আগুন আতঙ্ক নিয়ে শান্তির ঘুম

Emu
কিশোয়ার লায়লা, সাংবাদিক

কিশোয়ার লায়লা: ২৯ এপ্রিল সকালে ঘুম ভেঙ্গে পিটুলকে (স্বামী) প্রথম জিজ্ঞাসা, আচ্ছা, আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর কী অনেক দাম? ইদানিং আমার মাঝে ব্যবসায়িক ভাবনা ঘুরপাক খায়। তাই প্রশ্ন শুনে তার মন্তব্য, এবার কী তাহলে যন্ত্রপাতির ব্যবসা নিয়ে ভাবছো?

রসিকতা আমলে না নিয়ে, আপন মনে বললাম, কত দাম হতে পারে যে আমার দেশের সরকারের কেনার ক্ষমতা নেই! নিজেই নিজের জবাব দিলাম, আসলে কেনার ইচ্ছাইতো নাই। এবার পিটুল বুঝতে পারলো আমার প্রশ্নের শান ই নজুল।

আগের রাত ঠিক ২টায় হঠাৎ তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠেছিল ফ্ল্যাটের ফায়ার এলার্ম বা অগ্নি সতর্কতামূলক ঘন্টা। শুধু আমার নয়, ১৮ তলা ভবনের ২৮৮ টি ফ্ল্যাটে একসাথে বেজে ওঠে এই ঘন্টা। আগুন বা বড়ো কোন জরুরি অবস্থা ঘটলেই শুধু বাজে এটি। মূহূর্তেই রুম থেকে বেরিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কি হলো।

দরজা খুলে বেরিয়ে দেখলাম প্রায় সবকটি ফ্ল্যাট থেকেই প্রতিবেশিরা উঁকিঝুঁকি মারছেন। বুঝতে না পেরে এবার এলাম বারান্দায়। আমার ফ্ল্যাট ষোলতলায়। তাই দূর অবধি রাস্তা চোখে পড়ে। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই শুনতে পেলাম অগ্নিনির্বাপক গাড়ির সাইরেন। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে অশনিসংকেত আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দিকেই এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ। আমাদের ভবনের ভেতরেই ঢুকছে এক এক করে চারটি বিশাল বিশাল ফায়ার সার্ভিস গাড়ি।

বুঝতে বাকী রইলো না আগুন লেগে গেছে ভবনের কোথাও। কিন্তু লাগলো কোথায়? কোন চিৎকার বা ধোঁয়া আসছে না কোথাও থেকে। বারান্দা থেকেই দেখছি, দমকলবাহিনীর কর্মীরা নামছে গাড়ি থেকে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোন তাড়াহুড়ো নেই। আমরা ওপর থেকে দেখে গালি দিচ্ছি আর বলছি, একটু জলদি নামো, দেখো কোথায় কি হচ্ছে? একে তো ঘরের মধ্যে সতর্কতা বাজনা বেজেই চলছে। তার ওপর চারদিক থেকে দমকল বাহিনীর আরো গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের গাড়ি সব আসতে শুরু করেছে।

লাল হলুদ আলোর ঝলকানি আর তীক্ষ্ণ শব্দে মনে হলো গোটা টরন্টোবাসি জেগে গেছে! আমরা আতঙ্কে শেষ হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কর্মীদের চালচলনে নেই কোন রকমের অস্থিরতা- বরং ওপর থেকে দেখছি, তারা গল্প করছে! তখন মনে মনে বললাম, আমাদের দেশের কর্মীরাই ভাল। এতক্ষণে দৌঁড়াদৌড়ি আর পানি ছোঁড়াছুড়ি শুরু করে দিত! পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, কেন তাদের এই ধীরগতি! সেটা পরে বলছি।

প্রায় আধা ঘন্টা হতে চলল। ঘরের বাজনা এখনো বাজছে। কিন্তু আমরা এখনো অজ্ঞতার মাঝেই আছি। আগুনের লেলিহানশিখা কোথায় সেটা খোঁজার চেষ্টা করছি। ওপর থেকে দেখলাম, দমকলবাহিনীর কর্মীরা মাটির নীচের দুটো গ্যারেজের (বেজমেন্ট ও সাববেজমেন্ট) ভেতর যাচ্ছে যন্ত্রপাতি নিয়ে। আগুন তাহলে গাড়ি পার্কিংয়ে! প্রায় ৪৫ মিনিট পর দমকলবাহিনীর প্রধান ঘোষণা করলেন, তোমরা কেউ ঘর থেকে বেরুবেনা। আমরা তদন্ত করছি কি হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’’

বাঙ্গালীরা একটু অস্থির (আমার মতে)। তাই স্বভাববশতই বলে ফেললাম, ব্যাটা, এখনো তদন্ত চালাচ্ছো? একঘন্টা হতে চলল। আগুন কি তোমাদের কথা মতো বাড়বে কমবে? আবার বেরুতেও না করছো! আমি বাসার সবার জ্যাকেট, জুতো রেডি রেখেছি। ঘুমন্ত ছেলেকে অর্ধেক রেডি করেছি। ঘটনা খারাপ বুঝলেই নেমে পড়বো।

আস্তে আস্তে পোড়া গন্ধ নাকে লাগা শুরু হলো। ১৬ তলার করিডোরে সিড়িঘর দিয়ে কালো ধোঁয়া ঢোকা শুরু হয়ে গেলো।

নাহ, আর তো বাসায় থাকা যাবে না। এবার বেরুতেই হবে। ঠিক তখনই আবারো সবাইকে রুমে থাকার ঘোষণা। আশ্চর্য। ঘরে ধোঁয়া ঢুকছে! আর ওরা বলছো বাসায় থাকবো! গ্যারেজের একটি পথ ধরে কালো ধোঁয়া বেরুচ্ছে। গোটা ত্রিশেক ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। আর ওরা বলছে, বাসায় থাকতে।

কিছুতেই অস্থিরতা কমছে না। ওরা একের পর এক ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছে। প্লিজ, স্টে এট হোম। উই আর ডুইং আওয়ার বেস্ট।

আতঙ্ক আর অস্থিরতায় চলে প্রায় দুই ঘন্টা। ঘরের সতর্কতামূলক তীক্ষ্ণ আওয়াজ এখন সয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাইরেনও মধুর লাগা শুরু করেছে। ফেইসবুকে আতঙ্কের স্ট্যাটাস আপডেটও বন্ধ করে দিয়েছি।

একটু পরপর দমকল বাহিনীর প্রধানের, বাসায় থাকার অনুরোধও ভাল লাগছে। মনের অজান্তে তাদের ওপর অসম্ভব একটা আস্থা চলে আসে। এই পরিস্থিতিতেই আমি ঘুমন্ত ছেলের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। শোবার আগে, দেশে বাবা-মা’কে ফোন করে জানালাম, আর বললাম চিন্তা না করতে।

পৌনে ৫টা দিকে শেষবারের মতো ঘোষণা এলো, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে। আমরা সব ঠিক করেছি। সর্বোপরি সহায়তার জন্য ভবনবাসীদের ধন্যবাদ জানালেন দমকলবাহিনীর প্রধান। আমি ঘুম ঘুম অবস্থাতে তাকেও ধন্যবাদ দিয়ে ভাবছি, এবার বুঝলাম তোমরা কেন কোন তাড়াহুড়ো করোনি। কারণ তোমরা জানো, যত বড়ো আগুনই হোক না কেন তোমরা প্রস্তুত তা মোকাবেলা করতে। তোমাদের কাছে এমন সব যন্ত্র আছে যা দিয়ে আগুনের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে। তোমাদের অনুরোধের ক্ষমতা অনেক, যা দিয়ে তোমরা আতঙ্কিত মানুষদের ঘরে আটকে রাখতে পারবে। তাদেরকে শান্তির ঘুম এনে দিতে পারবে।

মনের অজান্তেই ভাবতে থাকলাম আমার দেশের কথা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যতগুলো ছোট বড়ো অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তারপরই দমকলবাহিনীর কর্মীরা দুঃখ করে বলেন, তাদের যন্ত্রপাতির অপর্যাপ্ততার কথা, লোকবল কমের কথা। আর সরকার বলে বাজেটের স্বল্পতার কথা।

আমি জানি না এখন কেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে তাদের কাছে? আমার ১৬ তলা বাসার দরজা পর্যন্ত চলে আসা কালো ধোঁয়া কিছুক্ষণের মধ্যেই যান্ত্রিক উপায়ে বের করে নেয়া হয়। আমার তো মনে হলো, শুধু এই যন্ত্রটাই প্রাণ বাাঁচানোর জন্য অনেক কিছু। কিন্তু এটা জানি, এই মূহূর্তে যদি দেশে বড়ো কোন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে (আল্লাহ না করুক) প্রাণ-মাল সবকিছুর ওপর দিয়েই যাবে। আগুন লাগলে মানুষ চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। যা সবচেয়ে বড়ো বাধা আগুন নিয়ন্ত্রণে। আমার দেশের মানুষরা এটা কবে বুঝবে?

দেশের বাবা মা, ফেইসবুকের বন্ধুবান্ধব সবাইকে চরম আতঙ্কে রেখে সেই রাতে আমি নিশ্চিন্তে শান্তির ঘুম দিতে পেরেছিলাম। ঘরে আগুন রেখে এমন শান্তির ঘুম কি আমার দেশের মানুষ দিতে পারবে আদৌ?

কিশোয়ার লায়লা

সাংবাদিক, টরন্টো

শেয়ার করুন: