তামান্না কদর: পুরুষকে ভালোবাসলে ‘নারীবাদ’ বাদ হয়ে যায়? তবে কি আমার নারীবাদ বাতিল হয়ে গেলো? জানি এ বঙ্গদেশে কোনোও পুরুষই তার সাথে সম্পর্কিত নারীর বেলায় শতভাগ নারীবাদী হতে পারে না। এটা তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়-রাজনৈতিক, পরিবার-শিক্ষা দ্বারা এতোটাই মগজ-জাত হয়েছে যে, বোধ করি, জেনেটিক কোডেও নারী-বিরোধিতা প্রতিস্থাপন হয়ে গেছে।
আগে একবার বলেছিলাম- সিমোনের উক্তিকে স্মরণে রেখে- ‘কেউ পুরুষ হয়ে জন্মায় না, ক্রমশ পুরুষ হয়ে ওঠে।’ কিন্তু যে পুরুষ ক্রমশ মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে তাকে তো ভালো বাসতেই পারে নারী। পুরুষ তার নিজের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণহীনতার দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর। নারীর সব কিছুতে এতো বাধা, মাঝেমাঝে ভাবি এতো ‘না’ নিয়ে নারী বাঁচে কি করে! আমি বেঁচে আছি কী করে? বেঁচে কি আছি আদৌ? প্রাণটা দেহের মাঝে ধারণ করাকে বেঁচে থাকা বলে? জীবন কি উপভোগ করি? নাকি যাপন করি?
এ বঙ্গদেশে কোনো মেয়েই জীবন উপভোগ করে না, যাপন করে। বিলাসী মেয়ের জীবনকে উপভোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমি জানি ভেতরে ভেতরে প্রতিটি মেয়েই এ সমাজে, পরিবারে, রাষ্ট্রে কি ভীষণ অসহায়! তাদের শরীরকে তারাই এখন ভাবতে শিখেছে অসহায়ত্বের আধার। তাই প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যে কখনো এরা শরীরকে করতে বাধ্য হয় আশ্রয় অখবা কখনো বাধ্য হয় পুরো আবৃত করতে। আমার অবাক লাগে, নারীর ওপর এতো পীড়নের পরও নারী তার সদ্যজাত ছেলেসন্তানটির মৃত্যু কামনা করে না, বরং অতিরিক্ত আদর করে। এ-অতিরিক্ত আদর করা জৈবিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক। আর এ-অতিরিক্ত আদরই নারীর ওপর পীড়নের ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত করে। নারী কবে এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে যেখানে ছেলে সন্তানটিকে বেশী আদর-আহলাদে, মেয়ে সন্তানটিকে কম আদর-আহলাদে বড়ো করে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনোও ছেলে সন্তানের মা হবার আকাঙ্খা করি না। আমার সন্তান বলেই যে সে মানুষ হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ আমার চে বেশী প্রশ্রয় দেবে এ সমাজ এবং রাষ্ট্র, সুতরাং বেশী প্রশ্রয় কে ত্যাগ করতে চাইবে? এই ছেলে সন্তানই হয়তো বড়ো হয়ে বলবে- ‘তুমি মহিলা, তুমি কী বোঝ? হয়তো সে কীভাবে কোন্ পোশাক পরতে হবে তার নসিহত করবে। হয়তো সে-ই নির্ধারণ করে দিতে চাইবে কখন ঘরে ফিরবো, কখন বেরুবো। কতক্ষণ বাইরে থাকা উচিত হবে।’ এ-সব আমার একেবারেই সইবে না।
বহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়ালে আমি আমার যাবতীয় দুঃখ ভুলে যাই। কোনো পূর্ণিমার রাতে প্রবল ইচ্ছে হলেও রাতের বেলা একা এই বহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়াবার বাসনাটি বাস্তবায়ন করতে পারি না। ভয় কিন্তু ছিনতাই এর নয়। ভয় যে কিসের এ বঙ্গদেশের নারীমাত্রই তা জানে। একদফা হেনস্থাই নারীর জন্যে যখেষ্ট মনে করে না সমাজ, যতোদিন নারী বেঁচে থাকে হেনস্থার পর হেনস্থা হতেই থাকে।
নারী কী করবে কী করবে না, কোন্ পোশাক পরবে কোনটা পরবে না, কী বলবে কী বলবে না সব কিছুই পুরুষ এবং এ সমাজ নির্ধারণ করে দেয়; সেই মতো থেকেও কি নারীর জীবনের মূল্য কিছু বেড়েছে বরং কমেছে, নারীর জীবনে অপবাদ কি কম জুটেছে, বরং বেশীই জোটে তাহলে নারী কেনো তার নিজের মতো করে জীবন চালাবে না? যেদিকে যাবে নারী সেদিকেই তার দোষ তাহলে নিজের মতো করে জীবন চালানোই কি উচিত নয়? নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দেয় কোন্ মুখে পুরুষেরা? নারীর ওপর পীড়নের প্রতিবাদ একা নারী করবে, পুরুষ নয়? মুখে প্রতিবাদ কি আদৌ কোনো সমাধানিক প্রতিবাদ?
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে এমন শাস্তি প্রয়োগ করার নির্যাতক পুরুষের ওপর, যাতে আর একজন নারীও পীড়নের শিকার না হয়। এবং বহুমুখি পীড়নের হাত থেকে মুক্ত করার জন্যে শিক্ষানীতিতে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন।
পুরুষগণ একবার ভাবুন তো, এখন যে জীবন নারী যাপন করে তা আপনাদের যাপন করতে বলা হলো, আর আপনাদের জীবন নারীদের জন্যে উন্মুক্ত করা হলো, কেমন লাগবে? ভাবুন। তবে একথা সত্যি, এ-বেলায় নারী দ্বারা যৌন হেনস্থার সম্ভাবনা একেবারে থাকবে না বলেই আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি।