প্রবাস কি কেবলই সুখ?

রিমি রুম্মান:

দেশে থাকা অধিকাংশ মানুষের কাছে প্রবাস মানে অন্তহীন সুখ, কাড়ি কাড়ি টাকা। আসলেই কি তাই ? বেশ কয়জন প্রবাসীর অভিজ্ঞতা তুলে এনেছি এবারের লেখায়। সঙ্গত কারণেই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

১। নীলার সাথে জুয়েলারি দোকানে দেখা হয়েছিল গত ঈদের আগেরদিন। স্বামীর সাথে জ্যাকসন হাইটসে শপিং এ এসেছিল। নিজের জন্যে স্বর্ণের চেইন কিনেছে। কেনাকাটা শেষে স্বামী বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল কাজের উদ্দেশ্য। আমায় চেইনটি দেখিয়ে নীলা বললো, অনেকদিনের শখ, এবার ঈদ উপলক্ষ্যে রীতিমতো জেদ ধরেই কিনেছি। জেদ কেন, জানতে চাইতেই বেশ দুঃখের সাথে জানালো, প্রতি ঈদে স্বামী দেশে তাঁর ভাইদের পরিবারকে শপিং এর জন্যে মোটা অংকের ডলার পাঠিয়ে থাকেন। দেশের স্বজনরা সেইসব শপিং আনন্দের সাথে ভিডিও কলে দেখায়। অথচ নিজের স্ত্রী, সন্তানকে কিছু কিনে দিতে স্বামীর বড্ড অনীহা ! বলেন, ‘ বিদেশের বাড়িতে তোমাদের নতুন জামা, শাড়ি কে দেখবে ? ওদের তো চারপাশে পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন আছে। সবাই জানতে চাইবে, বিদেশ থেকে ভাই কি দিয়েছেন ঈদ উপলক্ষে?’ অথচ ছোট্ট একটি সেমি বেইজমেন্টে আমরা কত কষ্ট করেই না থাকি, সে খবর দেশে কেউ জানে না।

২। সাকিব নিউইয়র্ক নগরীতে ইয়োলো ক্যাব চালায়। কাজে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশ থেকে ফোন এলো। বড়ভাইয়ের হার্টের অসুখ ধরা পড়েছে। সার্জারিও করতে হতে পারে। চিকিৎসার জন্যে বড় অংকের টাকার প্রয়োজন। ফোনের অন্যপ্রান্তে মায়ের কান্নার আওয়াজ। কথা শেষে বিষণ্ণ মনে কাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে সাকিব। তখন জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মাস। নিউইয়র্ক নগরীতে ইয়োলোক্যাব চালকদের আয় রোজগারে মন্দা সময়। ব্যয়বহুল এই শহরে বাড়িভাড়া দেবার পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে তাঁদের মোটামুটি চলে যায় যদিও, কিন্তু বাড়তি সঞ্চয় থাকে না। তাই দেশে বাড়তি ডলার পাঠাতে হিমশিম খেতে হয়, বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। একদিকে মানসিক চাপ, অন্যদিকে বিশ্রামহীন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, ফলশ্রুতিতে চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে থাকে। পাশ দিয়ে শাঁ করে ছুটে যাওয়া বাইক চালককে ঠিকভাবে দেখতে পায়নি। আচমকা ঘটে যায় দুর্ঘটনা। তাঁর ইয়োলো ক্যাবটি বাইক চালককে সজোরে ধাক্কা দেয়। বাইক চালক মারাত্মকভাবে আহত হয়। এ্যাম্বুলেন্স আসে। আহতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ সাকিবকে হাতকড়া পরিয়ে সাথে নিয়ে যায়।

৩। অন্য শহর থেকে যাত্রী নিয়ে এক ট্যাক্সিচালক ছোটভাই এসেছে জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে। ভাড়া মিটিয়ে যাত্রী নেমে গেলে ‘অফ ডিউটি’ দিয়ে তাঁর ফিরে যাবার কথা। কিন্তু আচমকা এক মধ্যবয়েসি শ্বেতাঙ্গ পুরুষ হ্যান্ড ক্যারিয়ার হাতে এগিয়ে আসেন। খুব করে অনুরোধ করেন তাঁকে নিউওয়ার্ক এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিতে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া দিবেন বলে জানান। যদিও আইনগতভাবে অন্য শহরের ট্যাক্সি ড্রাইভার যাত্রী এনে নিউইয়র্ক নামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু যাত্রী তোলার নিয়ম নেই, তবুও বোনের বিয়ের টাকা পাঠাবার মানসিক চাপ ছিল বলে কিছু বাড়তি আয়ের কথা ভেবে যাত্রীকে গাড়িতে উঠার অনুমতি দেয়। অমনি কয়জন পুলিশ এসে তাঁকে ঘিরে ধরে। ছোটভাইটি ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে যায়। যাত্রী সেজে আসা পুলিশ অফিসার তাঁকে দুই হাজার ডলার জরিমানা করে!

