমকি ধামকি দিয়ে বিকৃত আনন্দে ভেসে যেতে দেখি। নারীর মাতৃত্ব যে কেবল ক্ষণিকের যৌণ তৃপ্তির ব্যাপার নয় সেটা অনেকেই বুঝতে অক্ষম। প্রকৃতির এই চাপিয়ে দেয়া ভূমিকাকে মানব সমাজ নারীকে অবদমন করে রাখার হাতিয়ারে পরিণত করেছে। নারীও সেটা মেনে নিয়েছে বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

নারীর মাতৃত্ব নিয়ে সমাজ যতটা কাব্য করে, ততটা নারীর বাস্তবতা উপলব্ধি করে না। বেশি ঘাটাঘাটি করলে অভিযোগের আঙ্গুল যখন সমাজের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এবং মতলববাজীর দিকে ওঠে তখন আবার এই সমাজই সেটা ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাতৃত্বের যে জোয়াল নারী একা টেনে চলেছে, সেখানে কাঁধ দিতে তাদের ভয় হয়। গাঁয়ে পড়ে কেইবা কষ্ট নিতে চায়?

সন্তান ধারণের জৈবিক দায়িত্বের ভার ও এর গুরুত্ব আমাদের সমাজে সঠিকভাবে চিত্রায়ন করা হয় না। আর হয়না বলেই, আজ মা দিবসে সকল,

প্রকাশ্য ও গোপন ধর্ষক মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

ধর্ষণের সমর্থনকারী পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

ধর্ষণের সমর্থনকারী নারী মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারী নির্যাতনকারী পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারী নির্যাতনকারী নারী মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

শিশু যৌন নির্যাতনকারী পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

ধর্ষণকে পুঁজি করা কর্পোরেট ব্যবসায়ী ও মিডিয়া মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

ভীড়ের মাঝে নারীর শরীরে হাত বুলানো পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

ধর্ষণে নারীর পোশাকের দিকে আঙ্গুল তোলার দল মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

এসিড নিক্ষেপকারী পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

বউ পিটানো পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারীকে ঘরে আটকে রাখা পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারীকে ঘরে আটকে রাখা নারী মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

অনলাইনে এবং অফলাইনে নারীকে ধর্ষণের হুমকিদাতারা মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারীকে খাবারের সাথে তুলনাকারী সকল পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নিজেকে লোভনীয় খাবার হিসেবে মেনে নেয়া সকল নারী মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নারীকে নিজের সম্পত্তি মনে করা সকল পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নিজেকে পুরুষের সম্পত্তি মনে করা সকল নারী মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

নিজের পরিবারের নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

পতিতালয়ে গমনকারী পুরুষ মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।

জানাবে এমনি আরো অনেকে।

বছর ঘুরে মা দিবস আসে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে কর্পোরেট দুনিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে মাকে শুভেচ্ছা জানাতে। কিন্তু সেই উৎযাপনে মায়েদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যান্য দিবসের মতো সভা সেমিনারে, র্যালীতে, টকশোতে মায়েদের উপস্থিতি দেখা যায় না। তাদের দাবী দাওয়া, পাওয়া না পাওয়া, ইচ্ছা- অনিচ্ছা আলোচিত হয় না।

মাতৃত্বের সঠিক ডেমোনেস্ট্রেশন দরকার, দরকার মাতৃত্বের ভূমিকার সঠিক বিনির্মাণ। দরকার সেই জৈবিক দায় পালনের সঠিক স্বীকৃতি।

মায়েরা আসুক প্রকাশ্যে, রাস্তায়, সভা সেমিনারে, টকশোতে। প্রয়োজনে অস্বীকার করুক এই জৈবিক দায়ের বোঝা। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিক সমাজের দিকে, সভ্যতার দিকে। নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া দায়িত্বের প্রকৃত স্বরূপ উৎঘাটিত হোক।

লেখাটি ১,৭৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.