প্রতিবাদের আগুন যেন মাঝপথে থমকে না যায়

মোহছেনা ঝর্ণা: খাদিজার অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
কোপা বদরুল স্বীকার করেছে খাদিজা তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করায় তার রাগ হয়েছে। আর সেই রাগের বশবর্তী হয়ে সে দিনের আলোর খোলা রাস্তায় মনের সুখে খাদিজাকে কুপিয়ে কবরে পাঠানোর কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছে। কী সুন্দর মামা বাড়ির আবদার! এটা যেন একটা খেলা!

khadiza-5বাচ্চারা যেমন খেলতে গিয়ে কোনো কারণে বনিবনা না হলে একজন অন্যজনের সাজানো খেলনাগুলো এলোমেলো করে দেয়, কিংবা বালির মূর্তি মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দেয়, এটা কি বদরুলদের কাছে সেরকম কোনো খেলা?

খাদিজাকে কোপানোর ছবি যারা ভিডিও করেছেন, তারা ঠিক কাজ করেছেন, একথা বলার কোনো অবকাশ নেই। যারা ভিডিও করেছেন তাদের মধ্যে যদি দু’একজনও তখন ভিডিও করা বাদ দিয়ে খাদিজাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতো, তাহলে হয়তো মেয়েটা এখন এরকম জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুলতো না। কিন্তু একথাও আমাদের মাথায় রাখা উচিত, কেউ ভিডিও করেছে বলেই বদরুল চাইলেও এখন আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারছে না। ভিডিওটা সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রটা পরিষ্কার করে দিয়েছে অনেকখানি।

তনু হত্যা, মিতু হত্যা কিংবা রিশা হত্যার ক্ষেত্রে যদি এরকম একটা ভিডিও থাকতো, তাহলে অন্তত তাদের হত্যা মামলা নিয়ে প্রশাসন আমাদের ছেলে ভুলানো গল্প শোনাতে পারতো না।
খাদিজার জন্য সিলেটসহ সারাদেশে আন্দোলনের জোয়ার বইছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপামর জনগণের একাত্মতায় সেই আন্দোলন আরও বেগবান হচ্ছে।

কিন্তু কেন জানি সেই আন্দোলনে আমি খুব একটা আশা রাখতে পারছি না। আমার সে হতাশা তৈরি হয়েছে তনুর কারণে। তনু ধর্ষণ এবং হত্যার অর্ধ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও অপরাধীদের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি প্রশাসন। এরকম আরো কত অর্ধ বছর পেরিয়ে গেলে তনু হত্যার অপরাধীরা চিহ্নিত হবে, তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না বলে আমরা যে দোদুল্যমান অবস্থায় আছি সেখান থেকে কিছুতেই একটা স্থির অবস্থানে আসা সম্ভব হচ্ছে না।

সিমির কথা কি মনে আছে আপনাদের? আমার মনে আছে। নারায়ণগঞ্জের মেয়ে চারুকলার ছাত্রী সিমির কথা। সিমির যে ছবিটা তখন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সে ছবিটা এখনো আমার চোখে ভাসে।
বখাটেদের বখাটেপনার পাশাপাশি চেনাজানা গণ্ডির মানুষেরাও যখন তাকে খারাপ বলতো, তার চলাফেরা নিয়ে কটুক্তি করতো, চরিত্র নিয়ে অশালীন কথা বলতো, এলাকার মুরব্বী গোছের মানুষেরা তার পরিবারের সদস্যদের অনেক মন্দ কথা শোনাতো, একদিন বখাটেদের জঘন্য কথা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করার নির্মম সিদ্ধান্ত নিল। তবে মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা বারুদকে থামিয়ে দেয়া কঠিন হচ্ছিল বলেই হয়তো তার আত্মহত্যার কারণ এবং দোষীদের নাম স্পষ্ট করে চিরকুটে লিখে গিয়েছিল।

তারপর অনেক বছর কেটে গেল। এই অনেক বছরে নিজের অপমানিত বোধ করে একে একে জীবন দিল কলেজ ছাত্রী রুমী, চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী তৃষা, ফাহিমা, তিথি…..তালিকাটা শুধু বড় হতেই থাকে।

আর এ তালিকার পাশাপাশি আরেকটা তালিকা হতে থাকে ধর্ষণের পর হত্যা। মহিমা,বুশরা, শাজনীন,তনু, আফসানা….।
সেই যে ১৯৯৫ সালে পুলিশ হেফাজতে দিনাজপুরের ইয়াসমিন হত্যা দিয়ে শুরু তারপর যেন আর শেষ নাই। প্রতিদিন আতংক বাড়ে।
এর মাঝে আবার প্রেম, ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসিড ছুঁড়ে চেহারা বিকৃত করে দেয়ার এই বিষবৃক্ষ বেঁচে থাকাটাকে দুর্বিষহ করে তোলে।

কত সহজে মেয়েদের জীবনটাকে থমকে দেয়া যায়! কত অবলীলায় হাসি-খুশি প্রাণোচ্ছল জীবনটাকে স্তব্ধ করে দেয়া যায়! এক সামান্য দর্জি, পড়ালেখা নেই, সেও কত সহজে খুন করে ফেলতে উইলস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্রী রিশাকে!
বিচার যে একেবারে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু বিচারের ধীর গতি, প্রভাবশালী মহল দ্বারা প্রভাবিত বিচার এবং অপরাধে প্রভাবশালী সন্তান জড়িত থাকলে মাঝপথে থমকে যাওয়া বিচার প্রক্রিয়া আমাদের মতো সাধারণদের হতাশা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
আমরা চাই খাদিজার হত্যা চেষ্টার আসামী বদরুলের খুব দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ তনু হত্যা, আফসানা হত্যা, রিশা হত্যা, মিতু হত্যাসহ প্রতিটা হত্যার অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হউক এবং বিচারের মাধ্যমে কঠিন শাস্তি প্রদান করে স্বল্প সময়ে তা বাস্তবায়ন করা হউক।

আমার বিশ্বাস প্রশাসন সদিচ্ছা পোষণ করলে এসব অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা কঠিন হবে না।
কিন্তু কথা হচ্ছে প্রশাসন কি আদৌ সদিচ্ছা পোষণ করবে কিনা! কারণ খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কোপানো বদরুলের গায়ে তো আবার ছাত্রলীগ এর সীল লেগে আছে।

এসপি বাবুলের স্ত্রী মিতু হত্যার রহস্য আজও উন্মোচিত হলো না। হবে কি কখনো?
তনুর মায়ের আর্তনাদ প্রশাসনের কান পর্যন্ত হয়তো পৌঁছায় না। আহারে সোমত্ত কন্যার এমন অকাল মৃত্যুতে পাগলপ্রায় মায়ের অবস্থা দেখলে নিজেকে সংবরণ করা কঠিন হয়ে যায়।

খাদিজাকে কোপানো বদরুলের বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী ছাত্রজনতার যে আন্দোলনের আগুন দেখা যাচ্ছে, বদরুলের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনোভাবেই যেন সে আন্দোলন মাঝপথে থমকে না যায় এটাই প্রার্থনা করছি। কারণ আন্দোলন পথ হারালে হয়তো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের এ তালিকায় যোগ হতে পারে নতুন কোনো  খাদিজা, তনু, সিমি, রুবী, বুশরা, শাজনীন,রিশা,তৃষা, তিথির…….নাম।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.