বালিকা বিয়ের বিশেষ বিধান: বোঝার উপর শাকের আঁটি

শাশ্বতী বিপ্লব: মাননীয় সরকার বাহাদুর অপ্রাপ্ত বয়সী মেয়েদের এবং তাদের পরিবারের সামাজিক সম্মান বাঁচানোর “বিশেষ” ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। আজ হতে দেশে কন্যাদায়গ্রস্ত (!) অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা তবে কমেই গেলো। সকলে বেশ ভারমুক্ত হলাম যাহোক।

stop-violenceপ্রথমেই বলে রাখা ভালো, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করে বাল্য বিবাহ বন্ধ করা যাবে না। এর সাথে জড়িয়ে আছে নানা কাঠামোগত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনুসঙ্গ। আছে মেয়ের “বিয়ে” নিয়ে প্রচলিত “মাইন্ডসেট” এবং সর্বোপরি মেয়ে সন্তান নিয়ে পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা বোধ। কাজেই কোন একটি বিশেষ বিধান করে বাল্যবিবাহের সরকারি পরিসংখ্যান হয়তো বদলানো যাবে, বাস্তবতার তাতে তেমন কোন হেরফের ঘটবে না। আর অন্য অনুষঙ্গগুলোর উন্নতি হলে কোনো আইন না থাকলেও এই ব্যাধি স্বাভাবিক নিয়মেই কমে যাবে।

আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশেও অভিভাবক বা কোর্টের অনুমতিসাপেক্ষে ১৬ বছরে বিয়ের বিধান চালু রয়েছে। তাতে সেসব দেশে বাল্যবিবাহ মহামারী আকার ধারণ করেনি। কারণটা বোঝাও কঠিন নয়। সেইসব দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বাল্যবিবাহ বান্ধব নয়। যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। কাজেই শুধুমাত্র বিশেষ আইন কানুন বা বিধানের উপর আমার খুব একটা ভরসা নেই। তার ওপর আইনের যথাযথ প্রয়োগ যখন প্রশ্নাতীত নয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিশেষ বিধানের পিছনের ব্যাখ্যা, যা কিনা আমাদের সমাজের এই বিশেষ মাইন্ডসেট ও তার অসুস্থ চর্চাকেই আইনি সমর্থন জুগিয়েছে। এমনিতেই কমবয়সী মেয়েগুলোকে কোনরকমে পার করে দেয়ার লোকের অভাব নেই, তার উপর এই সমর্থন “পাগলকে সাঁকো নাড়াতে নিষেধ” করারই শামিল।

পরিবারের তথাকথিত সামাজিক সম্মান বাঁচানোর দায় মেয়েদের কাঁধেই তো ছিলো বরাবর। সরকার বাহাদুর খালি বোঝার ওপর শাকের আঁটিখানি জুড়ে দিলেন এই যা।

অথচ আমরা ভেবেছিলাম, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাকে বিয়ে করা পুরুষের এবং সেই পুরুষের পরিবারের লজ্জা হবে। ভেবেছিলাম, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সাথে যেকোনো উপায়ে কোনরকম যৌন সম্পর্ক স্থাপন পুরুষের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এখন এই আইন পুরুষের জন্য যত শাস্তির বিধানই রাখুক না কেন, সংযোজিত নতুন বিশেষ বিধানটি “সর্বোত্তম স্বার্থের” নামে প্রকারান্তরে অপরাধের শাস্তিটা সেই অপ্রাপ্তবয়সী বালিকাটির ঘাড়েই চাপিয়ে দিলো।

সরকার বাহাদুর বলেছেন, আদালত যদি  নির্দেশ দেন এবং বাবা মায়েরও যদি তাতে সম্মতি থাকে, তবে সেই কিশোরীটি আর “অপরিণত বয়স্ক” বলে গণ্য হবে না। তার বিয়েটাও আর অপরাধ থাকবে না। যে বিয়ের বৈধতা পাওয়ার জন্য আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে হবে, সেই বিয়ের মাঝে কী কী “সর্বোত্তম স্বার্থ” এবং “সম্মান” থাকতে পারে তাই ভাবছি। আর সেই “অপ্রাপ্ত বয়সী” মেয়েটির সম্মতি বা অসম্মতি, তার কী হবে? নাকি তার মতামতের দরকার নেই! তাকে কেবল বলির পাঁঠা বানানোটাই যথেষ্ট!!

stop-rape-3এই বিধান মতে “বিশেষ প্রেক্ষাপটসমূহ” কী কী হতে পারে সেটার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। ভালো পাত্র (!) পাওয়া বা অর্থনৈতিক সংকট? না না, এ যুক্তি বড্ড সেকেলে হয়ে গেছে, ধোপে টিকবে না। তবে কি সামাজিক অনিরাপত্তা, মানে যৌন হয়রানি থেকে বাঁচানো? পালিয়ে বিয়ে করে ফেলার সমাধান? জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এবং অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের সামাজিকীকরণ? এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে বিয়েটা আদালত যুক্তিসংগত মনে করবেন এবং কেন মনে করবেন সেটা জানতে ইচ্ছা করে।

মাননীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব “বিশেষ প্রেক্ষাপট” সম্পর্কে বলেছেন, “অবিবাহিত মা, কিন্তু তার বাচ্চা আছে” এমন মেয়ের কথা। অন্যদিকে, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবন্ধী মেয়েদের কথা।

অতি উত্তম সমাধান, কী বলেন? আমরা ভেবেছিলাম, নারী জাগরণের (!) এই সময়ে নিজের সাথে হওয়া কোনো অন্যায়ের সাথে গোপনে বা প্রকাশ্যে আপোস করবে না প্রাপ্ত বা অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা তার পরিবার। তথাকথিত “সামাজিক সম্মানের” মুখে কষে লাথি মেরে শিরদাঁড়া উঁচু করে ঘুরে দাঁড়াবে। তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় সহায় হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। কিন্তু বিধিবাম! যে সমাজে এমনিতেই নানা বেশে “তেঁতুল হুজুরেরা” সারাক্ষণ ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলছে, সে সমাজে এই রকম একটা বিধানই যথেষ্ট।

Shaswati 5
শাশ্বতী বিপ্লব

আমরা আরো ভেবেছিলাম, প্রতিবন্ধীদের সমান শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। শেষতক, কচি বয়সে বিয়ের মধ্যেই প্রতিবন্ধী কিশোরীদের সর্বোত্তম স্বার্থ নিহিত হলো তবে!!!

এখন, রাষ্ট্রের দায়িত্বটা তবে কী? এই “বিশেষ প্রেক্ষাপটের” যেকোনো একটির শিকার কম বয়সী মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে আরো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়া, নাকি মেয়েটি ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো; এবং যে বা যারা তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করা? যেসব কারণে এই “বিশেষ প্রেক্ষাপট” তৈরি হয়, তার মূল উৎপাটন করা, নাকি যেনতেনভাবে জল্লা পার করে দেয়ার পথ বাতলে দেয়া? রাষ্ট্রের এই মনোভাব কম বয়সী সেই বালিকা বা কিশোরীটির কী কী “সর্বোত্তম” স্বার্থ রক্ষা করবে সরকার বাহাদুর সেটাও একটু বিস্তারিত জানাবেন আশা করি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.