সহনশীল মানুষ গড়তে দীক্ষা নয়, শিক্ষা চাই

জেসমিন চৌধুরী: সেদিন একজন উপদেশ চাইলেন, ‘চিল্ড্রেন ক্লাবের বাচ্চাদের ডেভেলপমেন্টের জন্য কি কি করা যেতে পারে?’ আজকাল সহনশীলতার বাইরে বাচ্চাদের জন্য আর কোন ডেভেলপমেন্টের কথা আমার মাথায় আসেনা। তাকে সেকথাই বললাম, বাচ্চাদেরকে সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। নিজের মতো বা নিজের চেয়ে আলাদা, সবার প্রতিই শ্রদ্ধাশীল হবার শিক্ষা দিতে হবে।

Rel Edu 4কিভাবে শেখাবো?, তিনি জানতে চাইলেন এবং এখানেই আমি নিরব হয়ে গেলাম, কারণ আমি জানি এসব বলে শেখানোর বিষয় নয় বরং শিশুর মানসিক বিকাশের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিৎ যা বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব।

আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব এই মানসিক বিকাশের কাজটা তাহলে পশ্চিমা দেশগুলোতে কিভাবে ঘটছে?

অন্যসব দেশের কথা আমার জানা নেই, কিন্তু ইউকে’তে স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সহনশীলতার শিক্ষা, এবং তা করা হচ্ছে ধর্মশিক্ষার মাধ্যমেই। পাঁচ বছর বয়স থেকে স্কুলে বাচ্চাদেরকে ‘আর ই’ অর্থাৎ  রিলিজিয়াস এডুকেশন নামে একটি বিষয় পড়ানো হয়। মা-বাবা চাইলে স্কুলের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজের বাচ্চাকে এই বিষয়টি পড়তে না দিতে পারেন, কিন্তু আইনত ধর্মশিক্ষাকে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করতে প্রতিটি স্কুল বাধ্য।

পৃথিবীর নানান দেশ থেকে এসে জড়ো হওয়া নানান রঙের মানুষ নিয়ে গড়ে উঠা রংধনু এই দেশের স্কুল্গুলিতে রয়েছে কয়েকশ’ ভিন্ন ভাষার শিশু-কিশোর আর সেই অনুযায়ী ধর্মের সংখ্যাও খুব কম নয়। এইসব নানা জাতের আর ধর্মের বাচ্চাদেরকে এরা ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছে কীভাবে?

আমার মেয়ে দেখলাম একবার তার ‘আর ই’ প্রজেক্ট করছে বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থানের উপর। এই কাজটা করতে গিয়ে পৃথিবীর সব উল্লেখযোগ্য ধর্ম নিয়ে তাকে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে, সব ধর্মাবলম্বী মানুষদের চিন্তা ভাবনা, দৃষ্টিভংগি এবং ধর্মীয় অনুভূতির কথা তাকে ভাবতে হয়েছে।

Rel Edu 3অন্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখার এর চেয়ে ভাল উপায় আমার জানা নেই। যেকোনো কিছুকে শ্রদ্ধা করার প্রথম ধাপ হলো তার অস্তিত্ব জানা এবং মেনে নেয়া, অতঃপর তার সম্পর্কে আরো জানার এবং তাকে বুঝবার চেষ্টা করা।  

এদেশের ধর্মশিক্ষার অ্যাপ্রোচকে আমি নিশ্ছিদ্র বলবো না, কারণ এখানেও  ধর্মশিক্ষা ক্লাসে ক্রিশ্চিয়ানিটির আলোচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা কিছুটা হলেও একপেশে, কিন্তু তবু একই সাথে বাচ্চারা সুযোগ পায় আরো নানান রকম চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচিত হবার, এবং নিজের বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করে সত্য-মিথ্যা নিজের মতো করে যাচাই করবার।

শুধু ধর্ম বিশ্বাস নয়, এসব ক্লাসে পরম শ্রদ্ধার সাথে আলোচনা করা হয় নাস্তিকতাবাদ নিয়েও। বাচ্চারা একটা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, নাস্তিকতাবাদ এবং নৈতিকতা ছাড়াও সৃষ্টির আদিম রহস্য নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করবার সুযোগ পায়।

