পুরুষতন্ত্রের চৌপায়া বহন করে নারী

জেসিকা ইরফান: যে নারীর জঠর ধরে যে পুরুষের জন্ম, সেই নারীকে কেমন করে শাসন করে পুরুষ? আমার একটা অভ্যাস আমি দ্রুত নিজের জীবন থেকে বের হয়ে নিজেকে দেখতে পাই তৃতীয় ব্যক্তির মতো। যখন থেকে দেখা শুরু করেছি তৃতীয় ব্যক্তির মতো, তখন থেকেই বুঝতে পারলাম আমরা যতো যাই কিছু বলিনা কেন এটা পুরুষশাসিত সমাজ ।
একটা মেয়ে সে যতই শিক্ষিত হোক, সে যখন স্বামীর সংসারে আসে তাকে সব কিছু ছেড়েই আসতে হয় । ছেড়ে আসতে হয় চিরচেনা বাবা মা ভাই বোন বাড়ি পরিবেশ থেকে নিয়ে নিজের আজন্মের অভ্যাস এমনকি রুচি পর্যন্ত । প্রায় সময় ছাড়তে হয় তার আজন্ম দেখা স্বপ্ন । পুরুষকে ছাড়তে হয় না কিছুই । বউ তার উপরি পাওয়া ।

jessicaএকটা সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নতুন কিছু মানুষের সাথে নতুন দায়িত্বে মানিয়ে নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয় । এটা একটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার অনেকটা নতুন জন্মের মতো ।

মানুষ সৃষ্টি করে সৃষ্টিকর্তা নারী ও পুরুষ করলেন । দুজনের গঠনেই কিন্তু পার্থক্য রেখে দিলেন জন্মসূত্রে । বেশি ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষকে দিলেন পেশীশক্তি, রিজিডনেস, লড়াকু মনোভাব । নারীকে দিলেন মাতৃত্বের অধিকার, মেধা, মায়া, মমতা ও ফ্লেক্সিবিলিটি ।

কোন একসময় মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই ছিল এই পৃথিবীতে । সভ্যতার ক্রমবিকাশে অনেকটা নারীর নির্বুদ্ধিতায় তা হাতছাড়া হল । তারপর থেকে নারী হয়ে উঠলো পুরুষের ইচ্ছে অনিচ্ছার পুতুল । অনেকটা যেমনে নাচাও তেমনি নাচি টাইপ । ১৮৫৭ সালে প্রথম কিছু নারী সমেবেত হওয়ার চেষ্টা চালালো তাদের অধিকার আদায়ের জন্য এবং বিশ্বের নজরে এলো। তারপরের অবস্থা যে তিমিরে সেই তিমিরেই বরং আরও খারাপের দিকে চলমান ।

কেন মেয়েরা তাদের সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত মাতৃত্বের ক্ষমতা / অধিকার ও মেধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেনি বা পারছে না?

খুব খেয়াল করে দেখবেন সমাজের প্রায় ৮০% – ৮৫% মেয়েদের অশান্তি অপমান কষ্টের কারণ আপাতদৃষ্টিতে পুরুষ হলেও পরোক্ষভাবে কাজ করে অন্য একজন নারী বা নারীরা।
কারো ঘর ভাঙছে? কেন? সেই পুরুষ পরকীয়ায় জড়িত। যার সাথে জড়িত সেই নারী কি জানে না সে আরেকজন নারীর স্বামীকে নিয়ে নষ্টামি করছে । জানে। জেনেই আরেক নারীর কষ্টের কারণ হয় পুরুষকে অস্ত্র করে।

এমনই কখনো পুরুষের মা, কখনো ভাবী, বোন, অফিসের কলিগ কখনো খালা চাচি মামি কেউ না কেউ আছেনই খুঁজে দেখুন নারীর কষ্টের নির্যাতনের পেছনে পুরুষকে উস্কানিদাতা। এতো ঈর্ষা, লোভ আর কু-শিক্ষা নিয়ে নারী কী করে স্বাধীন হবে?

