হায় আমার বাংলা, দুখিনী বাংলা…..

Flag 2সুমন্দভাষিণী: বাংলা নববর্ষের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মেয়েদের বিবস্ত্র করা সংক্রান্ত যে ঘটনাটি ঘটলো, তা মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশক ধরে বাংলা নববর্ষ যে রূপ নিয়েছে, যে আনন্দময় ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে, যে সার্বজনিন উৎসবে দাঁড়িয়েছে, তাতে যারা এইদেশকে ‘বাংলাস্তান’ বানানোর স্বপ্নে বিভোর বা যারা এটা করতে সত্যিই বদ্ধপরিকর, তাদের গাত্রদাহের যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি! জামায়াতে ইসলামি, তথা হেফাজতে ইসলাম এর অনুসারিরা এই নববর্ষ পালনকে তাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই দেখছে। তারা জেনে গেছে, এই দেশে বোমা হামলা ঘটিয়েও উৎসবমুখী বাঙালীকে রোখা যাবে না। ধর্মের নাম করে মুক্তমনাদের ওপর যতোই চাপাতির আঘাত আসুক, যতোই খুন করুক না কেন, সত্যিকার অর্থে তাদের কণ্ঠরোধ করা সত্যিই দু:সাধ্য।

পাকিস্তান আমলে কী হয়েছিল? পাকিস্তানিরা জানতো, বাঙালীকে শায়েস্তা করতে হলে রাজনীতি দিয়ে নয়, তাদেরকে প্রথমে মারতে হবে সংস্কৃতি দিয়ে। তাই তারা ভাষার ওপর আঘাত হেনেছিল। সফলকাম হয়নি। তারপর তারা এইদেশের সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো একে একে, রবীন্দ্র সঙ্গীত বন্ধ করতে চাইলো, অনেকের লেখনীর ওপর হামলা হলো, কিছুতেই কিছু হলো না। পুরো উদ্যমে সেইসব নিষেধাজ্ঞাকে থোরাইকেয়ার করেছেন আমাদের পূর্বসুরিরা। পরবর্তীতে রাজনীতি এবং সংস্কৃতি মিলে বিপ্লব ঘটলো, স্বাধীনতা পেল বাংলাদেশ। তখনও ধর্ম অত শক্তিশালী ছিল না।

পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে ধর্মকে সবলে প্রবেশ ঘটানো হলো। বাঙালীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধীরে ধীরে প্রবেশ করানো হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। যা এখন মহীরূহ আকার নিয়েছে। আজ বাংলার ঘরে ঘরে মৌলবাদের চাষ হচ্ছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। পারিবারিক শিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরিই নষ্টদের দখলে চলে গেছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে মনে হয় না, সেখানে কোনো মানবিকতার চাষ হয়। ভীষণ কষ্ট হয় এসব প্রজন্ম দেখে, ভবিষ্যত দেখে।

তারপরও রক্ষা যে কিছু মানুষ এই মহীরূহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে পথ চলতে শিখেছে। তারা হয়ে উঠেছে সার্বজনিন বাঙালী। যেখানে চেতনা-সংস্কৃতি-নারী স্বাধীনতা সব একাকার। কিন্তু বেছে বেছে বার বার আঘাত করা হচ্ছে সেই চেতনায়। কিন্তু হামলাকারীরা জানে না, বাঙালী যতবার মুখ থুবড়ে পড়ে, ততবার আরও শক্তিশালী হয়ে পথে নামে।

নারীর ওপর আঘাত তো আর নতুন না। যুগে যুগে সব সরকারের সময়েই নারী ছিল এবং আছেও সব নির্যাতনের কেন্দ্রবিন্দুতে। এখানে নারী নির্যাতনের কম বিচারই হয়, শাস্তি তো আরও পরের পর্ব।

