আমি ডিভোর্সি, আমি কি সমাজে অচ্ছুৎ?

অ্যাঞ্জেল সাঁকো:

আমাদের সমাজে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীকে কতোখানি সামাজিক প্রতিকূলতা ও বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমি নিজেই। একজন নারী বা একজন পুরুষের জীবনে বিভিন্ন কারণে তালাক হতে পারে! প্রথমত পুরুষ যেমন তালাক দিতে পারে, তেমনি নারীও দিতে পারে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, তালাকপ্রাপ্তা নারী। কই, কেউ তো বলে না, তালাকপ্রাপ্ত পুরুষ!

sankho
অ্যাঞ্জেল সাঁকো

সামাজিকভাবে এই অপবাদটা নারীর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তাকে দুশ্চরিত্রা বলে কোণঠাসা করে রাখার একটা প্রবণতা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।

একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে বাড়িওয়ালা যদি শুনতে পারে মেয়েটির স্বামী নেই, ব্যস শুরু হয়ে গেলো জেরা, স্বামী নেই ভাড়া কীভাবে পরিশোধ হবে, সাথে কে কে থাকবে, বাসায় কোনো পুরুষ আসবে কিনা, এরকম নানান প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে মেয়েটিকে প্রায় ‘বিবস্ত্র’ করে বাড়ি ভাড়া না দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ডিভোর্সি নারীর এই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কোনো অধিকার নেই।

আরেকটা শ্রেণী আছে, যারা আমাদের মতো নারীদের চুলচেরা বিশ্লেষণে মশগুল থাকেন। আমার করুণা হয় সেইসব নারীদের জন্য, যারা ‘হাউজ ওয়াইফ’ নামধারী একেকজন শিক্ষিত বুয়া! এরা সমস্ত শিক্ষা আর আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে নিজেদের স্বামী সোহাগিনী ভেবে খুশিতে গদগদ হয়ে দিনশেষে শান্তির ঢেকুর তুলে ডিভোর্সি নারীর হাঁড়ির সন্ধান নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই শ্রেণীর পুরুষ ও নারীদের প্রধান কাজই হচ্ছে, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো এবং এই মহৎ কাজটা তারা করে থাকেন খুব আনন্দের সাথে।

অন্যের হাঁড়ির খবর নিতে গিয়ে নিজেদের শাড়ী এবং লুঙ্গির গিঁট্টু যে কখন খুলে গেছে, সেই খবরটাও তারা বেমালুম ভুলে যায়। এদের ঘরে হাজারটা সমস্যা থাকলেও তারা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক ডুবিয়ে দুর্গন্ধ খুঁজতে খুব ভালোবাসে।

এই শ্রেণীর মানুষের প্রধান কাজই হচ্ছে একলা থাকা নারীর হাঁড়ির খোঁজ নেয়া। আচ্ছা, এই যে নারীরা একলা থাকেন, তাদের কি কোনো ভাই, বন্ধু, মামা, চাচা, খালু থাকতে নেই? তারা কি খোঁজ নিতে আসতে পারে না তাদের মেয়েটির? কেউ একজন বাসায় এলেই কিছু মানুষ শকুনের মতো লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইট, কাঠের দেয়াল ভেদ করে তাদের কাঙ্খিত কুরুচিপূর্ণ চিন্তার বীজ বপন করে। সম্ভব হলে আরো দুই জোড়া চোখ ধার করে নিয়ে আসে বাড়তি নজরদারির জন্য।

যেই সমাজ আমাকে খেতে, পরতে, পড়তে দেয় না, আমার ব্যথায় ব্যথিত হয় না, সেই সমাজের কিছু মানুষের অগ্নিদৃষ্টিতে ভস্মীভূত হয়ে প্রতিনিয়ত সততার প্রমাণ দিতে হয়। কেন?

যুগে যুগে সীতাদেরই কেন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে তার সতীত্বের? আমার ঘরে কে এলো, কেন এলো, সেই খবর নেয়ার লোকের সংখ্যা অগনিত। দীর্ঘ বারোটা বছর এই আমি দুই মেয়ে আর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কতোটা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি, কত বেলা অর্ধাহারে, অনাহারে কাটিয়েছি তার খোঁজ কেউ রাখেনি কখনো, কোনদিন।

একজন একা মেয়ে যদি দরজা বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে, ইবাদাতরতও থাকে, তাও কিছু মানুষের মনে নোংরা চিন্তাই উঁকি মারে।

অথচ যে পুরুষ সন্তানসম্ভবা স্ত্রী রেখে অন্য নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, স্ত্রী সন্তানের প্রতি সমস্ত দায়িত্ব ভুলে গিয়ে রঙ্গলীলা করে বেড়ায়, তবুও তারাই সৎ! ডজনখানেক মেয়ের সাথে শুয়েও পুরুষদের কোনো কলঙ্ক হয় না, কারণ তাদের তো সতিচ্ছদ নাই, তাই সতীত্ব হারোনোরও ব্যাপার নাই। যত দোষ সব নারীর!

আমরা নারীরা যে জন্মের সময় একখান সতিচ্ছেদ নিয়ে জন্মেছি, তাকে পাহারা দেয়ার দায়িত্বভার এই সমাজের কিছু নোংরা মানুষ স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়ে অবলীলায় মেয়েদের দুশ্চরিত্রা আখ্যা দিয়ে তাদের গৃহবন্দী করে রাখার কাজটা করে আসছে খুব সুচতুরভাবে। আমরা নারীরা কবে সমাজের এই নোংরা আর বিকৃত রুচির মানুষ নামধারী অমানুষগুলোর হাত থেকে রেহাই পাবো? কবে আমরা নারী থেকে মানুষে উত্তীর্ণ হবো? খুব কষ্ট আর ক্ষোভ থেকে কথাগুলো লিখলাম আজ। খুব কষ্ট।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.