অটিজম অপুষ্টিজনিত রোগ

0

শাহমিকা আগুন:

আমার চারপাশে পুলিশ ঘেরাও দিয়ে রেখেছে। পুলিশের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কত কত উৎসুক মুখ! আমাকে দেখার চেষ্টা করছে। মাঝখানে অসহায় আমি । হাপুস হয়ে কেঁদে চলেছি। মনে হচ্ছে এখনই হার্ট বিট বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি আমার ছেলেকে হারিয়ে ফেলেছি। ও আমার সঙ্গেই ছিল। এক মুহূর্ত আগেও ছিল। এরপর এক সেকেন্ডের মধ্যে গায়েব হয়ে গেল। কেমন করে চলে গেল! আর কি ফিরে পাব তাকে! তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে। পুলিশের দল আর আমার বন্ধুরা সবাই খুঁজে চলেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের বাচ্চার কোনো পাত্তা নেই! আমি বুকের বাঁ পাশে বেশ জোরে জোরে ঝাঁকুনি অনুভব করছি। তার মানে আমার হৃৎপিণ্ডে ঝড় বইছে। রক্ত প্রবাহ ঠিকমত হচ্ছে না। আমি বুঝতে পারছি মিনিট দুয়েক এর মধ্যে আমার হার্ট এটাক হতে চলেছে। এমন সময় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল।

পুলিশ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, ’তোমার ছেলেকে পাওয়া গেছে।“ আমার টানটান শিরা –উপশিরা একটু ঢিলে হলো। হৃৎপিণ্ডের মাঝখানে রক্তোচ্ছাস টের পেলাম। পাওয়া গেছে ওকে তাহলে! আহা! আনন্দ! কিন্তু! এটা ইংল্যান্ড। এখানে বাচ্চা হারালে এতো সহজে পার পাওয়া যায় না। আমাকে নেয়া হলো পুলিশ স্টেশনে। পুলিশ আমাকে জেরা করবে। যদি বাচ্চা হারানোর কারণ সন্তোষজনক না হয়, তাহলে বাচ্চা আমার কাছে দেয়া হবে না। কেননা আমি দায়িত্ব জ্ঞানহীন মা বলে প্রমাণিত হব।

মনে হচ্ছিল, হার্ট এটাকটা এতো কাছে এসে পালিয়ে গেল কেন! ছেলে নাকি ট্রেনে করে অনেক দূরে আরেকটি স্টেশনে চলে গেছিল। যাক। ছেলেকে সামনে আনা হলো। ছেলেকে দেখে কাঁদবো, না হাসবো, বুঝতে পারছি না। ছেলে আমার নির্বিকার। আমাকে দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে বললো, ‘মা আমি এডভেঞ্চার করে এলাম। পুলিশ আমাকে তাদের গাড়িতে করে নিয়ে এসেছে। আমি আবার পালাবো মা।‘ আবার!

আমার সারা শরীরে মনে এবার সত্যি মৃত্যুর শীতলতা নেমে এল। এর মধ্যে পুলিশ শুরু করলো জেরা। তারপর কেস ফাইল করে পাঠানো হলো সোশ্যাল সার্ভিসে। একসময় আমি আমার এলাকার সোশ্যাল সার্ভিস  ‘এলকোহল ও ড্রাগ‘  টিমের সাথে কাজ করেছি। তবু সোশ্যাল সার্ভিস শুনে গলা শুকিয়ে গেল। তদন্ত শেষ করে পুলিশ আমাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মা মনে করেনি। পুলিশ আমার হাতে আমার ছেলেকে তুলে দিল।

আমি ক্ষত-বিক্ষত মন নিয়ে সেই রাতের সমাপ্তি দিলাম। আর মনে মনে ভাবছি কাল আমার জন্য আর কোন নতুন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে! একটা কথা এখানে বলি, এটাই আমার ছেলের প্রথম হারিয়ে যাওয়া নয়। দুই বছর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত পনের বার সে হারিয়ে গেছে। বাসা থেকে দরজা খুলে সে চলে গেছে, রাস্তা থেকে, শপিং সেন্টার থেকে, যাদুঘর থেকে, বৈশাখী উৎসব থেকে, পার্ক থেকে কতবার যে সে চলে গেছে! এবার নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি আবার কেমন মা! বলতেই পারেন। আমি তা শুনে শুনে এখন অভ্যস্ত।

