এসব দেখি কানার হাটবাজার

জেসমিন চৌধুরী: আজ এক বন্ধুর সাথে হালকা একটা ঝগড়া হয়ে গেল। আমি যতই বলি, হয় চোখ পুরা খুলে রাখ, নাইলে পুরা বন্ধ করে ঘুমা, সে ততই বলে, ‘ঘুমামুনা, উটপাখির মত একচোখে তাকায়্যা থাকুম, তারপর সুবিধা হইলে অন্যটা খুলুম, নাইলে নাই।’ এই বন্ধুটাকে আমার খুব পছন্দ যদিও তার সাথে আমার ঝগড়া লেগেই থাকে। তার এক চোখ খুলে রাখার অদম্য প্রচেষ্টা খুব মিষ্টি লাগে।

1উটপাখি আসলেই এরকম করে তাকায় কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু আমার চারপাশ ঘিরে আছে একচোখা অথবা চোখ আধখোলা  অজস্র মানুষ। তা আধখোলা চোখ নিয়ে ঝিমাকনা, তাতে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু সেই আধবোঁজা দৃষ্টিপথের ধারা বিবরণী হামেশাই কান ঝালাপালা করে দেয়। ঝামেলা সেখানেই।

পাকিস্তানের ইসলামী কাউন্সিল বৌকে হালকা প্রহারের আইন প্রণয়নের জন্য যে প্রস্তাব এনেছে তা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা, লেখালেখি হচ্ছে, প্রতিবাদ হচ্ছে। আমার সকল না-পাক অবিশ্বাসী বন্ধুদের পাশাপাশি অনেক বিশ্বাসী, মুসলিম, হিন্দু এবং খ্রীষ্টান বন্ধুগণ এ বিষয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়ে কারো অনুভূতির সত্যতা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার সমস্যা অন্য যায়গায়।

আলোচিত এই কাউন্সিলকে বর্বর বলে চিহ্নিত করাতেই আমার সমস্যা। একটু ভেবে দেখুন, তারা কি নতুন বা মনগড়া কোন কথা বলছে? তাদের পেছনে কি নেই প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো ধর্মীয় দলিলের সমর্থন?

এই প্রস্তাবের পরিপোষক দলিল দস্তাবেজের প্রতি যদি আপনার অগাধ শ্রদ্ধা থেকে থাকে, তাহলে তার ধারক এবং বাহক শ্মশ্রুমণ্ডিত নূরানি চেহারার কিছু মুরব্বী মানুষকে আপনি অকাতরে বর্বর গালি দেবেন, সেটা কেমন করে হয়? একটু একপেশে হয়ে যায় না?

2আপনি যদি হিন্দু হন, আমার বলার কিছু নেই, কারণ হিন্দু ধর্ম এবিষয়ে কি বলে তা আমার জানা নেই।  কিন্তু আপনি যদি মুসলমান বা খ্রিষ্টান হয়ে থাকেন, তাহলে আমি বলবো, আপনাকে মনস্থির করতে হবে, আপনি কি একচোখ দিয়ে দেখবেন, নাকি দুটোই বন্ধ করে রাখবেন? ধর্মবিশ্বাসের প্রতি আমার কোন অশ্রদ্ধা নেই, কিন্তু আমার অশ্রদ্ধা আছে আধখোলা চোখের প্রতি, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’।

আপনি যদি ডঃ জহুরুল হকের অনুবাদে সুরা নিসার বহুল উদ্ধৃত ৩৪ তম আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, আর যে নারীদের ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্যতা আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, আর শয্যায় তাদের একা ফেলে রাখো, আর তাদের প্রহার কর। তারপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য পথ খুঁজো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব জ্ঞাতা, মহামহিম।’ পড়ার পর বলেন ‘এই আমার ধর্ম, শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সত্য ধর্ম এবং মানুষের মংগলের জন্য এরকম ব্যবস্থাপনাই জরুরি, আমি আপনার সাথে তর্ক করবো না, কারণ আপনার জন্য কী জরুরি তা নির্ধারণ করার অধিকার আপনার অবশ্যই রয়েছে।  

কিন্তু আপনি যদি তারপরও বলেন, ‘না না কোথাও ভুল হচ্ছে। কোরান শরীফে এরকম বলা হতেই পারে না। আমি অবশ্য ঠিক জানি না, পড়ে দেখিনি, কিন্তু এটুকু বলতে পারি ইসলাম এরকম বলতেই পারে না’ তাহলেই একটা ঝামেলা হয়ে যায়।

আপনি জানেন, ধর্মবিশ্বাস যুক্তি দিয়ে হয় না, তবু আপনি বিনা যুক্তি প্রয়োগে আপনার নিজেরই ধর্মের বিধান মেনে নিচ্ছেন না। আপনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার ভয়ে পড়ে দেখতে পর্যন্ত রাজী নন। অথচ নিজস্ব যুক্তি প্রয়োগ করে দেড় হাজার বছরের পুরোনো একটি ধর্মীয় দলিলের গুরুত্বপূর্ণ বাণীর অর্থ নিজের সুবিধামত বদলে দিচ্ছেন। আপনি ধর্মের প্রতি অবিচার করছেন, যুক্তির প্রতিও অবিচার করছেন।

