মুখোশের আড়ালে আমি, তুমি ও আমরা

ফেরদৌস কান্তা: প্রতিনিয়ত আমরা সবাই অভিনয় করে যাচ্ছি। নিজের সাথে, পাশের জনের সাথে, সামনের জনের সাথে। ক্লান্তিহীন, বিরতিহীন এই অভিনয় আমাদের একটুও অপরাধী করে তুলে না। বরং আমরা দিনের পর দিন আরও কৌশলী হই নিজেদের আসল চেহারা লুকাতে। আশেপাশের মেকি এই মুখগুলি খুব বিরক্তি ধরায় আজকাল। আপনার যোগ্যতা কী, তার চেয়ে আপনাকে নিয়ে নিশ্চিত থাকুন বেশি আলোচনা হয় আপনি কীভাবে চলাফেরা করেন! এই আলাপে আমরা যতটা আনন্দ পাই, পৃথিবীর অন্য কোন টপিক আমাদের অত বিনোদন দিতে পারে না।

kanta
ফেরদৌস কান্তা

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলেও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে এই আলাপে সে অংশগ্রহণ করেনি, বা কথায় অংশ না নিয়েও মজা পায়নি। আলাপে খুব বেশি মজা বা উৎসাহ লাগে যখন টপিক একজন ‘একা নারী’! আপনি একজন নারী, আর আপনার পতিদেব আছেন মানে আপনি একটা ভালমেয়ে ব্র্যান্ডের অধিকারিণী! আপনার সবকিছু করা মোটামুটি জায়েজ। যেমন আপনি সাজগোজ করতে পারেন ইচ্ছামতো, আপনি পরপুরুষের সাথে কথা বলতে পারেন যখন-তখন, আপনি যেমন খুশি তেমন চলতেও পারেন। আপনার পতিদেব যদি এইসব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেন সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তখন আবার আপনি গলা ফুলিয়ে বলতেই পারেন, আমার উনি এসব পছন্দ করেন না!

যত সমস্যার মূল হলাম আমরা। এই আমরা কারা? এই আমরা হলাম সেইসব গুটিকয়েক নারী, যারা একা এবং খুবই আনন্দের সাথে একাই নিজেদের দায়িত্ব পালন করি। কারও খাইও না , পরিও না। তাই অন্য কারও সমালোচনার ধার ধারি না। আপনি বিধবা হন কিংবা তালাকপ্রাপ্তা, সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় আপনি একা নারী! তখন আপনার পা থেকে কপাল এবং চুলের আগা থেকে নিচের তালু পর্যন্ত সবকিছুই ভীষণ আলাপের বিষয়বস্তু। রীতিমতো গবেষণার প্রধান বিষয় আপনি!

আপনার স্বামী মৃত? বাহ! এভাবে চলেন? চলাফেরায় আপনার বিধবার কোন বেশ নাই? ছিঃ! কি খারাপ আপনি! একটা বিধবা মেয়ে এভাবে সাজগোজ করে চলতে পারে? তওবা তওবা ! আপনার আল্লাহ্‌ খোদার ভয় নাই। মাথায় কাপড় নাই, রঙিন কাপড় পরেন, নাকে ফুলও?  সারাক্ষন হাহা হিহি করেন। বয়সের কোন লাজ দেখি নাই আপনার। হায়! কি বেহায়া মেয়েমানুষ আপনি! উফফ! কি অসহ্য লাগে আপনার প্রাণ উচ্ছলতা! মাঝেমাঝে খুব রাগ আর বিরক্তি! কিভাবে পারেন? শরম নাই কোন? একেবারেই হায়া ছাড়া মহিলা। ছিঃ! ছিঃ!

আপনি তালাকপ্রাপ্তা? তাহলে আপনি তো মারাত্মক খারাপ মহিলা। আপনার পতিজী আপনাকে ছেড়ে দিল? আপনি পতির মন রাখতে জানেন না। পতিকে খুশি করবেন কোথা থেকে, আপনি সারাদিন বাইরে নিয়ে ব্যস্ত। আপনার কাছে স্বামী পরমগতি নয়। আপনি বাইরের জীবন পছন্দ করেন! ছিঃ! বিয়ে হলে ঘরে মন দিতে হয়। স্বামীর সবকথা শুনে চলতে হয়। বাইরে যাওয়া-আসা কমাতে হয়। বন্ধুদের ছেড়ে দিতে হয়। বিয়ের পর আপনার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, স্বামী যেভাবে চায় সেভাবে চলাফেরা করা। আপনাকে তো ছেড়ে দিবেই, কারণ আপনি এসবের ধারে কাছে নাই। আপনি নিজেকে প্রাধান্য দেন। কতো সাহস আপনার?

