যখন মায়ের ভাবনা জুড়ে তার সন্তান

তুলি সঙ্গীতা: কথায় বলে না, ‘a person is never alone anymore after being a mother, her kids accompany her even in her thoughts’। আমি মা হবার পর থেকে বুঝলাম কথাটা কতোটা সত্য। সারাক্ষণই ভাবি ঠিক কীভাবে কথা বললে ও বুঝবে, আমি ওকে ঠিক কী বোঝাতে চাইছি, কীভাবে বোঝালে ও বুঝবে ওর ঠিক কী করা উচিত জীবনে চলার পথে, আর ঠিক কীভাবে ওকে গাইড করলে ও একজন ‘মানুষ’ হয়ে গড়ে উঠবে!

13820457_10209033364465783_567364642_nঠিক কীভাবে বুঝালে ও একটা আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে? ঠিক কীভাবে কথা বললে ও একজন ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে? কখনও আরেকজনকে আঘাত করে কথা বলবে না!   
নিজের শৈশবের সাথে মিলাই, নিজের খারাপ-ভালো অভিজ্ঞতা দিয়ে ওর জন্যে গাইড লাইন তৈরি করি, প্রায় প্রতিদিন। যদিও এসব কিছুই যে কাজে আসবে তা না, তা-ও ফিটনেস থেকে ভদ্রতা, আর্ট এন ক্রাফট থেকে মানবিকতা, নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে রোজ আওড়াই নানা রকম ভাবনা।

কখনো ভাবি ওকে কার্বো হাইড্রেট কম খাওয়াবো, তাই নতুন নতুন রেসিপি আবিষ্কার করি, কখনো ভাবি, ছোটবেলা থেকে এক্সারসাইজ একদম ওর রোজকার অভ্যাসে পরিণত করাবো, আর নিজেই ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে করতে শুরু করি এক্সারসাইজ, কখনো ভাবি ওকে বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে আর নিয়ে আসি ছবিওয়ালা গণ্ডাখানেক বই, কখনো ভাবি ক্যারাটে শিখাবো ওকে, আরো কতকিছু!

কিন্তু একটা জিনিস মাঝে মাঝে ভেবে শঙ্কিত হই, যেটা আগেও ছিল, এখনও আছে এবং আরো ভয়াবহ হয়েছে;
Bullying Girls/ Public shaming of girls সেটার কোন proper কারণ থাকুক বা না থাকুক। internet এর সহজলভ্যতার যুগে যা রূপ নিয়েছে cyber bullying এ! এমনকি এই নিয়ে সিনেমা, সিরিয়ালও তৈরি হয়েছে মানুষকে সচেতন করার জন্যে।
ধরা যাক আমার কথা, আমি ভীষণ আমুদে ছিলাম আর আছিও, প্রচুর বন্ধু ছিল আমার সমবয়সী ছোট এবং বড়, ছেলেমেয়ে উভয়ই। এদের যাতায়াত ছিল আমাদের বাসায় আর আমার মা-বাবা তাদের চিনতো এবং জানতোও।

কিন্তু আশেপাশের মানুষ, দূরের আত্মীয় স্বজনদের খুবই কৌতূহল ছিল ছেলেবন্ধু/বড় ভাইয়াদের নিয়ে। অনেকেই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করতো আমার চরিত্র নিয়ে, জানি না তাদের নিজেদের আয়নায় দেখে তারা এমন ভাবতেন, নাকি  একটা মেয়েকে লতানো, মাথা নোয়ানো মেয়ে হিসেবে না দেখে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে অসুবিধে হতো বলে এমন করতেন!

তাদের নিয়ে আমি ভাবতে চাইনা, আমি ভাবতে চাই ঠিক কীভাবে আমার মেয়ে বড় হবার বেলায় তাকে রক্ষা করবো এসব থেকে তা নিয়ে। ওইসব ভাবনা যে একটা মেয়েকে কতটা কুকড়ে দেয় সেটা আমি জানি, আমার মেডিকেল কলেজ লাইফে ঐসব অভিজ্ঞতার দরুণ খুব বেশি বন্ধু ছিল না, অথচ গ্র্যাজুয়েশন লাইফে কিন্তু অমন হবার কথা নয়।
যারা না জেনে শুনে অনুমান নির্ভর বাজে কথা বলতেন এবং গুজব ছড়ানোর মত করে যার-তার সাথে সমালোচনা করতেন, দুঃখজনকভাবে তারা বেশিরভাগই মেয়ে ছিলেন !

আচ্ছা আমরা কি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে এখন পারি কিছু জিনিস বদলানোর উদ্যোগ নিতে? এই যেমন-
১) সন্তানকে ‘ছেলেমেয়ে’ না শিখিয়ে সবাই ‘মানুষ’ শেখাতে পারি কি?
২) সবার নিজের জীবন নিয়ে নিজস্ব চিন্তা আছে, সেটা নিয়ে অনধিকার চর্চা করার অধিকার আমাদের কারোর নেই, এই কথাটা শেখাতে পারি কি?
৩) চঞ্চল মেয়ে বা ছেলে হলেই সে ‘ক্যারেক্টার লেস’ বা ‘বখাটে ছেলে’ হবে এটা মিথ্যা ভাবতে পারি কি? আর আমরা যখন এসব আলোচনা করবো না, ওরাও শিখবে না।
৪) কোনো মেয়েকে তার চরিত্র নিয়ে বা কোনো ছেলেকে নিয়ে ‘বখাটেপানা’ নিয়ে অন্য কেউ কথা বলতে এলে তাকে নিরুতসাহিত করতে পারি।
৫) নিজের সন্তানকে ভাল-মন্দ শিক্ষা দেই কিন্তু অন্যরা লজ্জা দিতে এলে যেন তার পাশে দাঁড়াতে পারি এবং তার ভুল কাজ যা অন্যের ক্ষতির উপলক্ষ্য তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তখন যেন কঠোর হতে পারি।
৬) পিরিয়ড একটা নরমাল শারীরিক ব্যাপার যা মা-বোন-বান্ধবীর হবে এবং এসময়ে তাকে লজ্জিত না করে তার সহায়তা করতে হবে এটা নিজের ছেলেকে শেখাতে পারি ৭/৮ বছর থেকেই, কারণ এর বেশি দেরি করলে সমাজ তাকে নিজের মা-বোন সম্পর্কেও বাজে কথা শেখাবে ।
৭) পিরিওড হওয়া পাপ না যে এটা হলে দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন চাওয়া যাবে না বা বাবা-ভাইয়ের সামনে লজ্জায় বলা যাবে না , রোজা বা পূজার উপবাসে না খেয়ে নিজের শরীরকে কষ্ট দেয়াটা বোকামি, সেটা মেয়েদের শেখাতে পারি।
৮) শাড়ি/শার্ট/প্যান্ট/স্কার্ট যে কাপড়ের টুকরা যা দিয়ে মানুষ শীত-গ্রীষ্ম থেকে বাঁচতে গায়ে পরে, সেটার সাথে শালীনতার খুব বেশি সম্পর্ক নেই, বরং শালীনতা সম্পর্ক মানুষের কাজের সাথে; সেটা বরং সন্তানকে শেখাই এবং বুঝিয়ে বলি যে হাতা-কাটা/লম্বা হাতা জামা বা স্যুট প্যান্ট/শর্টস গেঞ্জি মানুষ আবহাওয়ার তারতম্য আর কাজের সুবিধে-অসুবিধের কথা ভেবে পরে, তার সাথে চরিত্রের সম্পর্ক নেই।
৯) নিজের মা-বোনকে বা বাবা-ভাইকে নিয়ে যেকথা হলে খারাপ লাগবে তা কোন অনুমান নির্ভর কারণে অন্যকে কখনই না বলি আর সন্তাকেও তাই শেখাতে পারি আমরা ।
১০) আর এখনকার সময়ের golden rule , গাছ-জীব-মানুষসহ স্রষ্টার সব সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শনই ধর্ম, সবার আগে মানবতার ধর্মই যেন শেখাই আমরা সন্তানকে; আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত আমাদেরই হাতে,
‘Make It A Better Place
For You And For Me
And The Entire Human Race ‘

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.