ফেসবুকে গতকাল যেমন ইলিশ আর লাল-সাদার জোয়ার বইছিল, তেমনি এখন বইছে নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড়। একদল প্রতিবাদ করছে গতকালকের এই হামলার ঘটনার, কেউ কেউ আবার এই ঘটনার পিছনে ছাত্রলীগের নাম জড়িত থাকায় তার সত্যতা যাচাই করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। কিছুদিন আগেই পুলিশের নাকের ডগায় খুন হন ড. অভিজিৎ রায়, আর গতকাল লাঞ্ছিত হলো কিছু মেয়ে। বিশ্বকাপ চলার সময় বাংলাদেশ দলের বিজয়ের দিনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের কয়েকটি মেয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিল, গত বছর যখন আমরা জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে গিনেস বুকে নাম উঠাতে তৎপর, সেই ভিড়েও কিন্তু মেয়েরা লাঞ্ছিত হয়েছে, কিন্তু সেই খবর আসেনি গণমাধ্যমে। মেয়েদের বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

কিন্তু আর কতোকাল সইতে হবে এসব? আর কতদিন আমরা ভুগবো এমন বিচারহীনতায়? ২০০০ সালে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধনকে যারা বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের যে পরিমাণ হেনস্থা হতে হয়েছিল, এমনকি জেলও খাটতে হয়েছিল, সুতরাং কেউ যে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে না, আসে না, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তাহলে অপমানিত হওয়া, ধর্ষণের শিকার হওয়া আমাদের নির্ধারিত পরিণাম।

অন্য একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলেই না। শুরু করেছিলাম নববর্ষ পালনের সার্বজনিনতা নিয়ে। মোল্লাদের একটি গ্রুপ বরাবরই এর বিরোধিতা করে আসছে। এই বছর তারা এই উৎসব বানচালের নানারকম চেষ্টা-তদবিরও করেছে। নাম-না জানা অসংখ্য আইডি থেকে মেইল এসেছে নববর্ষ পালন করা কত বড় অন্যায় আর পাপ কাজ, তার বর্ণনা দিয়ে। তার কিছু কিছু এখানে তুলে ধরলাম:

“কথিত বাংলা প্রকৃতপক্ষে ফসলী নববর্ষ, ইংরেজি নববর্ষ, আরবী নববর্ষ ইত্যাদি সবই মজুসী-মুশরিক, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী, নাছারা তথা বিধর্মীদের তর্জ-তরীক্বা। অতএব, কোনো মুসলমানের পক্ষে বিধর্মীদের কোনো তর্জ-তরীক্বা পালন করা কখনোই জায়েয নেই; বরং পালন করা কাট্টা কুফরী। কাজেই যে মুসলমান পহেলা বৈশাখ পালন করবে সে মুরতাদ হবে। ফলে তার জিন্দেগীর সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যাবে। তার ওয়ারিছস্বত্ব বাতিল হয়ে যাবে। সে হজ্জ করে থাকলে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং সে বিবাহ করে থাকলে তার বিবাহও ফাছেদ হয়ে যাবে। সুতরাং পহেলা বৈশাখ পালন করা থেকে বিরত থাকা সকল মুসলমানের জন্য ফরয”।

“৯৮ ভাগ মুসলমানের দেশের সরকারের জন্য ফরয হচ্ছে- সরকারিভাবে এসমস্ত হারাম ও কুফরী কাজ থেকে সকল মুসলমানদেরকে বিরত রাখা। পহেলা বৈশাখ পালনের ইতিহাস পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার সাথে সম্পৃক্ত নয়। এটা পালন মুসলমানগণ উনাদের কাজ নয়। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, নওরোজ বা পহেলা বৈশাখ পালনের সংস্কৃতি মজুসি, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের থেকে এসেছে”।

“নারী টিজিং, সম্ভ্রমহরণ, খুন-রাহাজানি, পারিবারিক কলহ থেকে সামাজিক বিবাদ ইত্যাদি আরো বাড়ে। দলবাজি আরো চাঙ্গা হয়। দুর্নীতিপ্রশাসন থেকে বিচারবিভাগ সর্বত্র আরো বিস্তৃত হয়। বাড়ে দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের চরম সীমা লঙ্ঘিত হয়। বাড়ে ক্ষুধার্তের সংখ্যা। আর্তের সংখ্যা। বস্ত্রহীনের সংখ্যা।

বাড়ে লোভীর সংখ্যা। বাড়ে অবৈধভাবে নারী দেহ ভোগকারীদের সংখ্যা। ব্যভিচারের সংখ্যা। দেহ ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। চরিত্রহীনদেরসংখ্যা। মাদকসেবীদের সংখ্যা। সন্ত্রাসীদের সংখ্যা। বাড়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়। মনুষত্বের অবক্ষয়”।