তাহলে পুরুষ কি ধোয়া তুলসী পাতা?
না, নয়। সে তো মুখিয়ে আছে নষ্ট হওয়ার জন্য। তার শুধু ইন্ধন দরকার। একটা অজুহাত চাই নারীকে ডমিনেট করার জন্য। এরপর আছে পোশাক। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের বাঙালিদের মধ্যে প্রায় সময় প্রতিবাদ শোনা যায়, আমি কি আমার যেমন খুশি পোশাক পরতে পারবো না? যেমন খুশি চলতে, লিখতে, বলতে, পারবো না?

না, আপনি যেমন খুশি তেমন করে চলতে বলতে করতে পারেন না । আপনার সংস্কৃতির কিছু নর্ম আছে, আছে ভ্যালুজ , আছে শালীনতা বোধ । একদিকে নিজেকে বাঙালি বলবেন অন্যদিকে শরীরকে পুঁজি করে সেলিব্রিটি হতে চাইবেন তা তো হওয়ার নয় । শরীরকে পুঁজি করে কুরবানির হাটে ভালো দাম পাওয়া যায়, সার্কাসের ভালো পারফর্মার হওয়া যায়, কিন্তু স্বাধীনতা নয় । তাহলে তো পৃথিবীর তাবত প্রাণী নিজেদের কাপড় থেকে চামড়া পর্যন্ত খুলে স্বাধীন হয়ে যেত ।

যখনই আপনি কাপড় খুলে সুগন্ধি সাবানের মডেল হবেন কিংবা সামঞ্জস্যহীন পোশাক পরে ঝালমুড়ি হবেন, কিংবা জলেভাসা পদ্মামার্কা ফেইসবুকে ছবি দেবেন, তখনই মনে রাখবেন আপনার জীবনও সাবানের মতো বা ওয়ান টাইম ঝালমুড়ির মতো বা জলেভাসা পদ্ম হয়ে যাবে অন্যের কাছে । বিশেষ করে আপনার প্রতিপক্ষ পুরুষের কাছে তো বটেই । কিন্তু আপনি জানবেনও না এতটুকু আপনাকে দিয়ে করিয়ে আপনার স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এই সমাজ ।

নিজেকে আনফিট পোশাকে অযাচিত পণ্যের মডেল করা বন্ধ করুন ।
আপনি কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন কোথায় ঘুমাচ্ছেন , কখন আপনার বার্গার কি ফুসকা খেতে ইচ্ছে করছে কিংবা দাত ব্যথা . সব আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করছেন ! তা নিয়ে কেউ কথা বললে তখন তা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো স্বাধীনতা হরণ হয়ে যায় ! আরে আপনিই তো উস্কে দিচ্ছেন ।বস্ত্রহরণে যদি আপনার আপত্তি থাকে প্লিজ, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অন্তত ব্যাক্তিগত জীবনকে দূরে রাখুন । অন্যজনও তখন আপনার ব্যাক্তি জীবনে নাক গলানো কমিয়ে দিবে ।
পাবলিক আর প্রাইভেট বা প্রাইভেসি দুইটা শব্দের মানে কি আপনারা জানেন না ? নাকি মানেন না ? জানা ও মানার চেষ্টা করুন ।

তারপর আছে বিউটি পার্লার। আপনার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সব রং করা নিজস্বতা বলে যা ছিল সব আপনি বদলে ফেলেছেন এতো রং মেখে আপনি কার কাছে স্বাধীনতা চাইবেন ? আপনি তো আপনি নন , নকল, পালিশ করা রং মেখে সং সেজেছেন তা আপনিও যেমন জানেন আপনার প্রতিপক্ষ আরও বেশি জানে এবং সে এই চায় আপনি এই সব বাজে কাজে আপনার মেধা ও সময় বিসর্জন দিন । তাহলে আপনার আর অন্য কিছু ভাবার সময় থাকবে না ।

কখনো আপনার স্বামীকে বা বাবা’কে জিজ্ঞেস করেছেন কতো বেতন পান উনি? বা কিসের ব্যবসা করেন? আমি শতভাগ নিশ্চিত আপনি করেননি। করেননি, কারণ আপনার শিরদাঁড়া ভেঙ্গে গেছে , আপনি লোভে পরে গেছেন, ব্যক্তিত্ব হারিয়ে আপনিও অসৎ হয়ে গেছেন। আপনি ভয় পাচ্ছেন পাছে আপনার সুখ সচ্চলতায় বাধা পরে । কখনো প্রতিবাদ করেছেন ? তার উত্তরও না আমি জানি। মনে রাখবেন আজ সে অফিসে বা ব্যাবসায় অসততার আশ্রয় নিচ্ছে। আপনি সব জেনেও না জানার ভান করছেন। কিন্তু সে একদিন আপনার সাথেও অসততা করবে।

