নায়লা নাঈম এবং স্তন ক্যান্সার নিয়ে নোংরা ব্যবসা  

তামান্না ইসলাম: ‘দেখবেন, ধরবেন, এবং চেক করবেন’ এই বাক্যটি  শুনলে কী কথা মনে আসে? এ ধরনের কথা নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সবার মনে এক ধরনের যৌন সুড়সুড়ি সৃষ্টিকারী কথাই মনে করিয়ে দেবে, হ্যাঁ মনে আসবে শরীরের যৌন উত্তেজক অঙ্গের কথা। যে দেশে ইশারায়, ইঙ্গিতে, কথায়, আচরণে অহরহ মেয়েদেরকে যৌন হয়রানি করা হয়, সে দেশে এ ধরনের একটি বাক্য যেন এক খোলা আহবান। পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর মতো একটি ব্যাপার।

মেয়েদের স্তনের সাথে জড়িয়ে বিজ্ঞাপনে এই কথা বলা আর নারী অবমাননাকারী ছেলেদেরকে তাদের নোংরামিতে উস্কে দেওয়া একই কথা।

naila-3কথা হলো, এই উস্কানির কি আদৌ কোন দরকার ছিল? এতে করে কার কি লাভ হচ্ছে? ব্রেস্ট ক্যান্সার কোন হাসি মশকরার ব্যাপার না। এটা মেয়েদের একটা  কমন অসুখ, যেটা তাদের শরীরে অনেক মারাত্মক ক্ষতিও করতে পারে, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে সময়মতো ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এর নিরাময় সম্ভব।

নিরাময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি বুঝতে পারা। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা। এই সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু কেউ যদি সেই সচেতনতা তৈরির নামে আসলে নারী দেহকে সেই পণ্য হিসাবেই দেখায়, যৌন সুড়সুড়ি দেয়, তাহলে তার মূল বক্তব্যটি আসলে ঢাকা পড়ে যায় সেই অপ্রয়োজনীয় কথা, অঙ্গভঙ্গির আড়ালে।

‘ব্রেস্ট’ অঙ্গটি  যতোটা আকর্ষণীয়, মোহনীয়, কামনার বস্তু, ‘ব্রেসট ক্যনাসার’ অসুখটি ততোটা ভয়াবহ, কষ্টদায়ক এবং না চাওয়া শারীরিক, মানসিক অবস্থা।  একটির সাথে আরেকটিকে জড়ালে এই ভয়াবহ অসুখটির গুরুত্ব মানুষের কাছে কখনোই পৌঁছানো সম্ভব না।

বাংলাদেশের বাইরে মেয়েদেরকে অনেক ছোট বয়স থেকেই ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে অনেক সচেতন হতে দেখি। এরা কিছুটা বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই এই রোগের কথা জানে। আরেকটু  বড় হলে জানে কীভাবে একে প্রতিহত করতে হয়। এদেশে ছোট বাচ্চাদের স্কুলগুলোতেও ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে শেখানোর জন্য বছরে একদিন স্কুল থেকে ব্রেস্ট ক্যান্সার দিবস ঘোষণা দিয়ে বাচ্চাদেরকে বলা হয় গোলাপি রঙের কাপড় পরে আসতে। কাপড় বা রঙটা মুখ্য নয়, শুধু তাদেরকে এই অসুখটার সাথে পরিচিত করানোটাই উদ্দেশ্য। মায়েরা গোলাপি রিবন বাঁধে গাড়িতে, ব্যাগে, হাতে,  এই রোগের প্রতীক হিসাবে। এই রোগীদের সাথে সমবেদনা জানানোর জন্য ফান্ড তোলা হয়, দৌড় এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ছোটবেলা থেকে এগুলো শুনতে শুনতে বড় হলে বাচ্চাদের মনে অটোমেটিক এই শব্দগুলো, এই রোগ, এর ভয়াবহতা গেঁথে যায়। কৌতূহলী শিশু, কিশোরী হয়তো মা, বাবা, শিক্ষক, শিক্ষিকা, আপন জনের কাছ  থেকেই জেনে নেয় আরও বিশদ তথ্য, জেনে নেয় কিভাবে পরীক্ষা করতে হবে বাড়িতেই, বা ডাক্তার খানায়, কতো দিন পর পর করতে হবে। কোন নোংরামি নেই, বাড়াবাড়ি নেই, চটুলতা নেই, একটি জটিল রোগকে জটিল রোগ হিসাবেই ভাবতে শেখায়, এ নিয়ে অন্য কোন কথা বলার বা ভাবার কোন অবকাশ দেয় না। আর এমনটাই হওয়া জরুরি।

তবে নায়লা নাঈম কেন এমন করলেন? সে কি আসলেই বাংলাদেশের মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়াতে চেয়েছেন? কিশোরী, যুবতী, তরুণী, মধ্য বয়সী, বৃদ্ধাকে জানাতে চেয়েছেন এই রোগের ভয়াবহতা বা প্রতিহত করার উপায়? বিজ্ঞাপনটি দেখে কিন্তু একদমই সেকথা মনে হয় নি। পেছন থেকে শার্ট খুলে ফেলার  মোহনীয়  ভঙ্গি থেকে বরং মনে হয়েছে ‘R’  রেটিঙের কোন রগরগে মুভির শুরু, নায়িকা এখনি  ঘুরলে ঝপ করে পর্দায় শুরু হবে নিষিদ্ধ অবাধ উত্তেজনা, অথচ এটা নাকি ক্যনাসারের মতো একটি ভয়াবহ রোগ নিয়ে মানুষকে শেখাচ্ছে।

এটা কি ব্রেসট ক্যান্সার নিয়ে বিজ্ঞাপন, নাকি তার ব্রেস্টের, যাদুকরী ফিগারের বিজ্ঞাপন, সেটা ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না। এই একটি বিজ্ঞাপনের কারণে এই যে ফেসবুকে ঝড় উঠেছে, এটাও এক ধরনের শক্তিশালী বিজ্ঞাপন, বিশেষ করে তার নিজস্ব পেশার জন্য।

সবচেয়ে জঘন্য লেগেছে একদম শেষে যেয়ে তার অতি চটুল আহবান যে ব্রেসট  ক্যান্সার চেক করার জন্য তারও একজনকে লাগবে, যে তার ব্রেসট ‘দেখবেন, ধরবেন, এবং চেক করবেন’। পুরোপুরি ধান ভানতে শিবের গীত, অপ্রয়োজনীয়, সীমা ছাড়া ফালতু কথা, একমাত্র সুড়সুড়ি দিয়ে নিজের বাজার বাড়ানো ছাড়া যার আর কোন উদ্দেশ্যই নেই।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.