৪। এবার আসি আরেক পরিচিতজন প্রসঙ্গে। দেশ থেকে বেড়িয়ে এসেছেন ক’দিন আগেই। দেখা হতেই দেশ, প্রিয়জন, স্বজনদের খবরাখবর জানতে চাই। বেশ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের সাথে জানায়, দেশে ছুটে যাই বারবার প্রিয়জনদের মায়ায়, মাটির টানে। প্রতিবারই দুঃখজনকভাবে একরাশ দুঃখ নিয়ে ফিরে আসি। মনে হয়, না গেলেই বোধ করি ভালো থাকা যেত। প্রতিবার প্রিয়জনদের জন্যে উপহার নিয়ে যাই, তবুও যেন কাউকে সন্তুষ্ট করা যায় না। যাকে আপনভেবে বেশি জিনিষ দেই, সে ভাবে, ‘এ আর এমন কী! একটা আইফোন তো আনতে পারতো!’ আর যাকে তুলনামূলক কম দেই, তাঁর অভিযোগ, ‘ওঁকে এতোকিছু দিয়েছে, সে তুলনায় আমায় কিছুই দেয়নি।’

আমাদের কথোপকথনের এ পর্যায়ে আমার এক ইউরোপ প্রবাসী আত্মীয়ের কথা মনে পড়ে গেল। একবার দেশে বেড়াতে যাবার সময় প্রিয়জনদের কারও কারও জন্যে ফোনসেট নিয়ে গেল উপহার হিসেবে। ভেবেছিল দামি উপহার পেয়ে সবাই যারপরনাই আনন্দিত হবে। কিন্তু কয়দিন পরেই কানাঘুষা শোনা গেল, ‘নিশ্চয়ই বিদেশের ফুটপাত থেকে কিনে এনেছে, নইলে এতগুলো ফোন কি কেউ দাম দিয়ে কিনে!’

৫। আমার এক সময়কার সহকর্মীর কথা বলি। তখন চিঠি লেখার প্রচলন ছিল। একদিন লাঞ্চ ব্রেকে বেশ মনখারাপের স্বরে জানালো, দেশ থেকে চিঠি এসেছে। বড়ভাই লিখেছেন তাঁর শরীরে টিউমার ধরা পড়েছে। ভারতে গিয়ে তা অপসারণ করতে হবে। বড়ভাই নিজের অর্থনৈতিক অক্ষমতার কথা জানিয়েছেন চিঠিতে। আমার সহকর্মী ক্ষোভের সাথে আমাদের বললেন, ‘সামর্থ্য নেই তো পাশের দেশে যাবার প্রয়োজন কী! দেশেই করাক না চিকিৎসা!’ যতই উত্তেজিত আর রাগান্বিত হোন না কেন, কয়দিন পর বেতন পেয়েই কাজ শেষে মানি এক্সচেঞ্জে যেতে হলো আমার সেই সহকর্মীকে। আবেগের কাছে নতি স্বীকার করতে হলো। দেশে কারও অভাব, অসুখ, মৃত্যু যা-ই হোক না কেন, সকলের প্রত্যাশা পরিবারের প্রবাসী সদস্যের দিকে। এই প্রবাসীরাও যে অভাবে থাকে, অসুখে ভোগে, প্রচণ্ড মানসিক চাপে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, সে খবর কেউ রাখে না।

অথচ আগে মানুষ অল্পতেই কতো খুশি থাকতো। আমাদের বড় মামা মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরি করতেন। আপা কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেছে জেনে মামা খুশি হয়ে চিঠি লিখেছিলেন, ‘পরের বার দেশে আসিলে তোমার জন্যে একখানা হাতঘড়ি আনিব।’ এরপর মামা বহুবার দেশে এসেছেন। কিন্তু হাতঘড়ি আনা হয়নি কোনদিনই। এ নিয়ে আমাদের মাঝে কখনোই ক্ষোভ কিংবা আক্ষেপ জাগেনি। মামা বেড়াতে এলে আমরা আনন্দিত হয়ে উঠতাম। আমাদের ঘর আলোকিত হয়ে উঠত। আরেকবার বিদেশ থেকে এক আত্মীয় মেকআপ এবং অন্য আত্মীয় সাবান উপহার দিয়েছিলেন ভালোবাসা স্বরূপ। আমরা আনন্দে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। সাবান, মেকআপ শোকেসে সাজিয়ে রাখলাম বছরের পর বছর। মেয়াদোত্তীর্ণ হলো, তবুও যত্নে তুলে রাখলাম। আমরা সত্যই অল্পতে খুশি থাকতাম। অথচ এখনকার দিনে মানুষের খুশি হবার বোধটাই যেন হারিয়ে গেছে। তবে এখনো হাতেগোনা কিছু মানবিক মনের মা-বাবা, ভাইবোন আছেন, যারা বলেন, ‘কিছুই চাই না, শুধু তুমি আসো, তোমাকে দেখতে চাই।’

প্রবাসীদেরও যে কিছু ভুলত্রুটি নেই, তা তো নয়! ‘বলে কিচ্ছু হবে না’ এই ভেবে প্রবাসীরা তাঁদের দুঃখ কিংবা কষ্টের কথা কাউকে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কিন্তু তাঁদের জীবন যুদ্ধের কথা, অমানুষিক পরিশ্রমের কথা, কোন পরিস্থিতিতে কেমন আছে, সঠিক তথ্য দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের জানানো প্রয়োজন। নইলে হয় মৃত্যুহীন মৃত্যুযন্ত্রণা তাড়া করে ফিরবে, নয়তো প্রচণ্ড মানসিক চাপে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হতে হবে। কেননা অনুসন্ধানে জানা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রবাসী মৃত্যুর কারণ, স্ট্রোক এবং হৃদরোগ।

শেয়ার করুন:
  • 5.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.8K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.