আমি বা আমার মতো অটিস্টিক শিশু যাদের আছে, সেসব মায়েদের প্রত্যেকেই মাতৃত্বের কোন না কোন পর্যায়ে এই মন্তব্য শুনছি, শুনেছি। প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে মাতৃত্বের মাপকাঠিতে বসতে হয়, বসানো হয়। ভাল মা! না খারাপ মা! বাচ্চার বাবা বলে, শ্বশুর শাশুড়ি বলে, পুলিশ, সোশ্যাল সার্ভিস, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত, অপরিচিত কেউই আমাদের ছেড়ে কথা কয় না। কেন সন্তানকে চোখে চোখে রাখতে পারি না। কেন আমার সন্তানই হারাবে বারবার! এই মাতৃত্বের পরীক্ষায় বসতে বসতে আর সন্তানকে আগলে রাখতে রাখতে নিজের যে একটা জীবন আছে বা অস্তিত্ব আছে, তা কখন যে ভুলে গেছি জানি না!

আমি একা নই। আমাদের যাদের অটিস্টিক শিশু আছে আমরা সবাই ভুলে যাই। আমাদেরকে বা আমাদের শিশুদেরকে ভালবেসে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। বলা হয় অটিস্টিক বাচ্চাদের ব্যবহার বা আচার-আচরণ অপ্রতিরোধ্য! তাই কারো কোন আনন্দঘন মুহূর্তে আমাদের দাওয়াত দেয়া হয় না। কেন না কেউ তাদের আনন্দঘন মুহূর্ত নষ্ট করতে চায় না। আমরা দাওয়াত দিলেও মানুষ আসতে চায় না। আমরা হয়ে পড়ি অচ্ছুৎ একঘরে। একজন শিশুকে হুইল চেয়ারে দেখলে সেই শিশুর প্রতি বা তার বাবা-মায়ের প্রতি মানুষের ভালবাসা সহমর্মিতা উপচে পড়ে। একজন অটিস্টিক শিশু দেখলে মানুষ হয়তো পাগল ভেবে সেই শিশুর আচার-আচরণ চুকচুক করে উপভোগ করে, হাসাহাসি করে, নয়তো ভয় পায়, নয়তো পাশে থাকা মাকে গালি দেয় বাচ্চাকে সামলাতে না পারার জন্য। ভালবাসা সহমর্মিতা আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মতো।

অটিজমের সাথে বসবাস এখন প্রায় পাঁচ বছর। আমার ছেলের পাঁচ বছর বয়স থেকে অটিজম তাকে পেয়ে বসে। অটিজম যে কোনো বয়সে হতে পারে। অন্যসব মায়ের মতো আমিও কেঁদেছি। ভয় পেয়েছি। বাচ্চা নিয়ে ঘরে-বাইরে অপদস্থ হয়েছি। দিনের পর দিন একাকিত্বে ভুগেছি। ভাগ্যকে দায়ী করেছি। তারপর একসময় সব ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছি। নিজের ছেলেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছি। কেউ আমার ছেলের সঙ্গে খেলে না। আমি নিজেই ফুটবল নিয়ে পার্কে গিয়ে ছেলের সঙ্গে খেলেছি। ছেলেকে ঠিক করে বলে লাথি মারা শিখিয়েছি। এতো সহজ ছিল না। কারণ বলে লাথি মারার বদলে ছেলের খেয়াল ছিল বলটিকে অন্যদের গায়ে ছুঁড়ে দেয়া। কিংবা আশে পাশের সব কিছুর পেছনে ছুটে চলা। মানুষের গালি খেয়েছি। কিন্তু ছেলেকে শিখিয়ে ছেড়েছি। ছেলে আবেগ- অনুভূতি কিছুই বুঝতো না। আমি ফ্রোজেন ছবিটি ছেলেকে নিয়ে তিনশ চল্লিশ বার দেখেছি। প্রতিটি  শব্দ প্রতিটি সিকোয়েন্স ওকে বুঝিয়েছি। যতটা সময় দিয়েছি ততোটা ফল পেয়েছি। আমার ছেলের অটিজম না হলে এ পথে আমার হাঁটা হতো না। এতো কিছু শেখা হতো না।

