কোন পথে যাচ্ছে আজকের তারুণ্য!

তৃষ্ণা হোমরায়: গতকালই খাবার টেবিলে ১৯/২০ বছর বয়সী আমার এক ভাতিজি বলছিল, আমাদের দেশে হঠাৎ এই জঙ্গী কোত্থেকে এলো? এর আগে তো কখনো শুনিনি? পাশ থেকে আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলের তড়িৎ উত্তর, দেখনি ওই যে ছেলেগুলো যারা গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা করেছিল, তারাই তো জঙ্গী। ওরা তো সবাইকে মারে না। যারা ছোট কাপড় পড়ে, নাস্তিক ওদের মারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মা তোমাকে এগুলো কে বলেছে? ছেলে বললো, কেন আমার বন্ধুরা। আর পত্রিকায়ওতো পড়েছি।

Tanwi
তৃষ্ণা হোমরায়

ছেলেকে বললাম, নাস্তিক কী? যারা ধর্ম মানে না তারাই তো? ধর্ম মানুষের কল্যাণেই তৈরি হয়েছিলো। ধর্ম মানা না মানা একান্তই মানুষের নিজস্ব বিষয়। এজন্য তো কাউকে মেরে ফেলা যায় না। আর হলি আর্টিজানে যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তারা যে নাস্তিক ছিল এ কথার ভিত্তি কী? তারা অন্য ধর্মের ছিল। তাই বলে কি তারা নাস্তিক? আর ছোট কাপড়, ওটা তো বিদেশিদের পোশাক। আমাদের যেমন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ তেমনি ওদের স্কার্ট, টপস-জিন্স।

ছেলের কথার তো একটা মোটামুটি যৌক্তিক জবাব দিলাম। কিন্তু মাথায় ঘুরছে ভাতিজির প্রশ্ন। সত্যিই তো এই ‘জঙ্গি’ শব্দটির সাথে আগে তো আমাদের পরিচয় ছিল না। যে বয়সে নিবরাস, অর্ক, আবীর কিংবা রোহানের মতো তরুণদের বন্ধুদের সাথে তুমুল আড্ডা, সিনেমা দেখা বা তর্কে মেতে ওঠার কথা, সে বয়সে কেন ওরা জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়াচ্ছে?  

শোনা যাচ্ছে ভয়ঙ্কর সব কাহিনী। দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজ তরুণ-তরুণীর তালিকা। যাদের বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের এবং দেশ-বিদেশের নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। শহুরে জীবনের ব্যস্ত আর অতিরিক্ত প্রযুক্তির আসক্তি ক্রমেই আমাদের করে তুলছে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ। আর একদিন এখান থেকেই জন্ম নেয় হতাশা।

বায়ান্ন-একাত্তর-নব্বই এ যুগ বদলের সময়গুলোতে তরুণরাই হয়ে উঠেছিল সময়ের সাহসী সন্তান। বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। তাদের ওপর ভর করেই আমরা আজ উঠে এসেছি মধ্য আয়ের দেশের তালিকায়। স্বপ্ন দেখছি আরো অনেক দূরের। কিন্তু সেই তারুণ্যই আজ সঙ্কটে। এ নিয়ে চলছে নানা কথা। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বাইরে কোন রোমান্টিসিজম বা অ্যাডভেঞ্চার না থাকা, সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অভাব কিংবা জাতীয় পর্যায়ে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বা রোল মডেলের অনুপস্থিতির কথা বলছেন কেউ কেউ।

আমারও মনে হয়েছে কারণগুলো যৌক্তিক। সত্যিই তো শহরের চার দেয়ালে বন্দী জীবনে অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ নেই বললেই চলে। আর মোটামুটি ‘৯০ এর দশকের পর থেকেই বইছে অপ-রাজনীতির হাওয়া। এর ফলে রাজনীতিতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তরুণরা। কমে গেছে মুক্ত চিন্তার চর্চা । ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে সৃজনশীলতার জায়গা। ফলে একঘেঁয়ে পড়াশোনার বাইরে একটা কিছু করার জায়গাটায় তৈরি হয়েছে এক ধরণের শূন্যতা। এ শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে, হিরোইজমের স্বপ্ন দেখিয়ে, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করে জঙ্গিবাদের পথে তরুণদের নিয়ে যাচ্ছে একটি মহল।

আমি মনে করি জঙ্গিবাদের উত্থান একটি উপসর্গ মাত্র। এখনই অনুসন্ধান করে উপড়ে ফেলতে হবে এর শেকড়। জানি বলা যতটা সহজ, করা হয়তো ততটা না। তবে একেবারে অসম্ভবও নয়। পরিবার থেকেই এর হাতেখড়ি হতে হবে। আমার ছেলে বা মেয়েটি কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে এমন কি প্রয়োজনে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা কী শেখাচ্ছেন সেটাও জানার চেষ্টা করতে হবে। তাদের সাথে মিশতে হবে বন্ধুর মতো।

কেন আমাদের ছেলেরা আবু বকর আল-বাগদাদীকে রোল মডেল মনে করছে? যে বয়সে তাওসিফ, নিবরাস, অর্করা জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়িয়েছে, ১৯৭১ সালে সেই একই বয়সে রুমি, আজাদ, বদি, জুয়েলরা দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবময় ইতিহাস আছে, সে দেশের ছেলেদের কেন রোল মডেলের অভাব হবে? ব্যর্থতা আমাদের। আমরা আমাদের সন্তানদের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে পারিনি। এখনও এক হতে পারিনি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য আর অহঙ্কারের জায়গাগুলোতে।

তাই আর হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সময় এসেছে সব বিভেদ ভুলে কাদা ছোঁড়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার। কারণ, গুলশান, কল্যাণপুর এবং সবশেষ নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার ঘটনা নাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের চিন্তা-চেতনার ভিত। বদলে দিয়েছে এতোদিনের হিসেব নিকেশ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.