প্রবাস জীবনের সুখ-দু:খ

Aparna 2নাদিরা সুলতানা নদী: যারা নিজ দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমায় তাদের প্রত্যেকের পিছনে থাকে একটা গল্প, অবশ্যই সব যে দুঃখের গল্প তা নয়। প্রবাসীদের নিয়ে আছে অনেক কল্পনা/জল্পনা। বাংলাদেশে যখন ছিলাম, বলাই বাহুল্য নিজেরও সীমাহীন ভুল ধারণা ছিল উন্নত বিশ্বে থাকা প্রবাসীদের নিয়ে (অন্তত টাকা-পয়সা নিয়ে)। নিজে এই বিভুঁইয়ে নেমে বিভিন্ন সময় প্রচণ্ড বৈরী সময়ের মুখোমুখি হয়েছি, ধীরে ধীরে জেনেছি জীবনের আরো অনেক কঠিনতম সত্য।

জেনেছি মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়েনে থাকা যে ছেলেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত মা-বাবা আগলে রেখেছে পারিবারিক আবহে, মা-বড় বোন আদর করে হয়তো কোনদিন এক গ্লাস পানিও ঢেলে খেতে দেয়নি, ঘুমুতে যাওয়ার আগে টানাতে হয়নি কোনদিন মশারীটাও.. সেই ছেলেটিকে কাজ করে পড়ালেখা করতে হয়, নিজের খাবার নিজেকেই জোগাড় করতে হয়।

যে ছেলেটি অল্প কিছু টাকা নিয়ে চলে আসে এই পরবাসে সেই ছেলেটির অনেক সময় কাজের অভাবে হয়তো না খেয়েও থাকতে হয় দুই/এক বেলা। কারো কারো হয়তো সময় মত একটা কাজও জোগাড় করা হয়ে উঠে না, সে যে এই কথা স্বদেশে নিজের পরিবারকে জানাবে তারও উপায় থাকে না অনেক সময়।

যে মেয়েটিকে পরিবার তেমন কোন কাজই শেখায়নি, সেই মেয়ে বাইরে এসে শুধু কাজের প্রয়োজনে যখন কোন ক্লিনিং জব করে স্বাভাবিকভাবেই তার উপর যে মানসিক চাপ যায় শুধু একটা বাংলাদেশী মেয়ে হিসেবে, সেটা হয়তো তার পরিবারের কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব হবে না বা সেই মেয়েটির পক্ষে প্রকাশ করাও হয়ে উঠে না কোনদিন। এটা একটা কাজ, এই উপলব্ধি হতে কারো কারো লেগে যায় অর্ধ যুগ।

এখানে ভালো লাগা বলতে কঠোর পরিশ্রমের দিন শেষে ”রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা স্বস্তিময় আরাম আয়েশ” ”’জীবন থেকে কোনো সময় অযথাই নষ্ট না হয়ে যাওয়া” ”সপ্তাহান্তে প্রবাসী বন্ধুদের সাথে খাওয়া-দাওয়া-আড্ডা-ধুম” ”জোর করে আনন্দ, অনেকটা ফুল ছাড়াই বসন্ত এমন করে ভাবার চেষ্টা”!!!

তবে ব্যক্তি বিশেষে প্রবাসীদের না বলা কষ্টের তালিকাটা একটু বেশীই লম্বা, অনেক বেশী পরিশ্রম, সময়ের সাথে ছুটে চলতে চলতে ক্লান্তি, দেশে থাকা পরিবারের কাছে প্রতি বছর যেতে না পারা, সময় মত টাকা না পাঠাতে পারা, গাড়ি হলে বাড়ির চিন্তা, বাড়ি হলে ঘুরাঘুরির চিন্তা, একের পর এক লোন পরিশোধের চাপ, খুব কষ্টের কোন মুহূর্তেও কাছের কোন প্রিয় মুখ কাছে না থাকা, দেশে সময় মতো ফোন করতে না পারা, কখনও খুব কাছের মানুষ হারানোর খবর পেয়েও কিছু করতে না পারা, চারপাশে থাকা অনেকেই পছন্দ না হলেও চেপে যাওয়া, সময়ে খুব কোমল অনুভুতিগুলোই ভোঁতা হয়ে যাওয়া বা এর মাঝেই হয়তো হঠাৎ আবিষ্কার করা কাছের মানুষেরা ভুল বুঝে বসে আছে দেশে!

ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করতে চাই খুব প্রিয় আর কাছের মানুষেরা যোগাযোগ নিয়মিত না হলেও ভুল বুঝবে না হয়তো, ঠিক বুঝে নেবে আপনার আমার সীমাবদ্ধতাগুলো। তবে বাংলাদেশে যাদের জীবন অনেকটাই কাঙ্খিত, যেসব ছেলেরা মা-বাবাকে এক সংসারে রাখার মত অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছেন, তারা যদি সবটুকু আবেগ মায়া-মমতা আর যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে তাদের বয়স্ক মা-বাবাদের জীবনকে একটু স্বস্তি বা সুখ দিতে পারেন, সেটাই হয়ত দূরে থাকা অন্য দুর্ভাগা ভাই-বোনের জন্যে এক টুকরো সুখের সংজ্ঞা হতে পারে।

বাংলাদেশের মেয়েদের তো বাস্তবতা মা-বাবাকে ছেড়ে অন্য অপরিচিত কিছু মানুষকে ঘিরেই নুতন ভালোবাসার পৃথিবী গড়ে তোলা। সেই মেয়েরা যদি নতুন সংসারের নতুন মা-বাবা’র প্রতি সবটুকু সদয় থাকার ব্যাপারে সবটুকু আন্তরিক হয়ে থাকার চেষ্টা করে তাহলেও হয়তো জীবনের শেষ সময়ে থাকা বাংলাদেশের সব মা-বাবা’রা ভালো থাকতো, আর জীবনের প্রয়োজনে দেশের বাইরে থাকা জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্যুদস্ত কিছু মানুষ একটু ভরসা নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারতো; আরো একটু বেশি উৎসাহ নিয়ে আরো একটু বেশী কষ্ট করে হলেও দেশে থাকা পরিবারের জন্যে অন্তত আর্থিক সচ্ছলতার জন্যে কাজ করতে পারে নির্ভার হয়ে।

বাংলাদেশে থাকা সবাইকে অনুরোধ, কাছে থাকা মা-বাবা’কে যেভাবেই হোক কিভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হয়, সজীব আর সুন্দর করে ভাবতে হয়, জীবনকে শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখতে হয় এবং ভিতর থেকে সব পরিস্থিতিতে শক্ত থেকে নিজের পায়ে চলতে পারার মত জীবনের আশির্বাদ’টা ধরে রাখা উচিত, সেটা একটু ধৈর্য্যের সাথে বুঝিয়ে দিন তাঁদেরকে, এটাই তাঁদের জন্যে অনেক বড় একটা পাওয়া হবে।

(দূরে থাকা মা-বাবা’র জন্যে ভীষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে আজ হৃদয়ে, কিচ্ছু করতে পারলাম না তাদের জন্যে, কিচ্ছু না.. সেই রক্ত দিয়েই এই লেখা)!!!

নাদিরা সুলতানা নদী
এডিলেড, সাউথ অস্ট্রেলিয়া

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.