তুমি পালিয়েই বাঁচো জাহানারা!

Rape victসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: ‘তুমি তোমার সন্তানদের নিয়ে অন্য কোন এলাকায় চলে যাও। না হলে তুমি বাঁচতে পারবে না। কার কাছে তুমি বিচার চাও? কোথাও তুমি ন্যায় বিচার পাবে না। এ সমাজ, এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা তোমাকে তো হত্যা করবে, তোমার সন্তানদেরও বাঁচতে দেবে না। এমন একজন মানুষ নেই যে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে তোমার কষ্ট বুঝবে। তুমি চলে যাও, জাহানারা! চলে যাও যত দ্রুত পারো। এ এলাকা ছেড়ে চলে যাও অন্য কোথাও’- আজ এভাবে কথাগুলো বলার পর নিজের অপারগতার জন্য নিজে যতটা অনুতপ্ত হয়েছি, কোন মিথ্যা আশ্বাস না দিয়ে একটা সত্য উচ্চারণ করার জন্য ততটা স্বস্তি বোধ করলাম।

‘তুমি নারী! তুমি কিসের বিচার চাও? তুমি গরীব, ভূমিহীন, থাকো সরকারী খাস জমিতে। তোমার স্বামীও তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে! তুমি তোমার জন্মস্থান ছেড়ে, ছেড়ে যাওয়া স্বামীর এলাকায় কেন পড়ে আছ? তুমি ভালো মেয়ে মানুষ হতেই পার না। তাই তোমাকে নির্যাতন করা যায়, তোমাকে মন চাইলেই উচ্ছেদ করা যায়, তোমার সামান্য উর্পাজন কেড়ে নেয়া যায়, তোমাকে ধর্ষণ করা যায়, তোমাকে আধমরা অবস্থায় বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেয়া যায়। জ্ঞান ফেরার সাথে হাসপাতালে গিয়েও তোমাকে হুমকি দেয়া যায়। তোমার পৌরসভার পরিচ্ছন্নতার কাজটিও কেড়ে নেয়া যায়।’

জাহানারা নির্বাক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। হয়তো তার কান প্রথমে আমার কথাগুলো বিশ্বাস করতে রাজী ছিল না। এমন কথা সারাজীবন শুনে শুনে যদিও সে অভ্যস্ত। তবুও আমিও যে একই সুরে একই বীণ বাজাবো এমনভাবে শুনতে সে প্রস্তুত ছিল না। আর সবাই যাই বলুক আমি অন্তত এভাবে বলতে পারি না। এই বিশ্বাস যেমন জাহানারার ছিল, আমার নিজেরও কি নিজের প্রতি এমন বিশ্বাস ছিল না? আমি কি এভাবে বলতে জানি? হ্যাঁ, আমিও সত্য মানতে শুরু করেছি। এই সত্য মানা মানে যদিও শুধু হেরে যাওয়া। তবু হেরে গিয়েও বাঁচার স্বস্তি থাকবে। মেনে নেয়ার স্বস্তি।

জাহানারা একটা বাক্যই বলার সুযোগ পেয়েছিল আজ।

‘পৌরসভার ঝাড়ুদারের চাকরিটাও কেড়ে নিল, আপা!’ সে হয়তো আশা করেছিল আমি তাকে বলব, ‘পৌর মেয়রকে বলে তোমার চাকরিটা পুনর্বহালের ব্যবস্থা করে দেব।’ আমি বলিনি।

আমি তাকে এমন কথা দিলে যে রাখতে পারব না। আমি জানি, ক্ষমতাসীনরা পারলে জাহানার মাথার উপরের আকাশটাও কেড়ে নেবে। তার নিঃশ্বাসের বাতাস থেকে অক্সিজেন সরিয়ে ফেলবে! এই ক্ষমতাসীনরা যে তার সকল পথে প্রাচীর তুলে রেখেছে। যে পথেই যাওয়ার চেষ্টা করুক সে কেন গন্তব্য তার মিথ্যাতে গিয়ে ঠেকবে।

কি হয়েছিল জাহানারার? কেনই বা সে কারো টার্গেটে! জাহানারা এক চল্লিশোর্ধ নারীর নাম।