বিশ্বাস করুন আপনাকে আমি বুঝি, আপনি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন একসময় ওখানে, ঠিক ঐ স্পটটায় আমিও ছিলাম- বিশ্বাস আর যুক্তির মাঝামাঝি। তখন আমিও চোখ কান ফিরিয়ে নিয়েছি যদি এমন কিছু দেখে বা শুনে ফেলি যা আমার বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়। সহজ নয় মোটেই। ছেলেবেলা থেকে লালন করা বিশ্বাস আর বড় বয়সের যুক্তিজ্ঞানকে একসাথে মেলামেশা করতে দেয়াটা খুবই রিস্কি। তাই আপনি আপনার বিশ্বাস এবং যুক্তি কোনটাকেই পরিপূর্ণভাবে ধারণ করতে পারছেন না।  

Jesmin Chowdhuryআপনি নিশ্চয়ই ছোটবেলা থেকে শুনে আসা নারীর জন্য সম্মানজনক অজস্র সব ধর্মীয় আইন কানুনের কথা ভাবছেন। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত জাতীয় বিষয়গুলো আমিও জানি, এবং খুব পছন্দও করি, কিন্তু দয়া করে প্রসংগ পাল্টাবেন না। আমরা অবাধ্য স্ত্রীকে স্বামীর হালকা আঘাত করার অধিকারের কথা বলছি। যদি এবিষয়ে আপনার আস্তিনের ভেতরে কিছু থাকে তা বের করুন। যদি স্বামীর উপর স্ত্রীর সমমানের কোন অধিকারের কথা বলা হয়ে থাকে সেকথা বলুন। আমি মন দিয়ে শুনবো।

কাউকে আক্রমণ করার ইচ্ছা নিয়ে  রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে আমি কী-বোর্ড খটখটাতে বসিনি। আসলেই আমি বিভ্রান্ত বোধ করছি। ফেইসবুকের হোমপেজ জুড়ে উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রতি ঘৃণা জানিয়ে যেসব পোষ্ট এসেছে সেগুলি আমাকে আশার আলো দেখায়। মানুষ যখন ধর্মকে বুকে ধরে রাখার সাথে সাথে মানবিক অনুভূতি ও চিন্তা প্রসূত যুক্তি দিয়ে সেই ধর্মেরই বিধান প্রসূত আইনের প্রতিবাদ করে তখন আমি আশান্বিত বোধ করি কিন্তু একই সাথে আশৈশব দীক্ষার কাছে মানুষের অসহায়ত্ব দেখে মন খারাপ হয়ে যায়।  

কিন্তু অন্যদের কথা বাদ দিন, আমি আপনাকে বলছি। আপনি একজন আধুনিক নারী। আপনি আপনার বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করে বুঝতে পারেন  আপনার অধিকার কোথায়। যখন আপনাকে অপমান করার চেষ্টা করা হয়, আপনি প্রতিবাদ জানা্ন, রুখে দাঁড়ান কারণ আপনি শুধু নারীই নন, আপনি একজন সচেতন মানুষ। আপনি চান পৃথিবীটা আপনার জন্য, আপনার  ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর স্থানে পরিণত হোক।

কিন্তু আপনি জানেন না আপনি আসলে কিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। আপনার দুই গাল চেপে ধরে যে অপমান মুখে ঠেসে দেওয়া হচ্ছে, তার বীজ কোথায় তার সন্ধান আপনি জানেন না, বা সন্ধান করতে ভয় পান। সত্য জানার এবং মেনে নেয়ার সাহস আপনি আজো সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি। মিষ্টি ভেবে তেতো ফলের বীজ ছড়িয়ে দিতে আপনি নিজেও সহায়তা করছেন, যে ফল বারবার  আপনার জন্যই অপমানের বিষ হয়ে ফিরে আসবে।

আপনি আমি থাকবো না, সেই কুখ্যাত পাকিস্তানী মুসলিম কাউন্সিলও চিরদিন থাকবে না, তাদের বানানো আইনও আশা করা যায় কোনোদিন পাল্টাবে, কিন্তু তারা যে দলিলের উপর ভিত্তি করে এসব আইন তৈরি করছে সেসব দলিল দেড় হাজার বছর ধরে টিকেছে  এবং আপনাদের সযত্ন সহযোগিতায় আরো অনেক হাজার বছর টিকবে বলেই মনে হয়। কাজেই এরকম আইন তৈরি হবে বারবার, হাজার বার।

কাজেই তর্ক বাদ দিয়ে আসুন, আমরা দুইচোখ বন্ধ করে ব্লিসফুল ইগনোরেন্সে গা ভাসাই আর নারীর অপমানও চলতেই থাকুক।  

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.