কারণ একবার যে অসৎ /চোর সবসময় সে অসৎ/চোর। সেদিন আপনি আর কথা বলার সুযোগ পাবেন না। কারো অসততা , অন্যায় জেনেও যে চুপ করে তা ভোগ করে সেও কিন্তু সমান মাপের অসৎ/চোর ও সমান পাপের ভাগীদার ।

আপনার দামি শাড়ি গহনা বাড়ি গাড়ি ভালো লাগতেই পারে । কখনো কি ভেবেছেন এগুলোর আড়ালে আপনি, আপনার আমিত্ব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে নাতো ! গহনা কিন্তু শৃঙ্খলের প্রতীক । আগের দিনে দাসদাসীদের যে লোহার বেড়ি দিয়ে বন্দী করে রাখত ওখান থেকেই আজকের মডার্ন গহনা । শাড়ি, বাড়ি, গাড়ি একটা প্রোমোশন, একটা রাজনৈতিক পদের লোভে নিজের আমিত্ব / ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেবেননা । একটু ভালো থাকার কিন্তু কোন লিমিট নেই । যদি দেন কেউ না কেউ তা জানবেই তখন আপনি আর নারী নন আপনি হয়ে যাবেন কারো হুকুমের অধীন । অধীনদের কোন স্বাধীনতা চাইবার অধিকার থাকে না । এরা মানুষের চোখে দাসী বা তারচেয়েও খারাপ কিছু ।

নিত্যনতুন শাড়ি গহনা পরে জবরজং হয়ে স্বামীর পাশে পাশে এই পার্টি থেকে ওই পার্টি মানে আপনি একজন পুরুষের ছায়া হলেন মাত্র নিজের স্বাধীন সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে । ছায়ার কোন স্বাধীনতা থাকে না । এই কাজে সমতা আনুন । আপনার সঙ্গীকে বলে দেখুন আপনার সাথে এমন জবরজং হয়ে আপনার বন্ধুর বাড়িতে যায় কিনা ? অবশ্যই আপনি স্বামীর সাথে বেড়াবেন কিন্তু নিজেকে দেখাতে নয়, ছায়া হয়ে হয় নিজের স্বকীয়তা নিয়ে ।

প্রত্যেক মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে গেলে তার পরিচয় তৈরি করে নিতে হয় । তার জন্য দাম যা লাগে লাগুক , বিনামুল্যে এই পৃথিবীতে কিছুই পাওয়া যায় না । দাম দিতে ভয় পেলে চলবে না । এর জন্য যদি চাকরি, প্রোমোশন, রাজনৈতিক পদ, এক্সট্রা সৌন্দর্য, মানুষের সাময়িক বাহ বাহ, ইশ ইশ হারাতে হয় হারান, কিন্তু নিজ নিজ বিশ্বাসের পাশে পিস্তল হাতে দাড়িয়ে বলুন, আমি যা আমি তা-ই । এ ভাবে ও শুধু মাত্র আমার মেধার জোরে যদি আমাকে উপযুক্ত মনে করো তাহলে আমি আছি । না হলে বাদাম বিক্রি করে ভাত খাব তবুও নিজেকে বিক্রি করবো না। পতিতা হবো না। আমি বিশ্বাস করি, কেউ কাউকে নষ্ট করতে পারে না যদি তার মধ্যে নষ্টামি না থাকে ।

আপনাকে প্রতিটা পদক্ষেপে আপনার চারপাশকে বোঝাতে হবে আপনি যা আপনি তা-ই । সে আপনি গৃহিণী হন কিংবা আরনিং উইমেন । আপনি কারো দাসী নন । আপনি মানুষ ।তবেই কেবল পুরুষ তন্ত্রের চৌপায়া বহনের ভার মুক্ত হয়ে নিজের স্বাধীনতা ফিরে পাবেন ।

স্বাধীনতা এমন একটা জিনিষ এটা কেউ কাউকে দিতে পারে না।
এটা অনেক বেশি মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.