বিয়ে কি একটা চুক্তি?

8 March 3তামান্না ইসলাম: আমাদের কালচারে ছোটবেলা থেকেই আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একবার কবুল বললে বা সাত পাক ঘুরলে তো একটা অচ্ছেদ্য চুক্তির জালে আটকে গেলে, যেন সুপার গ্লু দিয়ে দুটি হৃদয়কে একটি মন্ত্র বলে জোড়া দিয়ে একটা হৃদয়ে ম্যানুফেকচার করা হলো কোনো কারখানায়।

হাজারটা অমিল হোক, না থাকুক কোন ভালবাসার ছিটেফোঁটা তবু এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে। শুধুমাত্র, সমাজ, সংস্কার বজায় রেখে কতো যুগ ধরে কতো হাজার হাজার দম্পতি মুখ বুজে ভালোবাসাহীন এই সম্পর্কের বোঝা টেনে নিয়ে গেছে সারাজীবন।

আগে মেয়েরা ছিল অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ পরনির্ভর। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে ভেবে কতো মেয়ে ভালোবাসা বঞ্চিত হয়ে এমনকি মানসিক, শারীরিক অত্যাচার সহ্য করে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে। দুবেলা দু মুঠো ভাত, কাপড়, মাথা গুঁজার ঠাঁই আর সামাজিক পরিচয়, এতটুকুই ছিল তাদের চাহিদা। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যে একটা বড় ভিতই হছে প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা এই জিনিসগুলো আমাদেরকে কখনো শেখানো হয়নি।

আমরা জানি প্রেম খালি বিয়ের আগেই হয়। বিয়ের পরে আবার প্রেম কিসের? ওসব হোল আদিখ্যেতা। এই অতি পুরানো ভুল শিক্ষাগুলো, সামাজিক রীতিগুলো ধীরে ধীরে আমাদের সর্বনাশ করেছে, আমাদের সমাজে নানা ধরনের ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে। মেয়েরা এখন আর আগের মত পরনির্ভরশীল না, অনেকেই নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারছে।

মনের ভয় যখন কেটে যাচ্ছে, তাদের চোখে পড়ছে আমাদের সমাজে বিয়ে নামক সম্পর্কের ভিতটাই কতো নড়বড়ে। অন্য যেকোনো সম্পর্কের মতো এই সম্পর্কেও যে জল , হাওয়া দিতে হয়, এটা তো কেউ আমাদেরকে শেখায়নি। একজন স্বামীর চোখে স্ত্রীকে এবং একইভাবে একজন স্ত্রীর চোখে স্বামীকে যে সারাজীবন আকর্ষণীয় থাকার চেষ্টা করতে হবে, নিজেদের সম্পর্কের বাঁধনটাকে মজবুত রাখতে হয়, সেটা আমাদের মাথায়ই আসে না।

আকর্ষণটা শুধু শারীরিক না, এটা অনেক কিছুর কম্বিনেশন। সময়ের সাথে সাথে এই আকর্ষণের মাপকাঠি হতে পারে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, নির্ভরতা, স্যাক্রিফাইস। একেক মানুষ একেক জিনিসে আকৃষ্ট হয়, আবার একই মানুষ বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন জিনিসে আকৃষ্ট হয়। স্বামী, স্ত্রী দুজনেরই জানা থাকা ভাল তার জীবনসঙ্গী কিসে আকৃষ্ট হয় আর সে ব্যপারে যত্নবান হওয়া উচিত, ও আমার বউ বা আমার স্বামী, তাই সে আমার প্রতি আকৃষ্ট হতে চুক্তিবদ্ধ বা বাধ্য এই মানসিকতাটা ভুল।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, একজন স্ত্রীর খুব পছন্দের ব্যাপার হতে পারে ছুটির দিনে তার স্বামী তাকে রান্নায় সাহায্য করবে, হয়তো পুরো একটা আইটেম রান্না করবে তা না, একটু কাটাকুটি, একটু ধোয়াবাছা, সঙ্গে টুকটাক গল্প, এইটুকু করতে একজন স্বামীর খুব বেশী কষ্ট হওয়ার কথা না, দরকার শুধু আন্তরিক ইচ্ছা, তার বৌর কাছে যে এটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে পারা, আর সেই গুরুত্বটাকে গুরুত্ব দেওয়া।

একইভাবে একজন স্বামী হয়তো খুব পছন্দ করে তার বউ দিনের কিছুটা সময় তার পাশে এসে বসবে। এটাও খুব কঠিন কাজ না, হাজার ব্যস্ততার মাঝেও চেষ্টা করলে দিনে ১০/১৫ মিনিট সময় সব বউই বের করতে পারে, দরকার শুধু ইচ্ছাটা, এটাকে চাইতে হবে।

অনেক মেয়েই বিবাহিত জীবনে সন্তানদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে স্বামীর এই ছোটখাটো চাওয়াগুলোকে পাত্তা দেয় না, তার মানে কি, তার মানে হলো সেই মানুষটাকে দূরে ঠেলে দেওয়া, বুঝিয়ে দেওয়া তুমি আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ না!

একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষকে তীব্রভাবে চায়, শুধুমাত্র তখনই একজন আরেকজনের জন্য স্যাক্রিফাইস করতে পারে, নিজেকে বদলাতে পারে স্বেচ্ছায়। ভালবাসার প্রকাশ বিভিন্নভাবে হতে পারে, বাহ্যিক প্রকাশই একমাত্র পথ না। তবে বাহ্যিক প্রকাশেও ক্ষতি কি যদি না সেটা লোক দেখানো হয়?

যদি সেটা হয় শুধু নিজেদেরই জন্য? যৌবনে একজন মানুষ যেমন পাগলের মতো ভালবাসতে পারে, পরিণত বয়সে কয়জন সেটা ধরে রাখতে পারে? সেটা ধরে রাখতে না পারলেও ক্ষতি নেই, যদি পরিণত ভালোবাসা তার স্থান নেয়।

কিন্তু যেই বিবাহিত সম্পর্কে কোন ভালবাসারই কোন স্থান নাই, বা ” গ্রান্টেড ভালবাসার” মানসিকতা আছে, সেই সম্পর্ক একটা বোঝার মতো, সেখানে আনন্দ নাই, প্রাপ্তি নাই। এগুলো থেকেই আসে সম্পর্কের ক্লান্তি। আমাদের দেশেও আজকাল ডিভোর্স, পরকীয়া এসব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, আমাদের ভিতটাই যে ছিল নড়বড়ে, সেই ভিতে ফাটল তো ধরবেই একদিন না একদিন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.