মারজিয়া প্রভা: আদিবাসী মেয়েটা রেপ হলো। আসেনি কোন পত্রিকায়। বন্ধু পাপন ত্রিপুরা নিজে গিয়ে দেখা করে এসেছে মেয়েটার সঙ্গে।
তার স্ট্যাটাসের ভাষ্য অনুযায়ী, “বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকাল আনুমানিক পাঁচটার দিকে মাটিরাঙা উপজেলার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক আদিবাসী স্কুল ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। সাত অক্টোবর বিকাল পাঁচটার দিকে যখন মেয়েটি জেএসসি পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরছিল, ইচাছড়ি এলাকার একটা নির্জন স্থানে ওঁত্ পেতে থাকা পরিচিত নরপশু জাহাঙ্গীর আলম(২৮) তাকে ঝাপটে ধরে রাস্তা থেকে জঙ্গলে নিয়ে যায়। মুখ চেপে, তারই ওড়না দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। মেয়েটি কয়েকবার চিত্কার দিলেও পরে আর আওয়াজ বের করতে পারেনি। তারপর কী হলো সে আর বলতে পারেনি। শুধু মনে আছে, সেসময় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল”।
মেয়েটিকে উদ্ধারকারী তার মাসি জানান, তাঁরা মেয়েটিকে অজ্ঞান অবস্থায় রাস্তার পাশের একটি ঝোঁপে পান। মেয়েটির জিহবা বের হয়েছিল। গলার ওড়নার প্যাঁচ খুলে দেয়ার পরই মেয়েটি দম ফিরে পায়। তারপর তাকে মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেরি না করে সোজা খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয় তাঁকে।
রাত প্রায় আটটার দিকে তারা খাগড়াছড়ি হাসপাতালে পৌঁছান।
‘হাসপাতালের বেডেই আমি হুঁশ পাই, কারা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে আমি জানি না। পরে দেখি আমার আশেপাশে আমার মা ও গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়।’
দেখলাম, তখনও মেয়েটির গলা ফুলে ছিল। গলার ব্যথায় কিছু গিলতে সমস্যা হয় বলে জানায় সে। ধর্ষণের সময় তাকে মেরে ফেলার চেষ্টাও করা হয়েছিল। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় সম্ভবত মৃত ভেবেই তাকে ফেলে গেছে।
ম্যাজিস্ট্রেট পরে জানান, ভিক্টিম বলেছে “ ওটা ধর্ষণের চেষ্টা ছিল, ধর্ষণ না”। পাপেন ত্রিপুরার কাছে মেয়ে নিজে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে, পরে অন্য কথা বললো কেন কে জানে ? হয়ত চাপ দেওয়া হয়েছে উপর মহল থেকে।
আদিবাসী কন্যা বলেই কি কোন পত্রিকা কেয়ার করেনি বিষয়টা?

সংখ্যালঘুর প্রতি এই অমানবিক নির্যাতন নতুন না। মনে আছে নিশ্চয়ই সেই মুখতারান বিবির কথা। পাকিস্তানের মিরওয়ালা গ্রামের টাটলা গোত্রের এই মেয়েকে, গ্রামের পঞ্চায়েতের নির্দেশে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। তারপর তাঁকে বলা হয় রক্তাক্ত নগ্ন অবস্থায় ৩০০ জন মানুষের সামনে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে।
মেয়ের অপরাধ ছিল, তার নাবালক ভাই মাস্তুই নামক উঁচু গোত্রের এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক করেছে। নাবালক ছেলে বলে তাকে শাস্তি না দিয়ে, মুখতারানকে ধর্ষণ করে ৪ জন লোক। মুখতারান আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কী এক অদম্য লড়াকু মন ছিল তার! তাই ছুটে গেছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের কাছে, বিচার চাইতে এই অন্যায্যের। প্রেসিডেন্ট তাকে অপমান করে বের করে দিয়েছিল সেদিন, সারা বিশ্ব যাতে না জানে এই কলঙ্কের কথা, প্রেসিডেন্ট তাই এই ঘটনা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন।
ঠিক এই রকম একটা কেসে এই বছর ২০১৫ সালে আগস্টের ২৪ তারিখে ভারতের উত্তরপ্রদেশে দলিত সম্প্রদায়ের দুই বোনকে গণধর্ষণ করে, কালি মাখিয়ে ঘুরায় সারা গ্রাম। অপরাধ সেই একই, ভাই প্রেম করেছিল উচ্চবর্ণের সঙ্গে। ভাই নাবালক বলে বিচার হয়েছে বোনদের উপর। এই অপরাধে এখন পর্যন্ত কারও শাস্তির খবর আসেনি নিউজে।
সারা বিশ্বে সংখ্যালঘু নারীদের, কী আদিবাসী, কী নিম্নবর্ণ, তাদেরকে ধর্ষণ করাটা খুব সস্তা হয়ে যায়, আমাদের বিচারহীন ব্যবস্থার কাছে।
একটা সময় আমাদের দেশে গনিমতের মাল কথাটা খুব প্রচলিত ছিল। এখনও আছে। এটার মানে দাঁড়ায় সংখ্যালঘু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা যায় “ গনিমতের মাল” হিসেবে, যা কখনও অন্যায় না।
সত্য কথা এই যে, কোন দেশের মেইন্সট্রিম আইনি সুবিধা সংখ্যালঘু মেয়েদের জন্য না! মেয়েরা তো এমনিতেই অনিরাপদ আছেই সারা বিশ্বে, কিন্তু দেশে দেশে মাইনরিটি মেয়েদের অবস্থা আরও করুণ, আরও নিকৃষ্ট।