আমার আদর্শ ‘জয়বাংলা’ও যখন আহত

সাদিয়া নাসরিন: আমার বাচ্চারা যে স্কুলে পড়ে, সেই স্কুলটি নির্বাচন করার জন্য আমি প্রচুর সময় ব্যয় করেছিলাম। রীতিমত ঘন্টা চুক্তিতে রিকশা ভাড়া করে গুলশান বনানী এলাকার সব স্কুলের কারিকুলাম, শিক্ষকদের এক্সেসিবিলিটি, পাঠদান সিস্টেম, আমাদের আর্থিক সঙ্গতি, সবকিছু বিবেচনা করে এই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটা নির্বাচন করেছিলাম।

কিন্তু সবচাইতে জরুরি যে বিষয়টি তখন যাচাই করতে পারিনি তাহলো শিক্ষকদের আদর্শিক অবস্থান। সেটা সম্ভবও নয় মনে হয়। কিন্তু এই একটা বিষয়ের উপর কি আমার সন্তানদের আদর্শিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করছে না?

Sadia Nasrinআমার মেয়েটা তখন গ্রেড থ্রিতে। ওর ছোট দুই ভাই ওকে যে পরিমাণ বিরক্ত করে তা অমানবিক। মেয়ে সারাদিন ওদের ফরমায়েশ খাটে আর দাবড়ানি খায়। কোনো অভিযোগ করে না। একদিন আমি ওর সাথে বসলাম।

জানতে চাইলাম, কেন ও ভাইদের এত যন্ত্রণা সহ্য করে? ও যদি বলতো, আমি ওদের অনেক ভালোবাসি তাই… বা অন্য কিছু, আমি হয়তো মেনে নিতাম। কিন্তু ও যা বললো, তা আমার জন্য বজ্রপাত।

“মিস বলেছে, বয়েজ’ আর অলওয়েজ নটি। ইট ইজ ন্যাচারাল। সো গার্লস’ হেভ টু টলারেট। গার্লস সুড হ্যাভ পেশেন্স।”

এর কিছুদিন পর গেমস এর গ্রুপ কম্পিটিশন। মেয়ে বলছিল ও কী কী খেলতে চায়। হ্যান্ডবল, ভলিবল, ইনডোর গেম।

“ফুটবল নয় কেন?”

মেয়ে উত্তর দিল, “ফুটবল তো বয়েজ’ রা খেলবে।”

-কেন?

-“মিস তো বলছে, ফুটবল বয়েজ’দের খেলা। গার্লসদের খেলা হ্যান্ডবল”।

মেয়েটা ভালো গান গায়। একদিন হঠাৎই বললো, ‘মা জানো, ইসলাম ধর্মে গান গাওয়া নিষেধ’।

তখন শাহবাগের উত্তাল দিন। আমরা দুইজন বাচ্চা দুইটা দুইজনের হাতে নিয়ে শাহবাগে গিয়ে বসে থাকি। বাচ্চারা সব শ্লোগান মুখস্ত করে ফেলল। ছেলেটা স্কুলে এসে সেই সব শ্লোগান ধরে বন্ধুদের শেখায়। একদিন ওর ক্লাসটিচার ডেকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এসব শ্লোগান কোত্থেকে শুনেছ?”

পুত্র বললো,”শাহবাগে”।

— তুমি শাহবাগ গেছ কেন?

—আন্দোলন করতে। বাবা বলছে, দেশে প্রবলেম হলে আন্দোলন করতে হয়।

—তোমার বাবাকে বলবে, ভালো ছেলেরা কখনো আন্দোলন করে না। শ্লোগানও দেয় না।

পুত্র মন খারাপ করে বাসায় এসে বললো। আমি বললাম, তুমি কি মিসকে বলতে পারবে যে, “মা বলছে ভালো ছেলেরাই দেশের জন্য শ্লোগান দেয়”! বলতে না পারলে আর শাহবাগ যেতে পারবে না।

ছেলে পরদিন মিসকে বলে আসলো। মিস ওকে আর কিছু বলেনি। কিন্তু পানিশমেন্ট (??) দিল। কেজি টু’ র একটা বাচ্চাকে বললো পরদিন এসেম্বলিতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে।

ও ভয় পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলেছিল “জয় বাংলার ডাকে” কবিতা দিয়ে। এই কবিতাটি ওদের মায়ের লিখা। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চে এই কবিতা ওরা দু ভাই বোন আবৃত্তি করেছে। (নিচে লিংকটা দেয়া হলো)

গ্রেড ফোরে পড়ে মেয়ে একদিন হঠাৎই এসে বললো, “মা, আমি যদি হিজাব পরি তুমি কি খুব রাগ করবা?” আমার মতো শর্ট টেম্পার্ড মানুষ পুরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলাম। টেম্পার হারাইতে হারাইতে ধরে ফেললাম।

