‘সোজা-সাপ্টা বলুন, পিরিয়ড হইছে’

বিথী হক: অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ঘটনার মত পিরিয়ডও শরীরের একটা সাধারণ ব্যাকরণ। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মেয়ের পিরিয়ড হয়, সপ্তাহে চার থেকে ছয়দিনে শরীর থেকে ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিলিলিটার রক্ত চলে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে এটা আশি মিলিলিটার পর্যন্ত।

প্রক্রিয়াটা স্বাভাবিক হলেও যার সাথে হয় সে স্বাভাবিক থাকতে পারে না। পেটের ব্যথায়, গায়ের ব্যথায়, পায়ের ব্যথায়, কোমরের ব্যথায় বেচারার অবস্থা তখন কাটা মুরগির মত থাকে।

Bithi Haqueতারপর কাউকে ওষুধ আনতে পাঠালে বাড়ির নারী সদস্যরা দোকানদারের সামনে গিয়ে লজ্জায় আনত মুখে এদিক-সেদিক তাকিয়ে পুরুষ মানুষের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দৌড়াদৌড়ি করে কিছু একটা ব্যবস্থা করেন। অবশ্য পুরুষ সদস্য থাকলে সে পর্যন্ত মরমে মরমে সেটা তার অবধি পৌঁছে দিতে পারলে কিছু সহজ হয়। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার ‘মিনিস্ট্রুয়েশন’ শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে এই সকল নারীকুল “আল্লাহ দড়ি ফালাও, উডি যাই” পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। যেন পিরিয়ডটা না হওয়ার মতো কোনো অতি অপ্রয়োজনীয় বিষয় !

প্রিয় পুরুষগণ, এই পরিস্থিতি কি ভাবছেন নারীদের একার তৈরি? আপনার কোনো হাত নাই তার এই লজ্জা, হীনমণ্যতা তৈরিতে? আপনার সহপাঠিনী ক্লাসের এক কোনার চেয়ারে দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে দেখে তাকে লজ্জায় ফেলে যৌনসুখ পাওয়ার ধান্দায় যখন ‘কি হইসে রে’ বলে মিচকা হাসি দেন, আপনার কি ধারণা সেটা তারা বোঝে না? সুপারশপে অমুক ব্র্যান্ডের ন্যাপকিন আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে সেলসম্যান লজ্জায় লাল, নীল, বেগুনী হতে হতে পাশের সহকর্মির দিকে তাকিয়ে যে হাসি হাসে সেটা কি কেউ বোঝে না?

সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েটাকে বেকায়দায় ফেলে দেয়ার জন্য তাকে শুনিয়ে বন্ধুদের সাথে তামাশা করেন ‘দোস্ত এমনে হাঁটিস ক্যান, তোর কি পিরিয়ড হইসে নাকি’, আপনার কি ধারণা সেসব কথা মেয়েটা বোঝে না?

বউ বা গার্লফ্রেন্ডের পিরিয়ড হয়েছে এটা মানুষ জানলেও সমস্যা ! তার ডাক্তার ছেলেবন্ধুর কাছে বিষয়টা জানিয়ে কোন ওষুধের সাজেশন চাওয়াও বেশ লজ্জাজনক ! সিরিয়াসলি? পিরিয়ড কি কয়েকটা মেয়ের হয় নাকি খারাপ মেয়েদের হয় যে এটা লুকিয়ে রাখার বিষয়?

Napkinজ্বর, মাথা ব্যথা, সর্দির মত পিরিয়ডের সাময়িক শরীর খারাপ হলে সেটা জড়তা ছাড়াই মানুষকে জানানো উচিত। শরীর খারাপ জানার পরে কেউ কারণ জিজ্ঞেস করলে আর সব উত্তরের মতো পিরিয়ড চলছে এটাও সরল স্বাভাবিক উত্তর হতে পারে। এটা মেনে নিতে ছেলেদের পাশাপাশি কিছু ব্রেইনওয়াশড মেয়েদেরও ঘোরতর আপত্তি। তাদের মতে, পিরিয়ড লজ্জা স্থানের মতো একটা জিনিস, যা লোকচক্ষু এবং লোক জ্ঞাতির উর্ধ্বে থাকা আবশ্যক। এটা নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করা উচিত, ছেলেরা এসব জানলে তো আরো অস্বস্তিকর ব্যাপার !

ফলে যেসব ছেলেরা এসময় মেয়েদের সাহায্য করতে চায় এবং আসে তারা তাদের লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে নাকি শরীরের সমস্যা কমাতে সাহায্য করবে সেটা নিয়ে বিপদে পড়ে যায় ।

সামনেই রোজার মাস । মেয়েরা যে কারণেই রোজা না রাখুক ছেলেরা তাদের নিম্নাংশের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে রোজা না থাকার কারণ জিজ্ঞেস করে যে কষে থাপ্পড় লাগাতে ইচ্ছে করে।

Unhappy bleedingআমার মাকে জন্মের পর থেকে আমি রোজার মাসে দিনের বেলা না খেয়ে থাকতে দেখেছি। যখন থেকে বুঝেছি, কোন মেয়ের পক্ষেই পুরোপুরি ৩০টা রোজা রাখা সম্ভব নয়, তখন মা’র কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিনি কিভাবে সবগুলো রোজা রাখেন ! মা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, খেতে দেখলে মানুষে ভাববে কী না কী হয়েছে তাই তিনি রোজা না রাখলেও না খেয়ে থাকেন। এরপরে আমার আর কিছু বলার থাকে না। আমার মায়ের মতো মায়েদের সংখ্যা নেহাত কম বলে মনে হয় না।

ভাই ও বোনেরা, পিরিয়ডকে যেভাবে আপনারা ট্যাবু বানিয়ে রেখেছেন এবং সেটা অব্যহত রাখার চেষ্টা করছেন সেটা আদৌ কতখানি কাজে আসবে জানি না, কিন্তু অকাজে আসবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত । দয়া করে একটু মাথার মগজ ব্যবহার করেন, সহানুভূতিশীল হোন ।

কে রোজা রাখবে না, কেন রাখবে না এসব বেহুদা প্রশ্ন করে কোন পুরুষ বিকৃত মজা নেয়ার চেষ্টা করলে মেয়েদের নির্লিপ্ত জবাবই তাদের গালে কষে চড় বসানোর কাজ করবে। এসব যতো লুকিয়ে রাখা হবে, টিপিক্যাল বাঙ্গালী পুরুষরা তত বিকারগ্রস্ত হবে, মেয়েদের অপদস্থ করতে চাইবে ।

এখান থেকে বের হতে চাইলে নারীদেরকেই বের হয়ে আসতে হবে। আপনি-আমি মুখ বুজে থাকলে থাকতেই পারি, হাজার বছরের ঐতিহ্য আর মৌলবাদী মানসিকতার উত্তরণ আজীবনেও ঘটবে না।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Ami kintu shoja shapta boli….period hoyechey. Rojar shomoy chotto korey hashi diye boli….r rakhtey parlam koi? Jara amakey janey cheney female male both…
Tara etai shavabik vabey. R jar vimri khaoar shey vimri khay. Tatey amar ki?
Meyera jotodin ei bishoykey taboo vabbey totodin chelerao etakey easily nitey ovvostho hobeyna. Chelera jemon phermacytey jeye condom kintey lojja pay tamni meyerao napkin or birth pill chaitey lojja pay. R ei lojjatai taboo monthobbyo ba bokro drishty ba muchki hashi noy.
Din paltechey r o paltabey. Noyto ei bishoye kholamela lekha evabey prokashito hotona. Honestly eta kebol women chapter er jonnyo noy eta humen (humans) chapter er bishoy. Women chapter er protity bishoy e for human. Thats why ei blog or site er name niye punoray vebey dekhar onurodh korchi. Best wish.

লেখাটা জরুরি এই অর্থে যে এখানে একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তিক বিষয়কে ঘিরে কিছু কু সংস্কারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে একটা জুগুপ্সাপনা চিলকালই ছিল। তবে এটার মধ্যে যে তীব্র স্ববিরোধীতাও ছিল এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটার জন্য যে কেবল পুরুষরাই দায়ি সেটা আমি মনে করি না।

প্রতিমাসে মেয়েদের ‘মাসিক’ হয়। এ মাসিক শব্দটিকে ইংরেজিতে বলা হয়, মিনিস্ট্রুয়েশন বা প্রিয়ড। আমি ছোট বেলায় মাসিক শব্দটিই শুনে এসেছি। আমি ছোটবেলায় যে পরিবেশে ছিলাম, সেটা অগ্রসর পরিবেশ ছিল না। তাই ‘মাসিক’ শব্দটা আধুনিক শব্দ বলে মনে করি না। তবে শহুরে মেয়েরা আংকেল, কাজিনের মতো মাসিক শব্দটিকেও প্রিয়ড নাম দিয়েছেন। তারা মনে করেন মাসিক শব্দটার চেয়ে প্রিয়ড শব্দটা বেশি আধুনিক কিংবা ইউলোজিক।

হ্যাঁ, কোন মেয়ের মাসিক হলে তার কিছু স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়। এটা তার সহপাঠীরা, খেলার সাথীরা কিংবা অন্যরা বুঝতে পারে। এজন্য মেয়েটি অনেকটাই মন মরা থাকে। অন্যদিকে অজ্ঞতাবসত কিছু ছেলে এটাকে নিয়ে দুচার কথা যে বলে না, সেটা অস্বীকার করার নেই। কিন্তু এ নিয়ে তারা যা আচরণ করে, অন্তত আমার অভিজ্ঞতা মতে, তাতে পুরুষের গালে চপেটাঘাত করার মতো কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় না। এ নিয়ে নারীপুরুষ উভয়েরই মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে। যে কু সংস্কার থেকে মেয়েটি বের হতে পারে নি , একই কুসংস্কার থেকে ছেলেটি কিভাবে বের হয়ে আসবে?

যে বিষয়টি আমাদের যৌনস্থানের সাথে সম্পর্কিত তার প্রকাশ স্বাভাবিক ও সরল পথে করতে না পারাটা আমাদের ব্যর্থতা হতে পারে। কিন্তু এটাকে বোঝানোর জন্য যে পরিভাষা বা ইউয়োলোজিক শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে পরিত্যাগ করার কোন কারণ দেখি না। ভাষা আমাদের মনোভাব প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু সোজাসাপ্টা কথায় সব কিছু বলে ফেলা আমাদের সামাজিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

কয়েকটি উদাহরণ দিব। আদালতের ভাষা আলাদা। একজন এখানে কেউ মিথ্যা বলে না। আদালতে মিথ্যা বলা যায় না। এক আইনজীবী যা বলেন, তা যতই ভূয়া, অতিকথন কিংবা মিথ্যা হোক, তাকে মিথ্যা বলা যাবে না। বলতে হবে অসত্য। কোন সাক্ষী বলতে পারবেন না যে আইনজীবী সাহেব তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন, সেটা মিথ্যা। বলতে হবে, ইহা সত্য নহে।

আমরা কোন মেয়েকে যখন সুন্দর বলি তখন্ও কিন্তু অনেকটাই যৌনতার প্রসঙ্গ আসে। কি কি কারণে ময়েটি সুন্দর তার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত আছে। ৩৪-২৬-৩৬ এ হিসেবটা যে যৌনাগুলোর মাটের কাছাকাছি, এটা যে কেউ বুঝতে পারে। কিন্তু আমরা বলতে পারি না, তার বুকটা, তার কোমরটা, তার পশ্চাৎদেশ অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিংবা সেক্সি। আমরা বলি মহিলাটি বা নারীটি সুন্দরী।

তবে ভাষার ব্যবহার সব সময় এক রকম থাকে না। যে শব্দটি এককালে সাধারণভাবে বলা হত, পরবর্তীকালে তা অশ্লীল হযে যেতে পারে। কোন শব্দ এক স্থানে শ্লীল হলেও অন্য স্থানে সেটাকে অশ্লীল বলা হতে পারে। ‘মাগি’ শব্দটি রংপুর অঞ্চলে এখনও কোন পরুষের বউকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। বয়স্ক লোকরা কিছু কিছু গ্রামে এখনও অবলিলায় এটা ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক স্থানে ‘মাগি’ বলতে পতিতাকেই বোঝান হয়। মদ আর মাগি আমাদের সমাজে এখন্ও একই তীব্রতায় পরিত্যজ্য। তাই বৃদ্ধদের কাছে মাগি শব্দটি শুনলে রংপুর অঞ্চলের অল্প বয়সী বিশেষ করে শিক্ষিতরা লজ্জা পান।

জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমাদের ছোট বেলাতেও কতই না বিতর্ক শুনতাম। তখন ছিল লাইগেশন, ভ্যাসেকটমি কিংবা মায়া বড়ি খা্ওয়ার যুগ। কনডমের ব্যবহার ছিল সীমীত। তবে রাজা কন্ডম পরিচিত ছিল। ছোট কালে বিনা পয়সায় বিতরণ করা রাজা কন্ডম দিয়ে বাচ্চারা বেলুন বানিয়ে খেলত। আমাদের গ্রামের দুচার জন শিক্ষিত ভাই ছাড়া কেউই আসলে বলতে পারত না যে এটা বেলুন নয়, অন্য কিছু। মুদির দোকানে গিয়ে বেলুন বলে কনডম কেনা যত সহজ ছিল, বর্তমানে ওষুধের দোকানে সেই বেলুনকে কন্ডম বলে কেনাও লজ্জার বিষয়। কিন্তু সেই লজ্জার মাত্রা ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছে।

বাসর রাতে নবদম্পতির ঘরে একটি কন্ডমের প্যাকেট অত্যাবশ্যক হলেও সেটা বন্ধু-বান্ধব কিংবা ঠাট্টার সম্পকীয়রা ভিন্ন অন্যরা নবদম্পত্তিকে সরবরাহ করে না। তবে এ ক্ষেত্রেও বিষয়টির জুগুপ্সাপনা দূর হ্চেছ।

তবে প্রত্যেক সমাজেরই লুকানো-দেখানোর মতো অনেক বিষয় আছে। সেগুলো সেই সমাজের একান্ত আপন। এটা হতে পারে ইতিবাচক, হতে পারে নেতিবাচক। কিন্তু এটা অস্তিত্ব অস্বীকার করার কিছু নেই। যদি নেতিবাচক অথচ আমাদের জন্য তা অত্যাবশ্যক হয়, সেটাকে অবশ্যই মার্জিত আকারে জনসম্মুখে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মনের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ অলঙ্কারহীন হতে পারি না। যৌনতা ও যৌনাঙ্গের সাথে সম্পর্কিত শব্দগুলোও যে সম্পূর্ণ অলঙ্কারহীণ হবে সেটা যেমন সম্ভবও নয়, তেমনি কাঙ্খিতও নয়। ভাষা যদি অলঙ্কার হারায়, তাহলে তো আমরা সভ্য বলে দাবি করতে পারি না। অসভ্য, ও প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভাষা ছিল অলঙ্কারহীন। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ভাষাতেও অলঙ্কার প্রবেশ করেছে। আমরা তাই এ ভাষাকে অলঙ্কারহীন করে প্রাগৈতিহাসিক অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.