ননদ ও মেয়েদের সমান সম্পত্তি দিয়ে যাবো

নাসরিন বিনতে ইসলাম: ৮ই মার্চ নারী দিবস মানে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আমরা এ সমাজে কতটা তুচ্ছ।আমাদের অধিকারের জন্য তথাকথিত পুরুষদের সামনে মিটিং-মিছিল করে ন্যায্য চাওয়াগুলি তাদের মনে করিয়ে দিতে হয়।কী হাস্যকর পাত্রে আমরা পরিণত হই।

Shantonaঅথচ এ পুরুষরাই আমাদের জন্যই পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে পারে। আমরা তাদের জন্ম দিয়ে লালন-পালন করে বড় করে তাদেরই করুণার পাত্রী হই।

আমি এসব পুরাতন এক ঘেয়ে কথা বলে সকলের বিরক্তির কারণ হতে চাই না। আমি আজ এই দিনে একটা আইন প্রণয়নের কথা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আর তাহলো নারীদের পৈতৃক সম্পত্তি পাওয়ার বিষয়ে পুরনো আইন বাতিল করে নতুন আইন তৈরি হোক।

বর্তমান আইন অনুযায়ী ছেলেরা বেশি পায়, মেয়েরা পায় তার অর্ধেক। আর বিবাহিত নারীরা স্বামীর সম্পত্তির দুই আনা পায় মাত্র।

আমার দুই মেয়ে, এক ছেলে। এখন যদি আজ আমার বর মারা যায় (খোদা না করুক) তবে আমি তার মোট সম্পত্তির মানে ১৬ আনার ২ আনা পাব। বাকি ১৪ আনার ৭ আনা পাবে আমার ছেলে, আর দুই মেয়ে পাবে ৭ আনা। এটা কেমন নিয়ম? আর আমার যদি ছেলে না থাকতো, তবে ছেলের ওই সাত আনা পেতো আমার দেবর বা ভাসুরের সন্তান। আর নইলে পুরো সম্পত্তি মেয়েদের নামে লিখে দিতে হতো, কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে পেত না।

আমরা মেয়েরা প্রাপ্য সম্পত্তি কখনোই পাই না। ধর্মীয়ভাবেই আমাদের ঠকানোটাই এখন মূলধারা হয়ে উঠেছে। আমি আমার মাকে দেখেছি ঠকতে।আমার নানা আমার মাকে ৫০ শতাংশ জমি দিয়েছিলেন ওয়ারিশ বাবদ, যদিও প্রাপ্য ছিল আরো অনেক বেশি। মা ওই জমি বুঝে নেয়নি কখনো। নানার মৃত্যুর অনেক পরে মা যখন ঐ জমিটা পেতে চাইলো, তখন দেখা গেল মামারা ঐ জমিতে স্কুল বানিয়েছে। মায়ের কাছে জমির দলিল থাকা সত্ত্বেও, উত্তর পেল, ‘কবরখানায় গিয়ে নানার কাছ থেকে জমি বুঝে নাও’।

মা সেই জমি আর পায়নি, তারপরও ভাইদের প্রতি ভালবাসায় তার টান পড়ে না। আমার শাশুড়ি জমি যেন কম পায়, সেজন্য আমার নানাশ্বশুর তার ছেলেদের নামে বেশির ভাগ জমি লিখে দিয়েছিলেন।

Women in Landএসব শুনে আমি আর কথা বলার ভাষা খুঁজে পাই না। মা নানার জমি পায়নি বলে বাবা অনেক কথা শোনাতো। আর ওই বাবাই আবার মেয়েদের ঠকানোর জন্য ছেলেদের নামে ৭৫% ভাগ দামী জমি লিখে দেয় কবছর আগে।

আমি এখন বাবার যে জমি পাবো, তার মূল্য ৫ লাখ টাকাও হবে না। অথচ বাবা যদি ছেলেদের জমি লিখে না দিতো, তবে আমি ৩০ লাখ টাকা পেতে পারতাম। কেন আমাকে এই লজ্জাকর পরিস্থিতি ফেইস করতে হবে?

একমাত্র কারণ আমি মেয়ে তাই।একই মায়ের পেটে জন্ম নিয়েও এ বৈষম্যটা মানতে বড় কষ্ট লাগে। ব্যথায় বুক ভেঙে কান্না আসে। আমি নিজে মা আর শাশুড়িকে ঠকতে দেখে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তাহলো আমি আমার ননদ আর মেয়েদের ঠকাবো না। আর এজন্যই আমি আমার বরকে বলে দিয়েছি, তোমার বোনদের প্রাপ্য জমি দিয়ে দিবে। আমার এ কথায় শাশুড়ি আর বর আমায় বোকা বলেছে বার বার। আমি তাদের বাধ্য করেছি জমি দিতে, তবে আমি শতভাগ সফল হতে পারিনি।

কেননা আমার শ্বশুরের মৃত্যুর পর যে জমি কেনা হয়েছে, তা সবই বরের নামে।ঐ কেনা জমির ভাগ বোনেরা পায়নি, তাই তারাও ঠকলো। আমার মেয়েরা ঠকবে না এটা ঠিক। আমরা মেয়ে হয়ে সমানাধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছি, যাবোই হয়তো আরও অনেকদিন। তবে আইন প্রণয়ন না হলে কাউকে বাধ্য করা যাবে না, আর তা না হলে কখনো সফল হবো বলে আমি মনে করি না।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

খুব সহজ করে খুব সত্য ও কঠিন কথা বলেছেন। অভিনন্দন। অভিনন্দন এই জন্যও যে নিজে যেন এই অন্যায়ের ভাগীদার না হন, সেই চেষ্টা আপনি নিজের জীবনে করেছেন। এর চেয়ে বড় এবং মহতী শিক্ষা আপনার আশেপাশের সকলে এবং আপনার সন্তানের পাবে না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.