এ নিয়ে একটি অনলাইন বিতর্ক পড়ছিলাম। একজন নাস্তিক ভদ্রলোক স্কুলে ধর্মশিক্ষা পড়ানোর স্বপক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি আমার ধর্মশিক্ষা ক্লাসে বিগ ব্যাংগ থিয়োরি এবং বিবর্তনবাদ সম্পর্কে বায়োলজি ক্লাসের চেয়েও বেশি শিখেছি।‘

আরেকজন বলেছেন, ‘আমি চাই স্কুলে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হোক, যাতে করে বাচ্চারা কী বিশ্বাস করবে, বা করবে না এ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শিখতে পারে, নিজের চারপাশের পৃথিবীকে আরো ভালোভাবে চিনতে পারে।‘

এদেশে দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পেশায় থাকার সুবাদে আমারও কিছু চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছে যখন আমি ছোটছোট বাচ্চাদেরকে চোখ বড়বড় করে গভীর মনোযোগের সাথে বিভিন্ন রকম দৃষ্টিভংগিকে  বুঝবার চেষ্টা করতে দেখেছি।

Religious edu 1আমি স্কুলে থাকতে আমাদের জন্যেও ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। মুসলমান আর হিন্দু ছাত্ররা আলাদা আলাদা ক্লাসরুমে নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে শিখতাম। হাতে গোনা দুই চারজন বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান ছাত্রের জন্য কী ব্যবস্থা ছিল তা আমার ঠিক মনে নেই।  আমার ধর্মশিক্ষা ক্লাসে আমি ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহ এবং কোরান ও হাদিসের বাণী শিখেছি, আর টিফিন টাইমে লুকিয়ে হিন্দু বন্ধুদের ধর্মশিক্ষা বইতে রাম, লক্ষণ আর সীতার কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।

বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মশিক্ষার কী অবস্থা জানি না। কিছুদিন আগে আমার পরিচিত এক প্রাইভেট স্কুল শিক্ষিকা জানালেন, তাদের স্কুলে ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদের জন্য একটা সাধারণ জ্ঞানের বইতে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তথ্য দেওয়া আছে, কিন্তু এই বই নিয়ে মা-বাবাদের মধ্যে প্রচুর আপত্তি রয়েছে, বাচ্চাদের অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে জানার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না তারা।

মা-বাবা স্বভাবতই চান সন্তান তার নিজের আদলে গড়ে উঠুক, তাই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাপ-দাদার ধর্মই শেখান তাকে। হয়তো নৈতিকতা শেখানোর একটা সহজ পন্থা ধর্ম, কিন্তু তাই বলে শিশুর নরম কাদা কাদা মনে নিশ্চিতভাবে নিজের পছন্দ অনুযায়ী শুধুমাত্র একটা বিশ্বাসের ছাপ এঁকে দেয়া এবং তা  যেন পরবর্তিতে মুছে যেতে না পারে তার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা নেওয়াটা কি একধরনের অসহনশীলতা নয়, অন্য সব বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা নয়?

একে ধর্ম শিক্ষা নয়, বরং ধর্মে দীক্ষা বলা যেতে পারে।

শিশুরা স্বভাবতই কৌতুহলী, নির্দিষ্ট কোন বিশ্বাসের দেয়াল তুলে তাদের কৌতুহলের জানালাগুলো বন্ধ করে দিলে তারা কিভাবে মুক্ত চিন্তা শিখবে? আর মুক্তচিন্তা না শিখলে কিভাবে সহনশীল হয়ে গড়ে উঠবে?

আমি নতুন কোন কথা বলছি না, সুন্দর সহনশীল মানুষ গড়ার পরীক্ষিত পদ্ধতির কথা বলছি। বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস এবং নাস্তিকতা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে এমনভাবে যেন তাদের উপরে কিছু চাপিয়ে দেওয়া না হয়, যেন তারা মুক্তভাবে এসব নিয়ে ভাববার সুযোগ পায়।

নানান মত আর পথের সাথে সুন্দরভাবে পরিচিত হয়ে উঠলে তারা বড় হয়ে নিজেদের পছন্দের পথ আর মত যেমন বেছে নেবে, তেমনি শ্রদ্ধা করতে শিখবে অন্যান্য মত আর পথকেও।

আমার মতে বাচ্চাদেরকে মুক্তমনা করে গড়ে তুলতে ধর্মশিক্ষার বিকল্প নেই যদি না আমরা ধর্মশিক্ষাকে বিশেষ বিশেষ ধর্মে দীক্ষার সাথে গুলিয়ে ফেলি।

জেসমিন চৌধুরী

Freelance ESOL teacher and translator

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.