একাল ও সেকালের শাশুড়ি’মা

আলফা আরজু:

আমি প্রায় তিন প্রজন্মের শাশুড়ি’মা দেখেছি। প্রথমত মা-খালা-মামীদের শাশুড়ী, মানে দাদী-নানী। তারপর আমাদের শাশুড়িদেরও এখন দেখছি, আমাদের পরের প্রজন্মের শাশুড়িদেরকে। আমাদের সমাজে এখনও পুত্রবধূদের প্রতি শাশুড়িদের আচরণ ও ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ আছে, প্রশ্ন আছে, সন্দেহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নানান উৎকণ্ঠা ও ঠাণ্ডা যুদ্ধ আছে। আসলে জানা-অজানা অনেককিছুই এই একটা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে আছে।

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভালো, এই লেখাটা কোনোভাবেই- যাঁরা তথাকথিত পারিবারিক বা বর্ধিত পরিবারের সাথে একমত নন- তাদের জন্য নয়।

এই লেখা তাঁদের জন্য যাঁরা, এখনও যৌথ পরিবার বা শ্বশুর-শাশুড়ি ইত্যাদি সম্পর্ককে মানেন তাদের জন্য। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই- কারোর ব্যক্তিগত আবেগ বা মতামতকে- আঘাত করা নয়। শাশুড়িদের একাল-সেকাল নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ মাত্র।

আমাদের দাদীদের সময়কার শাশুড়িরা বয়সকালে সন্তানদের বিশেষ করে পুত্র সন্তানদের উপর ভাত-চিকিৎসা-কাপড়ের জন্য নির্ভরশীল ছিলেন। তাই অনিশ্চয়তা বোধ থেকে ছেলের বৌকে খুবই “রিস্কি” ভাবতেন ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। এবং অনেক পরিবারে শুনেছি- ছেলের বউ’রা তৃতীয় শ্রেণীর পারিবারিক সদস্য হয়ে থাকতেন। তাদেরকে পারিবারিক কোনো মতামতে গণনা করা হতো না, তাদের ভাতের চালটাও কোথাও কোথাও মোটা হতো। তাদের বাড়ির কাজের সহকর্মী মানুষটির পদমর্যাদায় রাখা হতো।

সেই সময়ও অনেক শাশুড়ি ও পুত্রবধুদের মধ্যেকার সুন্দর সম্পর্কও গড়ে উঠতো। তার নজিরও আছে। তবে অনেক পরিবারে- খুবই নাজুক পারিবারিক সদস্যের নাম ছিলো “পুত্রবধু”। তারপরের প্রজন্মে, আমরা ছিলাম। আমাদের অনেকেরই খুবই ভালো অভিজ্ঞতা আছে।

যেমন আমার এক প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মচারি বন্ধু টিয়া (ছদ্মনাম), ঠিকমতো ওর ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পারছে ওর শাশুড়ির জন্য। বন্ধুটির শাশুড়ি নিজ হাতে সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন ও আমাদের বন্ধুটি দেশ-বিদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে সন্তানদেরকে দাদীর কাছে রেখে চাকরির কাজ মন দিয়ে করে চলেছেন। আমরা বন্ধুরাও- সেই শাশুড়ীর ভালোবাসা পেয়েছি। দিনের যেইকোনো সময় ওর বাসা যেয়ে আমরা কেউ কোনোদিন ভাত না খেয়ে বের হতে পারতাম না।

তারপর আরেক বন্ধু পিউলী’র শাশুড়িকে দেখেছি ওঁদের বিয়ের আগে থেকেই। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পিউলী’র ডেঙ্গু হয়েছিলো। হোস্টেল থেকে পিউলীকে উনার বাসায় রেখে ডেঙ্গু পুরোপুরি সেরে উঠলে ও আবার হোস্টেলে ফিরেছিলো। কিছুদিন আগে পিউলী’র মা মারা গেছেন, তখন থেকে পিউলীকে আরও ভালোবাসেন ও আদর করেন। যাতে করে ওর মায়ের কথা ভুলে থাকতে পারে।

আরেক বন্ধু, যার শ্বশুর বাড়ির সবাই এখন প্রবাসী। প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তে বা সপ্তাহের মাঝখানেও শুনি আমার বন্ধু ও ওর বাচ্চা-কাচ্চা সবাই শাশুড়ির কাছে চলে গেছে। বাচ্চারা স্কুল ছুটিতে দাদীর কাছে চলে যায়। এইসব পারিবারিক সাপোর্ট একজন নারীর জন্য খুবই প্রয়োজন, নারীকে এগিয়ে দেয় অনেকখানি। বিশেষ করে আজকের দিনে যখন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে পাশে একজন মানুষ থাকলে- ছোট ছোট সন্তান নিয়ে কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্য থাকে বলেই আমার ধারণা।

উপরের সবাই সন্তানসন্ততি নিয়ে খুব ভালো ভালো চাকরি করতে পারছেন শুধুমাত্র শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলো বিশেষ করে শাশুড়ি ওঁদেরকে আন্তরিকভাবে সাপোর্ট দিচ্ছেন বলে।

এবার আসি এই সময়কার শাশুড়িদের নিয়ে। আমাদের প্রায় কাছাকাছি দুইজন মানুষ সদ্য শাশুড়ি হয়েছেন। তাদের কথা বলি। তারা দুজনেই নিজেদের জায়গায় খুবই প্রতিষ্ঠিত মানুষ। সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় থেকে তারা এতো সুন্দর করে শাশুড়ি হয়ে উঠলেন। আমি ওদেরকে মুগ্ধ হয়ে দেখি।

এই দুইজনকেই আমি মাঠের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। তাঁদের পেশাদারিত্বের ধারে-কাছে যেতে হলে- কতোটা মেধাবী, দায়িত্ববান ও পরিশ্রমী হতে হয়- তা চিন্তাতীত। দুইজনেই মিডিয়ার খুবই বড় পদে ছিলেন ও আছেন।

পুত্রবধূদের নতুন পরিবার ও পরিবেশে- যতটুকু সহযোগিতা দরকার- তারা দুইজনেই তা করে চলেছেন। নিজেদের পুত্র সন্তানদের যতোটা সাপোর্ট ও প্রাধান্য দেন- ছেলের বউদের ঠিক ততোটাই করে চলেছেন। “কখনও কখনও একটু বেশি আদর করি বা প্রাধান্য দেই বৌমাকে”- ও যাতে বাবা-মা’কে একটু কম মিস করে- বলছিলেন কঙ্কা করিম। কঙ্কা আপা’র ছেলের বউ পেশায় একজন আইনজীবী। ছেলের বৌকে তিনি নিজের সন্তানই মনে করেন।
তিনি মনে করেন, শাশুড়ি হয়ে উঠার চেয়ে বৌমা’র বন্ধু হয়ে উঠাটা বেশি জরুরি। ছেলের বৌয়ের সাথে সম্পর্ক সুন্দর ও সাবলীল হয়েছে- দুইপক্ষের আন্তরিকতা ও পারস্পারিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গা থেকে। দুইজনেই এই সম্পর্ককে মধুর করতে ভূমিকা রাখছেন।

পুত্র সন্তানরা যেমন নিজেদের পছন্দের কাজ বা পেশায় নিয়োজিত আছেন, পুত্রবধূও যাতে তাঁর পেশায়- মেধা ও সঠিকভাবে শ্রম দিতে পারে ও পরিবারের এইসব ভাবতে না হয় – সেটা নিশ্চিত করা সকলের কর্তব্য।

ছেলে ও ছেলের বৌ যদি আলাদা সংসার করেন- তাতেও বাংলাদেশের অনেক পরিবারের প্রেক্ষাপটে শাশুড়ি বা শ্বশুর বাড়ির মানুষদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। তাই একজন সচেতন মানুষ হিসেবে সেইসব ক্ষেত্রেও যাতে তাদের সংসার নির্বিঘ্ন ও সুন্দর হয়- সেদিকে নজর রাখা উচিত।

কঙ্কা আপার মতো বাংলাভিশন টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক শারমিন রিনভী আপাও শাশুড়ি হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন খুব উচ্ছাসের সাথে। তিনি বলেন, আমি রাতের শিফট শেষ করে অনেক রাতে বাসায় ফিরি- বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও বৌমা আমার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করে। রাত দুপুরে শাশুড়ি ও বৌমা গল্প করি- সারাদিন কার কেমন গেলো ইত্যাদি নিয়ে। একসাথে খাই। হাসাহাসি করি- এটা-সেটা নিয়ে। অনেক রাত করে আমরা দুইজনে ঘুমাতে যাই। এইতো সেদিনও কাজ শেষে বাসায় ফিরে দেখি বৌমা আমার জন্য একটা দোলনা কিনে আমার বারান্দায় সাজিয়ে রেখেছে- সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। এইসবই তো জীবনের ছোট ছোট আনন্দ ও পাওয়া। আমিতো নিজের কন্যা ছিলো না বলে আফসোস ছিলো। তা পুরোপুরি নেই হয়ে গেছে- বৌমা আসার পর থেকে।

পুত্রবধুটি এখনও পড়াশোনা করছেন। তিনিও বৌমা’র পড়াশোনার যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে সবসময় নজর রাখেন।

“ওঁর পড়াশোনা শেষ হলে- নিজের পছন্দের পেশায় কাজ করবে- এইটা আমি মনে প্রাণে চাই ও তাঁর জন্য সকলপ্রকার সহযোগিতা আমি ওকে করে যাবো।”- বললেন শারমিন রিনভী।

অন্য একজন শাশুড়ি এইভাবে বললেন, “বৌমা যেনো একবারের জন্যও নিজেকে এই পরিবারের বাইরের কেউ না ভাবে।”

এখন আসলে সময় এসেছে- পরিবারের নতুন সদস্যকে সুন্দর করে স্বাগতম জানানোর। বৌকে নতুন সংসার বা পরিবারে- মানিয়ে বা সারাক্ষণ কম্প্রোমাইস করার যুদ্ধে না দাঁড় করিয়ে। তাঁর পছন্দ-অপছন্দকেও গুরত্ব দেয়া উচিত বলে জানালেন আরেক ব্যাংকার (প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার) শাশুড়ি।

প্রত্যেকটা পরিবার যদি পুত্র সন্তানের পাশাপাশি পুত্রবধূকেও ভালোবেসে নেন, তাতে আপনি নিশ্চিত থাকুন, আপনার কন্যা সন্তানকেও তাঁর শ্বশুর বা শাশুড়ি ঠিক ততোটাই যত্ন ও ভালোবাসা দিবে।

সর্বোপরি এই নতুন সদস্যটি যাতে এক মুহূর্তের জন্য- নতুন পরিবারে অবাঞ্ছিত বা অবহেলিত বোধ না করে। ছেলেমেয়ে সবাই মিলেই একটা সংসার হয়। সুন্দর একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতে- আপনি নিঃস্বার্থভাবে আপনার অবদানটুকু রাখুন।

উন্নতবিশ্বের মতো এখনও বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পরিবারের ধারণাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। তার নানান কারণ। আর্থিক সামাজিক অবস্থা বলুন বা সরকারি নানান নিরাপত্তা’র অনুপুস্তিতিই বলুন। এখনও আমাদের দেশে বৃদ্ধ-বয়সে থাকা বা চিকিৎসার জন্য এমন কোনো সুন্দর অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। তাই, এখনও বাংলাদেশের অনেক পরিবার বাবা-মা’কে নিজেদের কাছেই রাখেন বা বাবা-মায়ের সংসারে বিয়ের পরও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন। আবার অনেক সময় আলাদা সংসার হলেও বাবা-মা’কে পুরোপুরি বাদ দিয়ে কিছু ভাবেন না। মুষ্টিমেয় মানুষের কথা এখানে উদাহরণ নয়।

জগত সংসারে সকল কন্যা-জায়া-জননী আনন্দে ও নিরাপদে থাকুক।

শেয়ার করুন:
  • 331
  •  
  •  
  •  
  •  
    331
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.