বললাম, “না, তোমার ড্রেসকোড তো তুমি ঠিক করতেই পারো। আমি পছন্দ করবো না এটা ঠিক। তবে রাগ করবো না। তবে তুমি আমাকে তিনটা লজিক দিবা ঠিক কী কারণে তোমার মাথার চুল ঢাকা প্রয়োজন হয়েছে।” মেয়ে তিনটা লজিক দিল:

১) রিলিজিওন মিস বলছে, মাথার চুল দেখা গেলে আল্লাহ গুনাহ দেন। মাথায় গরম পাখি ঠোকা দেয়।

২) যারা হিজাব পরে তাদের কোনো বয় ডিস্টার্ব করে না।

৩) গুড গার্লস’রা হিজাব পরে।

আমি বললাম, তোমাদের ক্লাসে এখন কয়জন গুড গার্ল হয়েছে? ও বললো, “নয় জন”। টোটাল কয়জন মেয়ে তোমার ক্লাসে?

– “তের জন”।

হুমমমমমম……

পরদিনই স্কুলের কোর্ডিনেটরের কাছে গেলাম। ভূমিকা না করে সোজা বাংলায় বললাম, “আপা, আপনারা কম টাকা দিয়ে মাস্টার রাখবেন বইলা ভালো ট্রেনিং ট্রুনিং দিতে পারেন নাই বুঝলাম। এখন আমার পোলা-মাইয়ার স্বার্থে আমি আপনার মাস্টারগো জেন্ডার আর লাইফ স্কিলস ট্রেনিং করাইতে চাই। আর ধর্ম শিক্ষক হিসেবে খোদার দোহাই আমারে নিয়োগ দেন। কোনো টাকা পয়সা দেয়া লাগবো না। আর যদি একটাও না করবার পারেন, তাইলে আমার বাচ্চাগুলোরে টিসি দেয়ার ব্যবস্থা করেন যত দ্রুত সম্ভব। অথবা অমুক অমুক টিচার এর সাথে আমার কথা বলাই দেন।”

তারপর ঘটনা শুনে তিনি আমার সাথে বিশাল আলোচনা শুরু করলেন। তাঁরা আমার বাচ্চাদের নৈতিকতা কিভাবে উদ্ধার করে ফেলছেন সেই বর্ণনা দিতে লাগলেন।

আমি বক্তব্য দীর্ঘায়িত করতে না দিয়ে বললাম, “আমাদের পরিবারের কোথাও “হোয়াট আ গার্ল সুড বি অর আ বয় সুড বি” এর মতো স্টেরিওটাইপ নাই। এই স্টেরিওটাইপ ভাঙ্গাটাই আমার কাছে এবাদত। আপনারা নৈতিক শিক্ষার নামে আমার সারাজীবনের এবাদত নষ্ট করতে পারেন না। আমার বাচ্চাদের নৈতিক শিক্ষা আমি নিজে দিই। স্কুলে পাঠাইসি টিউটোরিয়াল শিক্ষার জন্য। সেইগুলা ঠিকঠাক মতো দেন আপাতত।

আর “আদর্শ” শিক্ষার জন্য শাহবাগে দুই মাস প্রাকটিক্যাল ক্লাস করাইছি। সেই আদর্শের নাম ” জ–য় বাংলা”। বলার জন্য নিয়ম আছে। উচ্চ স্বরে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে জোরে বলতে হবে। ঠিকঠাক মতো বলতে পারলে সব অসুখ সেরে যায়।

বেচারা অনেক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,” ও, আমাদের স্কুলের দুটো বাচ্চা শাহবাগের শ্লোগান দিত স্কুলে এসে। ওরা আপনার বাচ্চা, না?”

—“জ্বি, ওরাই আমাদের বাচ্চা। ওই যে, এসেম্বলিতে “জয় বাংলার ডাকে” কবিতা আবৃত্তি করলো কেজি টু’র ছেলেটা, আপনারা মুগ্ধ হয়ে ওর মাকে খুঁজছিলেন, আমি ওর মা। আমরা ওদের লাল সবুজ পতাকা চিনিয়েছি। প্লিজ ওদের পথভ্রষ্ট করবেন না”।

কদিন ধরেই কেবল মনে হচ্ছে জোরসে হাঁক মেরে জ–য় বাংলা বলতে পারলেই পুরা দেশের অসুখ সেরে যেতো। কিন্তু ‘জয় বাংলা’ বলার সাহসী মানুষগুলোই তো দেশে নাই। বাঁধন কই, গোলামের কফিনে মারা ওর সেই জুতো?

https://www.youtube.com/watch?v=Y0E1uhk9ZEk

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাদিয়া নাসরিন, আপনি নিজ সন্তানদের ভবিষ্যত চিন্তায় একজন সচেতন মা হিসেবে যে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে। তবে উপসংহারেে শেষের দু’টি লাইন আমাকে আপ্লুত করেছে। আমাদের গ্লাণি আমরা নিজের অস্থিতকে ভূলতে বসেছি। এর থেকে মুক্ত হতে হবে, আর কোন পথ নেই !

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.