গত ২১ নভেম্বর রাতটি ছিল জাহানারার জীবনে নারকীয় একটি রাত। ২২ নভেম্বর ভোরে জাহানারাকে বস্তাবন্দি মুমুর্ষু অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। রাতে পিঠা বিক্রি করে ফেরার পথে প্রতিবেশী হুজুর আলীসহ চারজন তাকে অপহরণ করে একটা পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে নিয়ে ধর্ষণ করে। এখান্রেেই ক্ষান্ত হয়নি, জাহানারার যৌনাঙ্গে সিগারেটের প্যাকেটসহ আবর্জনা ঢুকিয়ে দিয়েছিল উল্লাস করতে করতে।  হাসপাতালে ভর্তির রেজিস্ট্রারে রেপ অ্যাসাল্ট লেখাও হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে দুদিন পর তার জ্ঞান ফিরে এলে অভিযুক্তরা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় হাসপাতালে গিয়ে ঘটনা প্রকাশ না করার হুমকি দিয়ে আসে। আট দিন পর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে জাহানারা ঘটনার বিচার দাবি করে থানায় গেলে থানা মামলা নিতে রাজী হয়নি। যে পুলিশ তাকে বস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে তারাও তাকে চিনতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তিতে প্রায় এক মাস পর মামলা  নিলেও অভিযোগে পুলিশ নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে জাহানারার সই নেয়। সে মামলায় শুধু আসামীদের বিরুদ্ধে পিঠা বিক্রির টাকা কেড়ে নিয়ে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ করা হয়।

এদিকে প্রভাবশালীরা জাহানারাকে ডেকে নিয়ে তার সামনে আসামীদের চড় থাপ্পর মারে। পরে ৫০০ শ টাকা জরিমানা করে জাহানারাকে দিয়ে মামলা তুলে নিতে বলে। জাহানারা এতে রাজি না হলে সেও তার সন্তানদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পুলিশ তাকে মীমাংসা করার চাপ দেয়। হাসপাতালের ফাইনাল রিপোর্টেও শুধু অ্যাসল্ট শব্দটি লেখা হয়েছে। এর মধ্যে তার পৌরসভার পরিচ্ছন্নতার চাকরিটা চলে যায় প্রভাবশালীদের চাপে। নারী সংগঠনগুলোও প্রতিপক্ষ ক্ষমতাশালীদের ছত্রছায়ার বলে জাহানারার পক্ষে দাঁড়াতে আসেনি।

সামাজিকভাবে জাহানারা এখন এক অশুভ প্রেতাত্মা! তাকে দেখলেই সবাই যেন মুখ ফিরে দাঁড়ায়।

জাহানারা চার সন্তানের মা। বড় ছেলে বিয়ে করে কাজের সূত্রে বউ নিয়ে রংপুরে থাকে। মেজ ছেলে ও মেয়েটি শিশু পরিবারে থাকে। মায়ের সাথে থাকে শুধু ছোট ছেলেটি।

জাহানারা পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন।  পাঁচ বছর ধরে থাকেন গণপূর্তের খাস জমিতে। বিগত সরকারের নারী এমপি নাজমীন  নাজলীর বাসায় কাজের সূত্র ধরে তিনি পৌর মেয়রকে বলে জাহানারাকে এই জমিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পরে পাশের জমিতে হুজুর আলী নামে এক ব্যক্তি বসবাস শুরু করে। তিনি জাহানারাকে সরিয়ে দিয়ে জায়গাটি দখলের নানা চেষ্টা করতে থাকে। প্রায়ই তার স্কুল পড়ুয়া মেয়েটিকে উত্যক্ত করে বলে সে বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে শিশু পরিবারে রেখে দেয়।

জাহানারার সাথে প্রথম কথা বলছিলাম যেদিন। এক প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে তার সাথে দেখে সামনেই বললেন, ‘এই মহিলা (জাহানারা) ভালো হতে পারে না। ভালো মহিলা হলে তার স্বামী ছেড়ে যাবে কেন? সে একা থাকবে কেন? জবাবে আমি সেই সাংবাদিককে বললাম, ‘ভালো বলতে আপনি কি বোঝাতে চান? ধরে নিলাম মহিলা ভালো না। খারাপ মহিলাকে ধর্ষণ করা যায়? হত্যা করা যায়? যারা এই কাজ করেছে তাদের কি আপনি ভালো মানুষ বলবেন?’ তিনি আমার প্রশ্ন শুনে এতটাই বিশ্রীভাবে হেসেছিলেন যে আমি ভয় পেয়েছিলাম। কখনও পিশাচ দেখিনি, হয়তো পিশাচ হাসলে এমন দেখায়।

আমি জানি দেশে যখন জ্যান্ত মানুষকে পুড়ে মারার প্রতিযোগিতা চলছে দিন, তখন কোন এক মধ্য বয়সী জাহানারা ধর্ষিত হবে, লাঞ্ছিত হবে, উচ্ছেদ হবে এই ঘটনা কারো অনুভূতিতে এতোটুকুও খোঁচা দিতে পারবে না। যেমন আমিও নির্লিপ্তভাবে বলে দিয়েছি, তুমি পালিয়ে যাও, অন্য কোথাও, অন্য কোন হুজুর আলীর এলাকায়। তোমার মতো আমিও মেনে নেই দেশে কোন ন্যায় বিচার নেই।

লেখক সাংবাদিক

 

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.