আস্তিকতা-নাস্তিকতার বিতর্কে নারীবাদের কী লাভ?

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

সম্প্রতি আস্তিকতা, নাস্তিকতা নিয়ে ফেসবুকে বেশ ঝড় বয়ে গেলো। এর কুশীলবেরা মূলতঃ নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত বলেই হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়েও এই বিতর্কের সাথে জড়িয়ে গেলো নারীবাদ এবং এর সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের যোগ্যতার প্রশ্ন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খাঁটি নাস্তিক হতে পারাটা নারীবাদী হওয়ার জন্য একটি পূর্বশর্ত। ইতিপূর্বে আমরা ধর্ষকের লিঙ্গের হেফাজতকারী কয়েকজনের খাঁটি নাস্তিকের দেখা পেয়েছি যদিও। এই বিতর্কে আমার আগ্রহ না থাকলেও, নারী অধিকার আন্দোলনের একজন অতি নগণ্য সমর্থক হিসেবে দুটি কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

নারীবাদ যেহেতু ধর্মের নানা গোঁড়ামী, পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন, নারীবাদী হতে গেলে কি তবে নাস্তিক হতে হবে? অথবা আস্তিকতা কি নারীবাদ বিরোধী? – এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো ‘না’।

আস্তিকতা বা নাস্তিকতার উপর নারীবাদের কোনপ্রকার নির্ভরতা বা বিরোধ, কোনটাই নাই। কিন্তু ধর্মের সাথে আছে। যদিও, আস্তিক্যবাদ, নাস্তিক্যবাদ বা ধর্ম এর কোনটারই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নারী পুরুষের সমানধিকারকে সমর্থন যোগানো নয়। একজন ব্যক্তি একাধারে আস্তিক ও নারীবাদী অথবা নাস্তিক ও পুরুষতান্ত্রিক হতে পারে। এর উল্টোটাও হতে পারে। শুধু ধর্ম টানলেই জট পাকিয়ে যাবে। পুরুষতন্ত্র একটি বৃহত্তম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা এবং ধর্ম সেই ব্যবস্থার একটি অনুষঙ্গ মাত্র।

বুঝিয়ে বলতে গেলে এই তিনটি নিয়েই অল্প করে বলতে হয়। শুরুতেই একটু ধর্মের কথা বলি। কোনো ধর্মই নারী পুরুষের সমান অধিকার স্বীকার করে না। নানা নিয়ম কানুন, রীতি নীতির মাধ্যমে ধর্ম নারী পুরুষে বিভেদ তৈরি করে রাখে। শুধু কি নারী পুরুষে ধর্ম বিভেদ তৈরি করে? না, ধর্ম এমনকি নারীতে-নারীতে, পুরুষে-পুরুষেও বিভেদ তৈরি করে।
তার মানে হলো, পৃথিবীতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের সাথে মানুষের যে বৈষম্য, বিভেদ, ঝগড়া, ফ্যাসাদ বিদ্যমান, তাতে ধর্মের প্রত্যক্ষ উৎসাহ ও সমর্থন আছে। আপনি আস্তিক বা নাস্তিক হয়ে নারীবাদী, মানবতাবাদী সবই হতে পারেন, আবার নাও হতে পারেন। পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় ৪০০০ এর বেশি ধর্মের অস্তিত্বই এর বড় প্রমাণ। আমি শুধু প্রধান ধর্মগুলোর একটু তথ্য বলার চেষ্টা করবো।

পৃথিবীর ৭.৬ বিলিয়ন জনসংখ্যার ২.৪২ বিলিয়ন মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাস করে। তার মধ্যে ১.২৮৫ বিলিয়ন ক্যাথলিক চার্চ, ৯০০ মিলিয়ন প্রোটেস্টেনিজম, ২৭০ মিলিয়ন ইস্টার্ন অর্থোডক্সি, ৮৬ মিলিয়ন ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্সি, ৩৫ মিলিয়ন রেস্টোরেশোনিজম এবং ননট্রিনিটারিয়ানিজম, ১৮ মিলিয়ন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যাথলিজম এবং ১ মিলিয়ন অন্যান্য মাইনর শাখায় বিভক্ত।

ইসলাম ধর্মে ১.৮ বিলিয়ন অনুসারীর মধ্যে প্রধান দুটো ভাগ হলো সুন্নী ও শিয়া। এর মধ্যে সুন্নী ধারার অনুসারী সর্বাধিক, প্রায় ১.৫ বিলিয়ন। শিয়া ধারার অনুসারী তুলনামূলকভাবে অনেক কম, প্রায় ১৭০ – ৩৪০ মিলিয়ন।

সুন্নী ধারা আবার নানা উপধারায় বিভক্ত – হানাফী, শাফেয়ী, মালেকি, হাম্বলী, ওহাবী বা সালাফি, আহলে হাদিস, জাহিরী। এগুলোরও আবার উপশাখা বিদ্যমান। শিয়াদের মধ্যে আছে ইশনা আশারিয়া বা জাফরিয়া উপশাখা, জাইদিয়া উপশাখা, ইসমাইলিয়া উপশাখা, আলাভি বা নুসাইরি বা আনসারি উপশাখা।

ইসলামের তৃতীয় বৃহত্তম শাখা আহমদিয়া (কাদিয়নী বলেও পরিচিত)। এরাও দুইভাগে বিভক্ত – আহমদিয়া আঞ্জুমান ইশাত ই ইসলাম উপশাখা ও জামাতে আহমদিয়া।