শুরুতে যে ঘটনাটি লিখেছি তা দেড় বছর আগের ঘটনা। অটিজমের হাতে লাঞ্ছিত হবার পর তখন থেকেই ঘুরে দাঁড়াই। আমার এতো সুন্দর ছেলেকে দিনের পর দিন অটিজম খেয়ে নেবে আর আমি তা বসে বসে দেখবো, তা হবে না। ডাক্তার বা শিশু বিষেশজ্ঞ কিছু করতে পারেনি। নিলাম তাকে বিভিন্ন থেরাপিস্টদের কাছে। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ক্রেনিও-সেক্রাম থেরাপিস্ট, স্পিচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, বিহেভিয়ার থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, রিফ্লেক্সোলজিস্ট কাউকেই বাদ দেইনি।

খুব কি উপকার পেয়েছি? না। কারণ সবাই চেষ্টা করছিল তার ব্যবহারকে আয়ত্তে আনতে। আমি বুঝতে পারছিলাম অটিজম আয়ত্তে আনতে হলে আগে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ কী! সেখানে কেউ পৌঁছাতে পারছিল না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি নিজেই বিশেষজ্ঞ হবো। আমি পেশায় পুষ্টিবিদ। খাবার এবং শরীরে এর রহস্য নিয়েই আমার কাজ। শুরু হলো আরেকটি পথ-পরিক্রমা। আবার অটিজম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কোর্স করেছি, ট্রেনিং নিয়েছি, কাজ করেছি, গবেষণা করেছি। নিজের মতো করে চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করেছি। আমি এখন অটিজম সম্পর্কে অনেকটা জানি, এমন দাবি করতেই পারি।

আজকের এই লেখাটি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মায়েদেরকে উৎসর্গ করে। যাদের প্রতিটি দিনই একটি নতুন লড়াই দিয়ে শুরু হয়। আমার ছেলে এখন প্রায় অটিজম মুক্ত। সে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে। প্রশ্ন করলে জবাব দিয়ে পালটা প্রশ্ন করতে পারে। সে এখন আতংকে ভূগে না। ভালবাসা, ঘৃণা , রাগ, দুঃখ আবেগ সে বোঝে। সে এখন পালিয়ে যায় না। পালানোর ঝুঁকি সে বোঝে। তার কানে এখন বারবার ইনফেকশান হয় না, নাক দিয়ে ঘন ঘন রক্ত পড়ে না। অটিজম যখন হয় তখন সে একা আসে না। ডায়াবেটিসকে যেমন নিঃশব্দ ঘাতক বলা হয়, তেমনি অটিজমও শরীরে বাসা বেঁধে শরীর ও মস্তিস্কের অনেক জায়গার মারাত্মক ক্ষতি করে দেয়। আমি এখন আমার ছেলের সেই ঘা গুলো ধীরে ধীরে মোছার চেষ্টা করছি।

অটিজমকে বলা হয় ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার । একটি শিশুর বাড়ন্ত বয়সে মানসিক শারীরিক ব্যবহারিক বিকাশে এমনভাবে বাধাগ্রস্ত করে যে শিশুটির পক্ষে নিজেকে একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে বড় হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে, সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

অনেকেই মনে করে থাকেন যে, অটিজম একটি মানসিক রোগ। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞের মতো আমিও বিশ্বাস করি যে অটিজম একটি শারীরিক অপুষ্টিজনিত রোগ, যা আঘাত করে মস্তিষ্কে এবং নার্ভে। কেন তা বলার আগে একটু বলে নেই অটিস্টিক শিশুদের লক্ষণগুলো। অটিস্টিক শিশুরা নিজের ভুবনে থাকে। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলতে বা খেলতে চায় না। কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না । বা আমাদের কথা ঠিক মতো বুঝতে পারে না। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না। একই কাজ বারবার করে, বা একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করে। খাবারে অরুচি থাকে। কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকে।  খুবই গোছানো পরিবেশ পছন্দ করে।  

তাদের ইন্দ্রিয়জনিত সমস্যা থাকে। যেমন জামা কাপড়ের কলার বা কলারে লাগনো লেবেল তাদেরকে অস্বস্তি দেয়। গরম বা ঠাণ্ডায় তারা মাত্রাতিরিক্ত রিঅ্যাক্ট করে। কাপড় পরতে চায় না। ঝুঁকি বুঝতে পারে না। সবকিছুকে হাত দিয়ে অনুভব করতে চায়, বা জিভ দিয়ে চেখে দেখতে চায়। এসব বাচ্চারা অনেক কনফিউসড থাকে এবং ভয় পায় বা সব সময় আতংকে থাকে। শিশু যত বড় হতে থাকে, তত নতুন নতুন ইস্যু যোগ হতে থাকে, যদি না একে সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা হয়!  যেমন ভয় ও আতঙ্ক যদি না রোধ করা যায়, তাহলে শিশুটি বড় হতে হতে মানসিক রোগী হয়ে পড়ে।

মস্তিস্কের যে অংশটি  পরিবেশের সাথে  বা আমাদের কর্মকাণ্ডের সাথে  ঝুঁকির সংযোগ  সৃষ্টি করে অটিস্টিক বাচ্চাদের সেই অংশটি ঠিকমতো কাজ করে না। তাহলে একে কাজ করানোর উপায় কী! এজন্য আমি কিনেজিওলজি (নিউরো-মাসল- এনার্জি  প্রোগ্রাম) এবং এন-এল-পি( নিউরো লিঙ্গুয়েটিক প্রোগ্রাম) ট্রেনিং নিয়েছি। আর আমি নিজে পুষ্টিবিদ তাতো আগেই বলেছি।

এবার  কারণগুলো বলি। কারণ জানা মানে হলো প্রতিকার জানা। একটি কথা প্রথমে বলে নেই আমরা প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা, আমাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট, হাতের রেখা , মুখের রেখা, এক্সপ্রেশন , ব্লাড গ্রুপ যেমন আলাদা , তেমনি প্রতিটি মানুষের শারীরিক সমস্যা ও সমস্যার চিকিৎসা ও আলাদা। তা মাথায় রেখেই চিকিৎসা করা উচিৎ। এখানে অটিজমের সাধারণ কারণ ও চিকিৎসার উপায়গুলো বলা হলো এবং আমি শুধু পুষ্টিগত দিকটিই আলোচনা করেছি।

অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি শোনা যায় তা হলো, ও ত বোঝে না বা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে সবার আগে বলতে হয় ‘থিওরি অব মাইন্ড’এর কথা। খুব সহজে বলতে গেলে একটি শিশু তিন বছর পর্যন্ত তার বাবা-মাকে কপি করে। বাবা-মা যা পছন্দ করে, তাই তারা করতে পছন্দ করে। কারণ তারা ভাবে বাবা-মা সব দেখতে পায়। মা সব জানে। তার ক্ষিদা পেলে মা জানে, সে ব্যথা পেলে মা জানে। তারপর একদিন শিশুটি তার পছন্দের চকলেট লুকাবে। তারপর চুকচুক করে খেয়ে নেবে। হঠাত করে সে বুঝতে পারবে যে, আমি যে না বলে চকলেটটি খেয়ে নিলাম আমার মাতো তা জানতে পারলো না। তাহলে আমি আর মা এক নই। আলাদা মানুষ। এভাবে ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে যে সে এবং প্রতিটি মানুষ আলাদা। কিছু নিতে হলে চাইতে হবে। এখানেই বাধা খায় অটিস্টিক শিশুরা। তাদের থিওরি অব মাইন্ড অন্যদের মতো করে গঠন হয় না। সে সবসময়ই ভাবে যে তার মা বা আশে পাশের সবাই জানে, সে কী চায়। তাই বলার কোন প্রয়োজন সে বোধ করে না।

অটিজম বিষয়টিই আমার কাছে মনে হয় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। চোখ থেকেও আলো না থাকলে আমরা যেমন দেখতে পাই না, অটিজম বিষয়টি তেমনই।

১৯৯০ সালে ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছেন ’মিরর নিউরন’। খুব জটিল বিষয়, কিন্তু সহজ করে বললে বলা হয় আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর এমন কিছু কোষ আছে যা কিনা মস্তিষ্কের ভেতর অন্য মানুষ ও প্রাণীর জন্য ভালবাসা, সহমর্মিতা , ভালবাসা, শেয়ারিং এসব বোধ জন্ম দেয়।  অটিস্টিক শিশুদের মিরর নিউরন সিস্টেম ঠিকমত গঠন হয় না। তাই অটিস্টিক শিশুরা মানুষের রাগ , দুঃখ, বডি ল্যাংগুয়েজ, মুখের এক্সপ্রেশন বুঝতে পারে না। তারা ভাবে তাদের চারপাশে একই মুখোশ পরা মানুষ আছে, যারা কেন কাঁদে, কেন হাসে, কেন জোরে কথা বলে, তা তারা বুঝতে পারে না। এতে তাদের মনে তৈরি হয় আতংক, ভয়। অটিস্টিক শিশুদের নিউরোট্রান্সমিটার সিরটনিন এবং ডোপামাইনের গঠনগত সমস্যা থাকে।  তাই অটিস্টিক শিশুরা ভালবাসাও বুঝতে পারে না।

সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কে ভালবাসা ও ভয় নিয়ে ভারসাম্য থাকে। ভালবাসার অনুভূতি তৈরি হয় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবে এবং ভয় তৈরি হয় এমিগডালা অংশে। অটিস্টিক শিশুদের এ দুটোর গঠনেই সমস্যা দেখা গেছে। তাই তাদের মনোজগতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহ তৈরি হয়। তারা তাই অনেক বেশি রাগ করে  বা ভয় পায় বা রাতে ঘুমাতে পারে না। এমিগডালা মস্তিষ্কের আরো অনেক অংশের ক্ষতি করে। অন্যতম হলো থেলামাস। যা  আমাদের চোখ, কান, নাক, জিহবা, চামড়া প্রদত্ত সিগনাল গুলোকে ভারসাম্যজনক ভাবে মস্তিষ্ক ও সারা শরীরে বন্টন করে অনেকটা মাকড়সার জালের মত। অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাকড়সার জালটি জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া থাকে। ফলে শিশুটি ইন্দ্রিয়জাত সব তথ্য এক করতে পারে না। যা তার শরীরে সারাক্ষণ একটি যন্ত্রণা তৈরি করে রাখে। ভয়াবহ ব্যাপার হল নিজেদের এত কষ্টের কথা তারা প্রকাশ করতে পারে না।

কথা হলো হঠাৎ করে পৃথিবীতে এত এত শিশু অটিজমে আক্রান্ত হচ্ছে কেন! অটিজমের সাথে থাকে এ ডি এইচ ডি, লার্নিং ডিসএবিলিটি , অটোইমিউন ডিজিজ, এজমা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। দেখা গেছে, অটিস্টিক শিশুদের শরীরে পারদ, লেড, এলুমিনিয়াম, আর্সেনিকের পরিমাণ অনেক বেশি। সেজন্য দায়ী করা হয় পরিবেশকে, দায়ী করা হয় টিকা পদ্ধতিকে।

মেয়েদের তুলনায় ছেলে শিশুদের অটিজম চারশ গুণ বেশি। কারণ হলো ছেলেদের ‘মেল হরমোন’ পারদ ও এলুমিনিয়ামের বিস্তারে সাহায্য করে। আমেরিকা, ইউকে’তেও এক সময় পারদকে  গর্ভবতী মা ও শিশুদের টিকায় প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরেনিয়ামের পর পারদ হলো দ্বিতীয় বিষাক্ত পদার্থ । সেই পারদকে ব্যবহার করা হয় কীটনাশক হিসেবে। আর বেশিরভাগ সোডা কোম্পানিগুলো এলুমিনিয়াম এর ক্যান ব্যবহার করে। রান্নার পাত্র এলুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি। বিদেশে বেকিং ট্রে এবং ফয়েল পেপার খুবই জনপ্রিয়। বলতে পারেন, তাহলে সব শিশুই অটিস্টিক আক্রান্ত নয় কেন? কারণ সব শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা এক রকম থাকে না। মেটাল শরীর থেকে বের করার উপায় হলো প্রচুর পানি খাওয়া এবং নতুন কোনো মেটাল শরীরে যেতে না দেয়া। শিশুকে অরগানিক খাবার দিন। বেশি করে কলা, ধনে পাতা, ডাব, নারিকেল, নারিকেল তাল, শসা, সেলেরি, জাম, স্ট্রবেরি এবং অল্প পরিমাণে স্পিরুলিনা শিশুকে দিন।

যে শিশুরা জন্মের এক থেকে দু বছর বয়সে এন্টিবায়োটিকস নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে অটিজমের হার অনেক বেশি দেখা গেছে। বাচ্চাদের পাকস্থলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।  দেখা গেছে, এর পর দুধের প্রোটিন কেসিন এবং গমের প্রোটিন গ্লুটেন ঠিকভাবে প্রসেস হতে পারে না। কেননা এর জন্য যে ডি পি পি ফোর এনজাইম প্রয়োজন, তা অটিস্টিক শিশুদের অভাব রয়েছে। আধা ভাঙ্গা এসব প্রোটিন শিশুদের মস্তিষ্কে গিয়ে চারপাশে কুয়াশার মত আবরণ তৈরি করে।

আমার ব্যক্তিগত অনুরোধ হলো অটিস্টিক শিশুদের দুধ ও গম থেকে তৈরি খাবার বন্ধ করে দিন ছয় মাসের জন্য। আমি এখনো একটি শিশুও পাইনি যার উপকার হয়নি। অটিস্টিক শিশুদের বায়ো ক্যামিকেল রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, তাদের শরীরে জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম , ক্যালসিয়াম, সেরটনিন,  ভিটামিন এ, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, ওমেগা থ্রি, সিক্স, নইন এর অভাব রয়েছে। যার কারণে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব, এমিগডালা, থেলামাস সঠিকভাবে গঠন হতে পারে না।

মনে রাখবেন খাবার অন্ত্র থেকে শোষিত হয়ে তা থেকে পুষ্টি উপাদান রক্তে যাবার যে প্রক্রিয়া, অটিস্টিক শিশুদের সেই প্রক্রিয়াতে সমস্যা আছে। তাই এই পুষ্টি উপাদানগুলো দেয়ার আগে শিশুর পাকস্থলিকে তৈরি করে নিতে হবে। তাকে এলোভেরা রস এবং প্রবায়োটিক এবং কিছু খাবারের এনজাইম দিতে হবে যেন পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তের মাধমে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে।  এক সাথে অনেক নতুন খাবার বা পুষ্টি উপাদান তাদেরকে দেবেন না। একটি দিয়ে দু সপ্তাহ পরে আরেকটি দেবেন।  ডায়রিতে লিখে রাখুন।

মনে রাখবেন বছরের পর বছর শিশুর মস্তিষ্ক ও শরীরে প্রদাহ হয়েছে। মস্তিষ্ক ভিন্নপথে হেঁটেছে। যা ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো আর শোধরানো যাবে না। কিন্তু নতুন কোন ক্ষতি আর হবে না।

মনে রাখবেন অটিজমের পথে হাঁটা এতো সহজ কাজ নয়। আপনাকে এই কাজটি সমর্পণ করা হয়েছে আপনি পারবেন বলে। এই অতি মাত্রায় অসহায় শিশুর দায়িত্ব আপনাকে দেয়া হয়েছে, কেননা প্রকৃতি জানে আপনিই সেই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল, যে সকল ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে শিশুটিকে আগলে রাখবেন। অন্য সব অটিস্টিক মায়েদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করুন। নিজের ভালো লাগার কাজগুলোও করুন। বেড়াতে যান। মাতৃত্বকে পেশা হিসেবে ভাবুন, যেখানে সমালোচনা সব সময় থাকবে। আমার ছেলে এখন আমার সঙ্গে গল্প করে। বুক ভরে যায়। আমি চাই, আমার মতো সব অটিস্টিক শিশুর মায়েদের বুকও ভরে যাক। শুভ কামনা।

লেখাটি ৬৬,৯২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.