ড. সীনা আক্তার: অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছে এবং এই বিপ্লবের লক্ষ্য নানা কূটকৌশলে দেশে ইসলামী সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সচেতনভাবে অথবা অ-সচেতনতায় রাষ্ট্রযন্ত্র যখন এই ফাঁদে পা দেয়। আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রকাশ্য স্থানে প্রস্রাব করা ঠেকাতে একটা উদ্যোগ নিয়েছে এবং সে তৎপরতার উপর একটা ভিডিও চিত্র তৈরী করে প্রচার করছে।
এই উদ্যোগটি হচ্ছে, ঢাকা শহরের দেয়ালে লেখা ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ’ সতর্কবার্তাটি মুছে একই বার্তা আরবিতে লেখা হচ্ছে! মাননীয় ধর্ম মন্ত্রীর দাবী বাংলায় লেখা নিষেধাজ্ঞা মানুষ পাত্তা দিচ্ছে না, ফলে যেখানে সেখানে মূত্রত্যাগ বন্ধ হচ্ছে না। মন্ত্রীর মহোদয়ের মতে একই সতর্কবার্তা আরবি ভাষায় দেখলে মানুষ সেখানে প্রস্রাব করা থেকে বিরত থাকে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে কোরানের ভাষা আরবি এবং এ ভাষা ‘পবিত্র’ (?)। দেশের অধিকাংশ মুসলমান কোরান পড়ে কিন্তু সে ভাষা বুঝতে সক্ষম না, তবে আরবিকে পবিত্র ভাষা জ্ঞান করে বিশেষ সমীহ করে।
ফলে ”এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ” সতর্কবার্তাটি মানুষ আরবিতে দেখে তা সমীহ করে প্রস্রাব করা থেকে বিরত থাকে।
এখানে দুটো আলাদা বিষয়: প্রথমত, মূত্রত্যাগ রোধে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ, যার পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা- সমালোচনা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উদ্যেগটিকে সফল দাবী করে তথ্যচিত্র তৈরী ও এর প্রচার, এ বিষয়ে কোন আলোচনা আমার নজরে পরেনি। আমি এই দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে বেশী উদ্বিগ্ন, তাই শুরুতে এ বিষয়েই আলোকপাত করতে চাই।
১| প্রকাশ্যে প্রস্রাব বন্ধের সাফল্য দাবী করে ধর্ম মন্ত্রণালয় দুই মিনিটের একটি তথ্যচিত্র তৈরী করেছে, যেখানে ইংরেজীতে ধারা বর্ণনা করা হয়েছে। কোন্ দর্শকের জন্য এবং কি উদ্দেশ্যে এই তথ্যচিত্রটি তৈরী করা হয়েছে তা পুরোপুরি বোধগম্য না। স্পষ্টতই, এটা যত্রতত্র মূত্র ত্যাগকারীদের জন্য নয়, এমন কি এটা বাংলা ভাষাভাষি কোন দর্শকের জন্য নয়। মনে হচ্ছে তথ্যচিত্রটি তৈরী এবং প্রচার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য।
ইতোমধ্যে তথ্যচিত্রটি ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পরেছে, এবং বিবিসি, রয়টার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপের উপর সংবাদ করেছে। মন্ত্রণালয় কেন এই বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার করছে তা অস্পষ্ট। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্যচিত্রের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, আমাদের মিডিয়া থেকেও এ ব্যাপারে জানার চেষ্টা চোখে পড়েনি। যাইহোক, এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বিশ্বকে যে বার্তা দেয়া হচ্ছে,
– বাংলাদেশীরা যেখানে সেখানে প্রকাশ্যে প্রস্রাব করে।
-অধিকাংশ মুসলিম, কোরান পড়ে কিন্তু বোঝে না। তাই আরবি ভাষা দিয়ে জনগণকে ধোঁকা দেয়া যায়।
– আরবি ভাষার প্রতি জনগণের ধর্মীয় দুর্বলতা আছে এবং জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধের অপব্যবহার করা কোন ব্যাপার না।
এমনিতে বিশ্বের কাছে জাতি হিসাবে আমরা দুর্নীতিবাজ হিসাবে পরিচিত। এখন এর সাথে যুক্ত হচ্ছে উপরে উল্লেখিত গুনাবলী (!)। বিশ্বের সামনে একটা পুরো জাতিকে হেয় করে উপস্থাপন করার মত কাজ ধর্ম মন্ত্রণালয় কিভাবে করে! এই তথ্যচিত্র প্রচারে হয়তো আরো সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য আছে যা আমরা কল্পনা করতে পারছি না।
২| যেখানে সেখানে মূত্রত্যাগ ঠেকানোর জন্য আরবি ভাষার ব্যবহার একটা অ-বাস্তবসম্মত এবং অ-কার্যকর পদক্ষেপ। ধর্ম মন্ত্রণালয় জনগণকে যতটা বেকুব মনে করে তারা কিন্তু ততটা বোকা নয়। মানুষ কৌতুহলী হয়ে যখন এই আরবি তথ্যের অর্থ উদ্ধার করবে এবং পাত্তা না দিয়ে প্রস্রাব করতেই থাকবে, তখন মন্ত্রণালয় কি করবে? ধোঁকা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রস্রাব বন্ধ করা যাবে না। কারণ খাদ্য গ্রহণের মতই মল-মূত্র ত্যাগ একটা অন্যতম শারীরিক চাহিদা।
প্রস্রাব চাপলে তা চেপে রাখা যে কারো জন্যই কষ্টদায়ক, আমি মনে করি না বাস্তবে আরবি লেখা দেখে কেউ মূত্রত্যাগে বিরত থাকবে। সফলতার দাবীদার ঐ ভিডিও চিত্রটিকে আমার প্রামাণ্য চিত্র মনে হয় না বরং আয়োজন করে, অভিনয় করিয়ে তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে মনে হয়।
আরবি লেখা দেখে কেউ হয়তো সেখানে প্রস্রাব করবে না কিন্তু প্রস্রাব চেপে রাখার ফলে যে স্বাস্থ্যহানি হবে এর দায় কে নেবে? এছাড়া, কেউ হয়তো আশে পাশে যেখানে আরবি লেখা নেই সেখানে প্রস্রাব করবে।
এর মানে, পরিচ্ছন্ন জায়গা প্রস্রাবে নোংড়া হতে থাকবে। ধর্ম মন্ত্রণালয় কি তখন পুরো শহর আরবি লেখা কার্পেট দিয়ে ঢেকে দিবে! কতটা অপরিপক্ক, অবাস্তব, অন্তঃসারশূণ্য চিন্তার ফসল এই তৎপরতা! তাছাড়া চলার পথে নারীরা কোথায় প্রস্রাব করবে?
দাবী করা হচ্ছে মসজিদে প্রস্রাবের জায়গা আছে। নারী এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য মসজিদে কি কোন ব্যবস্থা আছে? মসজিদ কখনো পাবলিক টয়লেটের বিকল্প হতে পারে না। এ ধরনের তৎপরতা জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবহার করে মূল সমস্যাকে এড়ানোর সস্তা কৌশল! সহজ কথা, শহরগুলোতে প্রয়োজনীয় পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে, সেগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে রাখতে হবে এবং মানুষকে তা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
এছাড়াও, পূর্ত মন্ত্রণালয় বা সিটি কর্পোরেশানের দায়িত্ব পালনে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এত গরজ কেন সেটাও অস্পষ্ট। দেশকে ইসলামীকরণের ফন্দি ফিকিরের তো কোন অভাব নাই! সরকার কি সেরকম কোন ফাঁদে পরেছে? দেশকে ইসলামীকরণ বা ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এটা কি প্রথম পদক্ষেপ? যেখানে সেখানে প্রস্রাব করার মত নিন্দনীয় একটা অভ্যাস পরিবর্তনে আরবি ভাষার প্রচলন শুরু করে পরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই ফর্মূলা প্রয়োগ করার ফন্দি! যেমন, ঘুষ ঠেকাতে টাকার উপর আরবিতে লেখা, পবিত্র ভাষা বলে কথা!
ধীরে ধীরে আরবিকে সরকারী ভাষা হিসাবে চালু করতে পারলে এদেশের সকল মুসকিল দূর হয়ে যাবে, এমন দাবী করার মত মানুষ যেন দিনে দিনে বাড়ছেই। ইতোমধ্যে দেশে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চোখে পড়ার মত -ঘরে বাইরে অনেকের চলনে, বলনে এবং পোষাকে। এক দশক আগেও আমাদের সমাজ সংস্কৃতি এমন ছিল না। দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আমুল পরিবর্তনের এ যেন এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে মাদ্রাসার জন্য বরাদ্ধ সরকারী বই এর প্রচ্ছদ পরিবর্তন করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল, যেখানে প্রচ্ছদের কিশোর-কিশোরীকে ইসলামী পোষাক দিয়ে প্রচ্ছদ করতে হয়েছিল।
বলাইবাহুল্য, এ ধরনের আব্দার বা চাপ বাড়তেই থাকবে। মূত্রত্যাগ ঠেকাতে আরবিতে দেয়াল লিখন কি তেমনই নির্দেশিত (Prescribed) তৎপরতা! চাপ বা কূটকৌশল যে কারণেই হোক, সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নেতিবাচক পরিণতির সরাসরি শিকার হবে নারী। এতে নারীর প্রতি বৈষম্য-অবমাননা ন্যায্যতা পাবে, যেমনটা দেখা যায় আফগানিস্তানে। অন্যান্য পরিণতি তো আছেই।
পরিশেষে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হবার কথা মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ প্রসারে কাজ করা অথচ তারা করছে ছলচাতুরি। মন্ত্রণালয় জনগণের ধর্মীয় মুল্যবোধকে অসততার সাথে ব্যবহার করে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে চাইছে, নাকি কূটকৌশলে দেশে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বিপ্লব ঘটাতে চাইছে! আশা করি সরকার থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে।
সীনা আক্তার: সমাজবিদ।