“পহেলা বৈশাখ এমনই একটা পার্বন যেটা থেকে মুসলমানদের দূরে থাকা উচিত। পহেলা বৈশাখ মওজুসীদের (যারা অগ্নির উপাসক) উৎসবের দিন; হিন্দুদের ঘটপূজা, গনেশ পূজা, সিদ্ধেশ্বরী পূজা, ঘোড়ামেলা, চৈত্রসংক্রান্তি পালন, চড়ক বা নীল পূজা, গম্ভীরা পূজা, কুমীরের পূজা, মারমাদের পানি উৎসব, চাকমাদের বৈসাবী, বৌদ্ধদের উল্কি পূজা ইত্যাদি অর্থাৎ মুসলমানদের পালনীয় কোনো বিষয় পহেলা বৈশাখের মধ্যে নেই। অর্থাৎ পালনীয় যদি কিছু থেকে থাকে তা হিন্দু-বৌদ্ধ, মওজুসী, মারমা-চাকমাদের জন্য। এই পূজা বা শিরকী কাজের উপলক্ষ করে যে মেলার আয়োজন, সেই মেলায় যদি কোনো মুসলমান উপস্থিত হয়, কেনা-কাটা করে কিংবা স্রেফ ঘোরাঘুরি করার জন্যও যদি যেয়ে থাকে, তাহলে সে শিরকের গুনাহে গুনাহগার হবে। যদি কোনো মুসলমান বৈশাখী মেলায় কাফির-মুশরিকদের অনুসরনে পান্তা-গান্ধা খায়, বাসায় আয়োজন করে খেলেও কাফিরদের আয়োজনে সামিল হওয়ার কারণে সে আর ঈমানদার থাকতে পারবে না। নাউযুবিল্লাহ”!

“যেহেতু বাদশাহ আকবর ছিলো মোঙ্গলীয় তাই এই দিন গণনা পদ্ধতিটি কিছুতেই বাংলা হতে পারে না, কারণ তখন বাংলার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না।পরবর্তীতে এটি হিন্দুদের চক্রান্তে ট্রোজান হর্সের মতো মুসলমান অধ্যুষিত বাংলার ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে ‘বাংলা সন’ নামে ধারণ করে।

বৈশাখের প্রথম দিনটি মূলত হিন্দুদের অনেকগুলো পূজার দিবস। আর এই হিন্দুয়ানী দিবসটিকে মুসলমানদের পবিত্র ভূখণ্ডে জারি করতে পহেলাবৈশাখকে ‘বাংলার ঐতিহ্য’ বলে গণপ্রচারণা চালায় হিন্দু র’ নিয়ন্ত্রিত কিছু মিডিয়া”

…তাহলে বুঝে দেখুন পাঠক, আমরা আসলে কীসের মাঝে, কাদের সাথে বসবাস করছি! এরা কারা? নিশ্চয়ই আমাদের আশপাশেরই মানুষ? তো, এরকম মানসিকতার মানুষজন হামলে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা দেখলো, এগিয়ে এলো না মেয়েদের বাঁচাতে, যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দর্শক হয়ে রইলো, তাদের আপনি কোন নিক্তিতে মাপবেন? ওখানে সত্যিকারের মানুষ থাকলে তো এই বখাটে বলি আর সন্ত্রাসীই বলি, তাদের পালাতে পারার কথা না। তার চেয়েও বড় কথা, এতো এতো মানুষের মধ্যে তাদের এমনটি ঘটানোর সাহসই হওয়ার কথা না।

লেখাটা শেষ করি সাংবাদিক শরিফুল হাসানের স্ট্যাটাস দিয়ে…”প্রতিবছরই উৎসবের দিনগুলোতে ক্যাম্পাসে মেয়েরা লাঞ্ছিত হবে, বিবস্ত্র হবে। তবুও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ,পুলিশ সবাই নির্বিকার থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্ররাও কিছু করতে পারবে না?

এভাবে আর কতোদিন? এই বুঝি বাংলাদেশ”।

শেয়ার করুন: