এ ধরনের হয়রানি নতুন কী!

women 7একুয়া রেজিয়া: গত বছর ফাল্গুনের দিনে একুশে বইমেলায় গিয়ে দেখেছিলাম সোহরাওয়ার্দির গেটের সামনে ভীড়ের মাঝে এক মেয়ের ওড়না টেনে নিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে কয়েকজন তরুণ। মেয়েটি চিৎকার করছে। আমি দেখে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম।

ভালোবাসা দিবসে এমন অবস্থা হয়েছিলো যেন সেটা যৌন হয়রানির দিবস। টিএসসি থেকে বইমেলা সন্ধ্যা হওয়া মাত্র যেখানেই ভীড় সেখানেই ছিলো মেয়েদের জন্য লাঞ্ছনা। এমনকি মধ্যবয়স্ক নারীদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। আমার ক্লাস এইটে পড়া ভাগ্নির ক্লাসমেট আর তার মা সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছিলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ঊনার শাড়ির আঁচল টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিলো ঊনারই ছেলের বয়সী কিছু ছেলে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতেও এমন বহু কাহিনী দেখেছি। বইমেলায় মতো পবিত্র জায়গাকে অপবিত্র করতে এদের বাঁধেনি।

পহেলা বৈশাখ আমাদের দেশের অন্যতম উৎসবের নাম। লাল-সাদা শাড়ি পরে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে, রমনায় ইলিশ-পান্তা খেয়ে, মেলায় যেয়ে ছেলে-মেয়ে, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এই উৎসব পালন করে থাকে অকুণ্ঠ চিত্তে।

কিন্তু পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবসের মতো এইসব উৎসবের আরেক নাম এখন যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনা। এবং যারা এই যৌন হয়রানিগুলো করে তারা কেউ রাস্তার কোন কুকুর নয়, মানসিক হাসপাতাল থেকে আসা কোন অসুস্থ মানুষ নয় এরা অনেকেই এ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বাকিরা অনেকে আবার বিকৃত মানসিকতার মুখোশধরা কিছু লোক। উৎসব পালনের নামে যারা নারীদের লাঞ্ছনার শিকার করে বেড়ায়। এরপর জান্তব উল্লাস করে।

এদের জন্ম কোন মায়ের গর্ভ থেকে হয়নি এবং এরা কোন দিন কন্যা সন্তান ধারণ করবেও না বলেই মনে করে। কিংবা এরা প্রয়োজনে নিজে মা-বোন-মেয়ে, প্রেমিকা, স্ত্রীকেও মনে হয় জন্তুর মতো ছিঁড়ে ফেলতে প্রস্তুত। এরা মানুষের শরীরের আকৃতি পেয়েছে কিন্তু মনুষ্যত্ব পায়নি, বিবেক পায়নি। একটা রাস্তার কুকুরও মনে হয় জানে রাস্তায় কেমন আচরণ করা উচিৎ। আর এরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ট।

যারা নারীদের পোষাকের দোষ ছিলো বলে মুখে যুক্তির তুবড়ি ছোটাচ্ছেন তাদের এটাই বলতে চাই, এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে আর কতদিন ধর্ষণ আর যৌন হয়রানিকে সাপোর্ট দিবেন? যেই মধ্য বয়স্ক মহিলার কথা আমি লিখেছি তার আসলে কী সমস্যা ছিলো পোষাকে? আর আপনারা কি বলতে চান এই ছেলেগুলো মেয়েদের লাঞ্ছিত করে শেখাবে যে তাদের কেমন করে পোষাক পড়া উচিৎ?

বর্বরদের কোন জাত থাকে না। বর্বরদের কাজই হলো বর্বরতা করা। এভাবেই চলতে থাকলে আমরা যে কোন উৎসবের দিন আসলেও সবার আগে উৎসবের ঐতিহ্য বা অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু না বলে সবার আগে বলবো এই দিনগুলোতে কী নোংরামি হয়।

এভাবে চলতে থাকলে আমরা ভুলে যাবো, আমরা বাংলাদেশি, বাঙালিরা বসন্ত বরণ, বর্ষবরণ নামক উৎসব পালন করতে জানতাম। আমরা ভুলে যাবো, আমরা উৎসব প্রিয় জাতি। আমরা যে কোন উৎসবে, পার্বণে সবাইকে নিয়ে মেতে উঠতে ভালোবাসি।

একে একে আমরা ভুলে যাবো, আমরা মানুষ… আমাদের এই পৃথিবীতে সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়…

আমরা বলবো মানুষ একটা গালির নাম… যে গালিটির এই ধরণীর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার কথা ছিলো…

শেয়ার করুন: