মহারাজা, তোমারে সেলাম

রিফাত ফাতিমা: জলি আপা, হিমশীতল লাশবাহী গাড়িতে চুপচাপ শুয়ে আপনি। বন্ধ চোখে গাঢ় সুরমা, শেষ বিদায়ের সজ্জা। একপাশে মুখটা ফেরানো। কয়েক মুহূর্ত কেবল আপনাকে দেখার সুযোগ মিলেছিল।

আমি অনেককাল জানতাম ওই শীতল এ্যাম্বুলেন্সের চেয়েও হিমতরো কোন একাকিত্ব নিয়ে আপনি জুবেরীতে দিন কাটাতেন। যতক্ষণ কাজে থাকতেন ততক্ষণ ভালো থাকতেন। এমনও দিন গেছে ২৪ ঘন্টা উপোস থেকেছেন। খেতেও পারতেন না। আপনার সব ইচ্ছে মরে গিয়েছিল।
আমার খুব রাগ হতো আপনার উপর। এখনো হচ্ছে।

akter-jahan-photoআমি জানি সোয়াদের জন্য আপনি রাজশাহী ছাড়েননি। বলতেন ওকে সবসময় না দেখি, একই ক্যাম্পাসেই তো আছে। সোয়াদের আপনার কাছে আসা বা না আসা, ফোনে কথা বলতে পারা বা না বলা সবই সোয়াদের বাবার মর্জির উপর নির্ভর করতো (মহারাজা, তোমারে সেলাম)।

যতদিন সংসার করেছেন আপনার কারো সাথে মেশা না মেশার বিষয়টিও সোয়াদের বাবার ইচ্ছাধীন ছিল। আমি বলতাম, আপনি এতো সংসার সংসার করেন, এতো নিখুঁত রাখতে গিয়ে কোথাও যান না। আপনি জবাবে বলেছিলেন, প্রবাল পছন্দ করে না। তবে আমাদের জন্য আপনাদের দুজনের দ্বার খোলা ছিল সবসময়।

আপনি দীর্ঘদিন মুখ খোলেননি। আপনার রুচিতে বাঁধতো। কোনো এক ক্ষণে কী কারণে যেন আপনার মনে হয়েছিল, দুটো কথা আমাদের শেয়ার করা যায়। ছোট ছোট বাক্যে ফিসফিস করে আমাদের নিজের দুঃসহ জীবনের কথা বলেছিলেন।
ঘর ছাড়ার অনেক পরে বলেছিলেন সেসব কথা। তখনো বলেছিলাম, এখনো বলি, কেন আপনি অনেককাল এই কষ্ট সহ্য করেছেন? আপনার পরিবার, সন্তান, সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রী সবার জন্য আপনার অপরিসীম মমতা ছিল। শুধু সময়মতো নিজের জন্য সহানুভূতি জাগেনি আপনার, সেবাদাসী হয়েছিলেন?

Rifat Fatima
রিফাত ফাতিমা

যেমন করে সপ্তাহান্তে আমরা নখ কাটি, যেমন করে ঘরের ঝুল ঝাড়ি, যেমন করে ঘরের আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করি, তেমন করে কেন এই অস্বাস্থ্যকর গার্হস্থ্যের বোঝা টান মেরে ফেলে দেননি, জীবন্মোৃত হবার আগে?
না জলি আপা, আপনাকে আমি মাফ করবো না, আপনি এত বেশী সহ্য কেন করেছেন? আপনি আমাদেরও নয়, আঁকড়ে ধরেছিলেন কতগুলো প্রিমিটিভ মূল্যবোধকে।

আপনাকে অনেককাল চিনি, সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকে। গতকাল না পরশুর ডেইলি স্টারের ছবিটাতে সেই পুরনো আপনার ঝলমলে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে ফিরে গেছিলাম দেড়যুগ আগে। কানে মাটির গয়না পরতেন, একবার হাতি মোটিফের মাটির দুল পরেছিলেন। চোখের নিচে টানতেন কখনো সবুজ বা কখনো নীল লাইনার। কী মিষ্টি দেখতে যে ছিলেন। আমাদের ঢাবির শিক্ষকদের স্নেহের পাত্রী ছিলেন আপনি।

সেই আপনাকে আপনার ভালোবাসার মানুষটি তখন বলতো, তোকে কেন লোকে পছন্দ করে, কী অাছে তোর, তোর নাক এরকম, রং এরকম? একথা আপনিই গভীর দুঃখে, অসহনীয় লজ্জায় উচ্চারণ করেছিলেন অামার কাছে। আমি আপনার ছোট, আমাকে এসব বলার আগে আপনি হাজার বার ভেবেছিলেন, আমি জানি।

জলি আপা, কে বলে বাংলাদেশ গরিব দেশ? আমাদের দেশটা আসলে রাজার দেশ। এখানে ঘরে ঘরে রাজা-মহারাজার বাস। তাদের সবাইরে সেলাম।
কোন অমোঘ দুপুরে বা নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যায় আর আপনি ফোন করবেন না আমাকে। মৃদু গলায় ততোধিক মৃদু অনুযোগ করে আর বলবেন না, তোমাকে ফোন করেছি কতবার, ফোন ধরনি কেন?
এখন আমি অপেক্ষা করবো, কান পেতে রইবো, কিন্তু আপনি আর অামাকে ফোন করবেন না।
আপনি কি আমার পাঁজর ভাঙা কান্না শুনতে পাচ্ছেন বহুদূরের ওপার থেকে?

লেখক পরিচিতি: সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, এসবিডিটুয়েন্টিফোরডটকম, মাস্টার্স শিক্ষার্থী, জাপানিজ স্টাডিজ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.