তোমার দেখানো পথে হেঁটে যাই আমরা

উইমেন চ্যাপ্টার: আজ ২০ জুন, বাঙালী নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত কবি বেগম সুফিয়া কামালের ১০৬ তম জন্মদিন। উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি এই সাহসিকার প্রতি।

তখনকার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে শত বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি যে আলোকবর্তিকা ধরেছিলেন উঁচু করে, তারই আলোয় আজও আমরা পা ফেলে চলেছি ধীরে ধীরে। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি মেয়েরা। এ তো তাঁরই ধারাবাহিকতা।

তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯১১ সালের ২০ জুন আর মৃত্যু ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর।

Sufia Kamalবেগম সুফিয়া কামাল বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও মা সাবেরা বেগমের কাছেই বাংলা পড়তে শেখেন এই মহিয়সী নারী।

ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখা পান। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিলো। সুফিয়া কামালের শিশু মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলো বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ্।

মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ বেগম রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চা চলতে থাকে। ১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে কবি সুফিয়া কামালের কাব্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ১৯৩৭ সালে তাঁর গল্পের সংকলন ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’র মুখবন্ধ লিখেন কাজী নজরুল ইসলাম। বইটি বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়ায় যাদের মাঝে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা হতে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি দেশবিভাগের আগে ‘বেগম’ পত্রিকাটির সম্পাদনা করেন।

কবি সুফিয়া কামাল তাঁর সাহিত্য চর্চ্চার পাশাপাশি নারীমুক্তি, মানবমুক্তি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে গেছেন। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনেও যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচি কাচার মেলার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছেন। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭০ সালে বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলনের উত্তাল দিনে সমমনাদের নিয়ে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর রচিত সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে কবিতা, গল্প ও ভ্রমণ কাহিনী। কাব্যগ্রন্থ সমূহ -সাঁঝের মায়া (১৯৩৮)-মায়া কাজল (১৯৫১)-মন ও জীবন (১৯৫৭)- শান্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮)-উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪) -দিওয়ান (১৯৬৬)-মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)-। তাঁর রচিত ‘একাত্তুরের ডায়েরি’ একাত্তরে বাঙালী জীবনের অকথিত চিত্র তুলে ধরেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও সম অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তিনিই প্রথম বাঙালী নারী যাঁকে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। (সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.