আর আপনি ছেড়ে এসেছেন? নিশ্চয়ই আপনার অন্য কারুর সাথে প্রেম আছে। যার জন্য এত ভালোমানুষ স্বামী ছেড়ে দিবার সাহস করলেন। কি অসভ্য আপনি! আপনার চলাফেরায় প্রমাণ করে আপনি একপুরুষের নারী নন। হতে পারে অনেকের সাথেই আপনার সম্পর্ক আছে। এখন জানিনা আরকি। ঠিকই জেনে যাব। আর আপনি যে খারাপ তার বড় প্রমাণ আপনার চলাফেরা। কি খোলামেলা চালচলন আপনার। এত সাজগোজ কাকে দেখান? যত্তসব! কি বিছিরি করে সাজেন? স্বামী ছেড়ে দেয়া মহিলা এত সাজগোজ করবে কেন? সবকিছুই ব্যাটাদের দেখাতে করেন। কি মিষ্টি করে করে পুরুষ কলিগদের সাথে গায়ে পরে কথা বলেন! আপনার নির্লজ্জতার কোন সীমা নাই!

উপরের কথাগুলি পড়ে খুব অবাক লাগছে তাইনা? এই কথাগুলি আমি, তুমি অথবা আমরা প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছি। বলছি আমাদের সেইসব বোনদের পিছনে যারা জীবনের দীর্ঘ কষ্টের দিন-রাত ত্যাগ করে একটু শান্তি নিয়ে বাঁচার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ কখনো নিজের সাথে, কখনো পরিবারের সাথে , কখনোবা সমাজের সাথে। এইমেয়েগুলির একমাত্র অপরাধ, তারা মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বাঁচতে শিখে গেছে। জীবনের মানে উপলব্ধি করে নিজের মতামতকে প্রাধান্য দিতে বদ্ধপরিকর। তাই তারা পাছে লোক কিছু বলে এই কথাটার কবরে পুষ্পমালা দান করে সামনে চলার দিনে সামিল হয়েছে। যতই দোষ খুঁজে বেড়াও একা থাকা মেয়েটির কাপড়ে, তার কপালের টিপে কিংবা খোলা চুলে, কিছুই যায় আসে না তার। কারণ মেয়েটি আজ জানে, সে প্রয়োজনে হ্যাঁ কিংবা না দুটি শব্দ জোরের সাথে উচ্চারণ করতে পারে।

আমার সৌভাগ্য  বাসা থেকে আমার কাপড়ে বা চলাফেরায় কোন বাঁধা নাই। কিন্তু মাঝেমাঝে তাদের জন্য আফসোস হয়, যারা সামনে আহারে! আপু আপনি এতো কষ্ট করেন বলে পিঠে সহমর্মিতার হাত রাখে, আর তাদের আসর থেকে উঠে গেলেই আমি একটা মজার আলোচনায় পরিণত হই। আলাপের কথাগুলি ঠিকই কানে এসে পৌঁছায়। কারণ সবাই না হলেও কেউ কেউ সত্যিকারের সহকর্মী, আর এই যুদ্ধ করে পথচলায় রয়েছে তাদের সমর্থন, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। তাদের জন্য মনভরা ভালোবাসা।

কেন আমাদের এই ভণ্ডামি জানি না। জ্বলুনি কোথায়, তাও বুঝি না। মুখোশধারীদের এই ব্যাপারগুলি একসময় খুব আপসেট করে দিত, কখনো বা চোখে পানি। কিন্তু আজ এসব ভেবে সময় নষ্ট করি না। যেতে হবে বহুদুর।  কর্মক্ষেত্রে আমার শাড়ি-চুড়ি বা জিন্স-ফতুয়া না, একমাত্র আলোচনার বা সমালোচনার বিষয় হোক আমার কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা। কারণ এই আমি বা আমাদের মিছিল কিন্তু বাড়ছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কান্তা আপনার বাস্তব এবং সাহসী লেখনীর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আশাকরি আপনি আপনার এধরনের সাহসী লেখা অব্যাহত রাখবেন। শুভ কামনা রইল।

লেখাটা পড়ে খুবই ভাল লাগল। (কর্মক্ষেত্রে আমার শাড়ি-চুড়ি বা জিন্স-ফতুয়া না, একমাত্র আলোচনার বা সমালোচনার বিষয় হোক আমার কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা। কারণ এই আমি বা আমাদের মিছিল কিন্তু বাড়ছে।)আমিও তা মনে করি। কান্তা আপনি আপনার বাস্তব সত্য লেখনি চালিয়ে যান। আমি সর্বদা আপনার সাহসী মনের প্রসংশা করি । একজন নারী/পুরুষ এর মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কর্মদক্ষতা ও ব্যবহারের উপর। এসও গুড লাক। ভাল ও সুস্থ থাকুন দোয়া করি।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.