সমতার কিউবা, কিউবার কাস্ত্রো!

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: আপনি যদি কিউবায় যান, তাহলে অবাক হয়ে যাবেন যখন দেখবেন আপনার পাশ দিয়েই দিব্যি চলে যাচ্ছেন অলিম্পিকে কয়েকটা গোল্ড মেডেল জেতা আপনার ভাষায় ‘তারকা’টি। আপনি যেভাবে ‘হাই’ বলে আন্তরিকতার সাথে বন্ধুদের নিয়ে চা-খান, সেরকম চাইলেই আমন্ত্রণ জানাতে পারবেন সেই অলিম্পিকে সোনা জেতা মানুষটিকে! কারণ আর কিছুই নয়, কারণ হচ্ছে- সমতা!

castro-1কাগজে কলমে যে সমতার বাণী পড়ে এসেও আপনি রিকশাওয়ালাটিকে তৃতীয় শ্রেণীর আর সম্মান বাঁচাতে রাত্রিবেলা বাড়ির বাইরে না থাকা মেয়েটিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভেবে আনন্দ পান, সেটি নিজ দেশে অসম্ভব করে তুলেছিলেন যে মানুষটি, তিনি হচ্ছেন- ফিদেল কাস্ত্রো! সম্ভব করে তুলেছিলেন সমতার সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে, যেটি আমেরিকার নয়-নয়জন প্রেসিডেন্ট মিলেও করতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় ফিদেল কাস্ত্রো আর মুজিব দুজনেই কেঁদেছিলেন ফিদেল বলেছিলেন- ‘আই লাভ ইউ কমরেড মুজিব’ তারপর গাড়িতে উঠে নিজের টুপি খুলে চিৎকার করে বলেছিলেন ‘জয় বাংলা’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ফিদেল কাস্ত্রো পরামর্শ দিয়েছিলেন- আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ- এসব পেশার লোকদের এনে সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিন এরা ভুল করবে এবং ভুলের পর ভুল করে সঠিক শিক্ষা লাভ করবে- কিন্তু এরা ষড়যন্ত্র করবে না ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের আরও বেশি করে দায়িত্ব দিন এবং ওদের পূর্ণ বিশ্বাস করুণ নাহলে আপনি কিন্তু নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছেন এক্সেলেন্সি!

একচল্লিশ বছর আগে বঙ্গবন্ধু কাস্ত্রোর কথা ফলিয়ে দিয়ে মারা গেলেন নিজ দলের ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। এখানেই বোঝা যায়, একজন নেতা ঠিক কতোটা দূরদর্শী হলে ভবিষ্যৎ খুব সুন্দরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন!

castro-5একজন রাজনৈতিক নেতা ঠিক কতোটা বিখ্যাত হলে এতো হাজার মাইল দূরের একটা মানুষের চোখে পানি চলে আসতে পারে, তাঁকে নিজ চোখে না দেখতে পারার দুঃখে- এটা আজ বুঝলাম যখন শুনলাম- ফিদেল কাস্ত্রো মারা গেছেন! কয়েক বছর আগে কিউবান একটা ছেলের সাথে কথা হয়েছিল, যে গর্ব করে জানিয়েছিল তাঁদের প্রেসিডেন্ট বেতন পায় ৩১ ডলার, সে নিজেও বেতন পায় ৩১ ডলার! আমি অর্থনীতির মূর্খ ছাত্রী, ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে কীভাবে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করে নোবেল প্রাইজ বাগিয়ে নেওয়া যায়- সেই জ্ঞান আমার অজ্ঞাত। তবে একটা মানুষ ঠিক কতোটা জনপ্রিয় হলে সেদেশের মানুষ প্রেসিডেন্টের সততার সাথে নিজের সততার মিল খুঁজে পায় সেটি ভালোই বুঝতে পারি!

আমেরিকার মতন সুপার পাওয়ার আর ধুরন্ধর দেশের পাশে থেকে নিজেদের দেশে আমেরিকাকে নাক গলাতে না দেয়ার দুঃসাহস যিনি সম্ভব করে দেখিয়েছেন, সেই মানুষটি ফিদেল কাস্ত্রো। নোবেল বিজয়ী কিংবদন্তী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ছিলেন ফিদেলের খুব ভালো বন্ধু। ফিদেলের মাথার কাছে সবসময় থাকতো হেমিংওয়ের স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ নিয়ে লেখা বই- ফর হুম দ্যা বেল টোলস! কতোটা সংস্কৃতিবান হলে দূর দেশের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি দেশের প্রেসিডেন্টের নিজ গরজে শোভা পেতে পারে সেদেশে?

prity
জান্নাতুন নাঈম প্রীতি

ফিদেল কী কী করে দেখিয়েছেন সেই লিস্ট শোনাতে গেলে শেষ হবে না। তবে সত্যিই করে দেখিয়েছেন সত্যিকারের সমতা কাকে বলে। মানবাধিকার বলতে তাই কাস্ত্রোকেই বুঝি! বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কাস্ত্রো বলেছিলেন- আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি! আর আমি মনে মনে বলি- ৪১ বছর আগে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পর সত্যিকার বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর বুকে ছিলেন একজনই, তিনি কিউবার গনমানুষের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো!

চারিদিকে যখন তাই সমতার অসম বন্টনের হাহাকার, তখনো আমার কাছে সমতা মানে কিউবা, অধিকার মানে- কিউবার সত্যিকারের সমাজতন্ত্র আর বঙ্গবন্ধু মানে ফিদেল কাস্ত্রো!  

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.