ইসলামের চতুর্থ বৃহত্তম শাখা ইবাদি। এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা সুফিবাদ। সুফিবাদেরও নানা ভাগ বিদ্যমান। এগুলো ছাড়াও ইসলামের আরো নানা শাখা উপশাখা বিদ্যমান – দ্রুজ, বাহাই, আলাভিয়া ইত্যাদি।

হিন্দুধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ১.১৫ বিলিয়ন। হিন্দুধর্মে বর্ণপ্রথার মাধ্যমে এর অনুসারীদের মাঝে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মমতে সকল মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী নয়। ব্রাহ্মণরা সবচেয়ে উঁচু জাত। এরা পুরোহিত। পূজা অর্চনা করে স্রষ্টার প্রত্যক্ষ্ সেবা করার সুযোগ পায়। এরপরেই ক্ষত্রিয়দের অবস্থান। ক্ষত্রিয়রা মূলতঃ যোদ্ধা। প্রাচীনকালে এদের কাজ ছিলো যুদ্ধ করে ব্রাহ্মণদের রক্ষা করা। এরপর আছে বৈশ্য, শূদ্র। এদের কাজ ছিলো ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের সেবা করা। এর মাধ্যমেই এদের পূণ্য লাভ হতো। এছাড়া পরবর্তীতে চাকুরিজীবী এক শ্রেণীর উদ্ভব হয় যারা কায়স্থ হিসেবে পরিচিত। এর বাইরে আছে নিম্নবর্ণের হিন্দু, যারা মূলতঃ অস্পৃশ্য। পুরোহিত দর্পনের বিধান অনুযায়ী জাতিভেদ প্রথা অনুসারে ব্রাহ্মণের দশ দিন, ক্ষত্রিয়ের বার দিন, বৈশ্যের পনের দিন, আর শূদ্রের ত্রিশ দিন অশৌচ থাকে।

বৌদ্ধধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ৪৮৮ মিলিয়ন। এর তিনটি প্রধান শাখা – মহাযান, থেরবাদ ও বজ্রযান। এর মাঝে মহাযান শাখাটি বৃহত্তম। বৌদ্ধ মতালম্বীদের ৫৬% মহাযান, ৩৮% থেরবাদ ও ৬% বজ্রযান শাখার অনুগামী।

আরো আছে ইহুদীরা। বর্তমান পৃথিবীতে ইহুদীদের সংখ্যা ১৪.৪১ মিলিয়ন। এরা মোটামুটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত – অর্থডক্স, কনজারভেটিভ, রিফর্ম, রিকন্সট্রাজশনিস্ট এবং সেকুলার হিউম্যাানিস্ট।

ধর্মগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঘৃণা, মারামারি, হানাহানি তো আছেই, এমনকি শাখা-উপশাখা গুলোর মধ্যেও পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষের শেষ নাই। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এতোদিন অহিংস মনে করা হলেও, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতার পর সেকথা বিশ্বাস করার আর সুযোগ নেই।

এখন আপনি এই ধর্মগুলোর যেকোনো একটাতে বিশ্বাস করেও আস্তিক হতে পারেন, আবার কোনটাকেই বিশ্বাস না করেও আস্তিক হতে পারেন। তার মানে, আপনি যদি শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন (ধর্মে নয়), তবেই আপনি আস্তিক।

এর বিপরীতে, কোন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসই হচ্ছে নাস্তিকতা। একজন আস্তিক যেমন চরম গোঁড়া ও সাম্প্রদায়িক হতে পারেন, একজন নাস্তিকও পারেন। বিশেষ করে নারী পুরুষের সমানাধিকার তথা মানুষে মানুষে সমানাধিকারকে বোঝার ক্ষমতা বা স্বীকার করার ক্ষেত্রে। আবার উভয়েই মুক্তমনা হতে পারেন। কিন্তু ধর্ম মেনে, অর্থাৎ ধর্মে নির্দেশিত রীতিনীতি বা বিধান সম্পূর্ণরূপে মেনে আপনি নারীবাদী বা মানববাদী কোনটাই হতে পারবেন না। তাহলে সেটা অনেকটা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো হবে।

এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা যে বৈষম্যমূলক মাইন্ডসেট ধারণ করি, তা কেবল ধর্মের কারণে গড়ে ওঠে না। মোদ্দা কথা হলো, ক্ষমতা কাঠামোয় আপনার অবস্থান কোথায় এবং সম্পদের বন্টনে আপনার ভাগ কতটুকু সেটাই মূল বিষয়। আপনি হয় এই কাঠামোকে ধারণ করবেন অথবা অস্বীকার করবেন। যদিও মানসিকভাবে এই কাঠামো থেকে মুক্ত মানুষ পাওয়া কঠিন।

সবশেষে বিনীত অনুরোধ, আপনি আস্তিক বা নাস্তিক হোন, কোন অসুবিধা নাই। শুধু আপনার সেই আস্তিকতা বা নাস্তিকতার সাথে নারীবাদকে জড়াবেন না দয়া করে। আস্তিক বা নাস্তিক হওয়া নারীবাদী হওয়ার পূর্বশর্ত নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 229
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    229
    Shares

লেখাটি ৯১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.