সাহেরা কথা – ০৯

Bangali nariলীনা হক: আমার মা এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে, আমাদের সাথে কিছুদিন থাকবেন। আমাদের সাথে মানে আমি অনেকদিন থাকবো না দেশে- মা আমার মেয়ের সাথে থাকবে যাতে মেয়েটার পড়ালেখার অসুবিধা না হয় আমি দীর্ঘ সময় না থাকাতে। গতকাল ঘরবাড়ী পরিষ্কার করছিলাম, মায়ের জন্য ধোয়া বিছানা, পরদা, তাঁর জন্য বসে অজু করার টুল, মগ ইত্যাদি। ক্লজেটের একটা তাক খালি করা মায়ের কাপড় রাখার জন্য এই সব আরকি। যথারীতি সাহেরা আমার সঙ্গী। এটা সেটা আলাপ করি আমরা।

সাহেরা গল্প করে তার মায়ের। রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে তার মা থাকে। সাহেরার কথায় আন্দাজ করি তার মায়ের বয়স হবে ৫০ এর মতন বা কম ও হতে পারে। সাহেরার মা ফুলেছা তার নাম, যদিও কোনদিন তার নামের পরিচয় প্রয়োজন পরে নাই। মাত্র বছর ছয়েক আগে জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির সময় নামটি জানা যায়। ১১ বছর বয়সে সাহেরার মায়ের বিয়ে হয় কৃষক মন্তাজ আলীর সাথে। ২৪ বছর বয়সী মন্তাজের দ্বিতীয় বিয়ে এটা। প্রথম স্ত্রী মারা গেছে বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, কোন সন্তান নাই। সাহেরার মা ‘সন্দর’ দেখতে তাই দোজবরে মন্তাজকে কোন টাকা পয়সা দিতে হয় নাই সাহেরার নানাকে। সাহেরার মা লেখাপড়া জানে না, তবে কোরআন পড়তে পারে। নামাজ ও পড়ে। সাহেরার মা জীবনে প্রথম বাড়ীর বাইরে আসে তাদের ইউনিয়নের বাজারে- কোন একবার বন্যার পরে রিলিফের কাপড় নিতে। সাহেরার ভাইটি তখন পেটে সাত মাস বা আরও একটু বেশী। সেই রিলিফের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার কারনে সময়ের আগেই প্রসব হয়ে যায়। কারন হিসাবে জানা গেছিলো, সাহেরার মা ক্লান্ত হয়ে যেখানে বসেছিল সেটা ছিল ঝাঁকড়া এক তেঁতুল গাছ, পেত্নী নজর করেছিল পোয়াতি নারীর উপরে – আল্লাহর অশেষ রহমতে দুই মেয়ের পরের এই পুত্র সন্তানটি রক্ষা পায়। মানত করেছিল সাহেরার মা, ছেলের বয় বার না হওয়ার আগ পর্যন্ত সে আর বাইরেরে পৃথিবীতে পা রাখবে না।

এর পরে সাহেরার মা আর কোনদিন বাড়ীর বাইরে পা রাখেনি। সাহেরার বাবা, প্রান্তিক কৃষক, সম্পদের জোর না থাকলেও মেজাজের জোর ছিল পাকা বাঁশের মতন। কথায় কথায় সাহেরার মাকে ‘ডাঙায় (পিটায়)’। অবশ্য এখন আর করে না। এই জন্য না যে সে এখন তার স্ত্রীকে সন্মান করে, মূল কারন তার নিজের শরীরের শক্তিই কমে গেছে তো বউকে পেটানোর মতন জোর আর নাই। ছোট বেলায় খাবারের কষ্ট ছিল তাদের খুব। সারাবছর কোন ক্রমে দুই বেলা খেলেও মঙ্গার সময় এক বেলা বা না খেয়ে কেটেছে তাদের কতদিন। মা জাউ রান্না করবো অনেক জল দিয়ে যাতে পরিমানে বাড়ানো যায়। কচু সেদ্ধ আর মেটে আলু সেদ্ধ খেত তারা। কোনদিন যদি চিনার বা কাউনের খুদের ভাত হতো একমুঠো, সেটা বরাদ্দ থাকতো বাবার জন্য, কিছু উচ্ছিষ্ট থাকলে ভাইয়েরা পেত। মা, বেশীর ভাগ সময়, জল পেটে গুয়া চিবাত তামাক পাতা দিয়ে- এতে খিদে মরে যায়। সেই সব দিনে মায়ের সাথে তারা অন্যের বাড়ীতে যেতো কাজ করতে, মা কাজ করতো- তারা বসে খেলত বাইরের উঠোনে। অপেক্ষা করতো কখন মা কিছু খুদ নিয়ে আসবে।

উত্তর বঙ্গের শীত বিখ্যাত কি কুখ্যাত, সারা শীতে গায়ে দেয়ার জন্য তাদের পরিবারে একটা মাত্র আলোয়ান ছিল যা বাবা গায়ে দিত, মা শাড়ী পেঁচিয়ে জতখন সম্ভব চুলার পারে থাকতো। সাহেরার মা সারাজীবন দুটির বেশী কাপড় পড়তে পায় নাই। কোন জেওর (গহনা) নাই তার, নাকে এক ফোঁটা নাকফুল আর হাতে দুটো পেতলের চুড়ি। ‘বিয়াত্যা মাইয়াছাওয়ার নাকে ফুল না থাকলে আর হাত খালি থাকলে স্বামীর অমঙ্গল হয়!’ ইদানিং বাতের ব্যথার কারনে তার মা রাবারের গোলাকার চুড়ির মতন জিনিস পায়ে পরে। সাহেরার বাবার তেমন কোন বদভ্যাস নাই বউকে পেটানো ছাড়া, গুয়া-পান ( পান সুপারী) আর তাম্বাকু ( তামাক) সেত সকল পুরুষ এমনকি গ্রামের বয়স্ক নারীরাও অভ্যস্ত। হাটে বাজারে গেলে তার বাবা কোনদিন ‘পাড়ায়’ – ‘যৌন কর্মীর’ কাছে গেছে বলে তারা শোনে নাই। তবে তার কাকা জ্যাঠারা যেতেন বলে শুনেছে। তার এক কাকা একজনকে বিয়েও করেন, সাহেরার ভাষায় ‘ সাঙ্গা’ করেছিলেন।

তবে আমার কাছে স্বীকার করতে তার লজ্জা নাই, সম্পর্কে ফুফু হয় তার, বিধবা, বাবার নাকি সেই বিধবা কাজিনের সাথে ‘ আশনাই’ ছিল। সাহেরারা তখন ‘গেন্দা’ – অত মনে নাই, মনে পরে মা কাঁদত আর ওই সব দিনে বাবা মাকে প্রচণ্ড প্রহার করতো। শুনেছিল বাবা বিয়ে করবে সেই ফুফুকে কিন্তু এর মধ্যে সাহেরার মা পুত্র সন্তান জন্ম দেয়ায় সেই ফাঁড়া কেটে গেছে। সাহেরার মা ৪০ দিন রোজা রেখেছিল যাতে ছেলে সন্তান হয় আর ওই ‘ডাইন’ – ডাইনীর কবল থেকে তার স্বামী ছাড়া পায়। সাহেরা মন্তব্য করে,’ পুরুষ পোলার ঘর ( পুরুষ মানুষের জাত) ওমার (তাদের) নোলা বেশী!’ তবে এক অর্থে সাহেরার মা সুখী একজন নারী। সাহেরার ভাষায়’ ‘ঘরে সতীন নাই, তিনটা জুদিন বা মাইয়া হইছে, বেটা ছইল ছাওয়াও আছে দুই খান। সোয়ামীর ওজগারেই (রোজগারেই) খেয়েছে সে। নিজের ঘরেই থাকে। এখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে। রোজগার পাতি করে। মায়ের এখন পাঁচ খান শাড়ী, গায়ের চাদর এক খানা, পঞ্জ (রাবারের চপ্পল) এক জোড়া, বাইরে পরবার ভালো জুতা একজোড়া। গত ঈদে সাহেরা মাকে একটা বিছানার চাদর কিনে দিয়েছে – ফুল তোলা, বিছানার চাদরের সাথে মিলিয়ে তার বোন মাকে কিনে দিয়েছে নেটের ফুলেল মশারী।

তবে তার মা সেই চাদর বা মশারী ব্যবহার করতে চায় না, ট্রাঙ্কে তুলে রাখে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে। ঢাকা থেকে বাড়ী যাওয়ার সময় তারা সাধ্যমত মায়ের জন্য পাউডার দুধের প্যাকেট, গুড়া চা, সেমাই, চিনি, বিস্কুট, চানাচুর নিয়ে যায়। মায়ের ইদানিং চায়ের নেশা হয়েছে। বাবার সাথে এই নিয়ে খিটি মিটি লেগেই থাকে। বাবা মনে করে ‘আক্কুশী (রাক্ষুশী) বেটিছাওয়া খান এই সব বড়লোকি করে ছোআলের ঘরের ( সন্তানদের) কামাই নষ্ট করবার তালে আছে। নিভৃত সেই গ্রামে জীবন কাটানো মায়ের বড় শখ, রংপুর এখন দেশের ‘আজধানী’ ( রাজধানী) হয়েছে- মা সেই রাজধানী রংপুরে যেতে ইচ্ছা পোষণ করে আর মায়ের বড্ড ইচ্ছা একটা বই ( মুভি) দেখা সিনেমা হলে বসে।

জিজ্ঞেশ করি, মাকে কি কোনদিন তারা সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে? সাহেরা অবাক চোখে তাকায় আমার দিকে, ‘ আফা, কি যে কন তোমরা! তোমার মা আর আমার মা কি এক হইল! কেঙ্কা করি নিইম ওমাক সিনেমা দেখাতে! এই বয়সে মাইয়া মানুষ সিনেমা দেখতে শহরে গেছে জানলে গ্রামের হুজুরের ঘর ( গ্রামের মসজিদের হুজুর) শুনলে পরে ‘তেলেসমাতি’ করবে। সাহেরার মা হয়তো আরও ১০ বা ১৫ বা ২০ বছর এই পৃথিবীর আলো দেখবেন।

কিন্তু সেই আলোর কত টুকু ছোঁয়া নিজের হৃদয়ে ধারন করতে পেরেছেন তিনি সেই প্রশ্ন মনের মধ্যে নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমার নিজের মায়ের জন্য সারপ্রাইজ ইভেন্ট প্ল্যান করি- মাকে নিয়ে খেতে যাব বাইরে আর যমুনা সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখাতে হবে মাকে। মা সিনেমা বড্ড বেশী ভালবাসেন। সাহেরার মায়ের জন্য এই লেখাটিই কি যথেষ্ট নয়!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.