ফেরদৌস আরা রুমী:
আরবান মিডল ক্লাস সিগারেট খাওয়ার স্বাধীনতার জন্য রাস্তায় নামেনি। যদিও পাবলিক প্লেসে ধূমপান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই নিষিদ্ধ। পাবলিক প্লেসের সংজ্ঞায় বলা আছে স্পষ্ট করে সে স্থানগুলো কী কী? ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেটি পাবলিক প্লেসের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ‘মেয়েমানুষ’ প্রকাশ্যে সিগারেট খেয়েছে সেটাই বিরাট অপরাধ হয়ে গেছে। রিংকুর মতো ব্যাটাগুলো পিটিয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রিংকু তথা মবের পক্ষ নিয়েছে। এই যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মবের পক্ষ নিয়েছে, মেয়েদের ওপর মব এসে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন করেছে, কাল সেটার প্রতিবাদ করেছে মেয়েরা। শুধু লালমাটিয়ার ঘটনায় নয়, ৫ আগস্টের পর থেকে মব দ্বারা নারী হেনস্তা, ধর্ষণ, নিপীড়নের ঘটনা একের পর ঘটলেও তার একটারও বিচার হয়নি। গতকালও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এক তরুণীর লাশের ছবি ফেইসবুকে ঘুরছে। সবমিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি ঘটেছে তা সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মব দ্বারা একের পর এক ধ্বংসজজ্ঞ কোনটাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
কালকের আন্দোলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অপসারণ দাবী ও কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে মূলত বিগত সময়গুলোতে নির্বিকার ভূমিকার কারণে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সব কিছু জেনে বুঝেও একশ্রেণী বলে বেড়াচ্ছে, এরা প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়ার স্বাধীনতা চায়, আরেক শ্রেণি র’ এর উপস্থিতি, কেউ আবার আন্দোলনের মুখপাত্রদের কার কার বাপের পরিচয় কী, মাগী/বেশ্যা/শাহবাগী এসব গালিতো ফ্রি আছেই ইত্যাদি বলে বেড়াচ্ছেন। এখানে মূল আলাপটি যে, নারীর ওপর নিপীড়ন, কর্তৃত্ব, নারীকে যে কেউ এসে যে শাসায়, খোদ আইনের লোকও আইন ভুলে গিয়ে সেই শাসনের পক্ষে মদদ দেয় তার বিরুদ্ধে ছিল আমাদের কন্যাদের, বোনদের, তাদের আন্দোলনের সাথী ভাইদের, বন্ধুদের যুথবদ্ধ প্রতিবাদ।
এই ঘটনাকে রঙ দেয়ার জন্য আরেকটু বাড়িয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন, রমজানে মুসুল্লিরা প্রকাশ্যে নারীদের ধূমপানে আপত্তি জানিয়েছেন। অথচ ঘটনা ঘটেছে রোজার একদিন আগে, এবং সেখানে কোনো মুসুল্লি ছিল না। মূলত রিংকু নামে এক বিকারগস্ত পুরুষ যে আগে ছিল যুবলীগ তথা আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বিএনপির লোক সেজে সেখানে মাস্তানি করছিল। মেয়েদের সিগারেট খাওয়া দেখে রিংকু যখন ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেয় তখন মেয়েরা প্রতিবাদস্বরূপ তার গায়ে চা ছুঁড়ে মারে। তারপর রিংকু ওখান থেকে সরে গিয়ে যুবলীগের আরো লোকজন ডেকে এনে মেয়েদের পিটাতে থাকে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে এই ঘটনার আদ্যোপান্ত নাই, এটা কেউ আমাকে বিশ্বাস করতে বলবেন ন। কিন্তু নিজেকে একজন ধার্মিক মুসুল্লিদের তথা ব্যাটা সমাজের মন পাওয়ার জন্য অবলীলায় মেয়েদের পিটানোর মতো ফৌজদারি অপরাধকে হজম করে ফেলেন?
আইনের প্রতি তিনি আসলেই যদি শ্রদ্ধাশীল এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য আন্তরিক হতেন তাহলে প্রথমেই তিনি বলতেন, কোনো অবস্থাতেই কেউ আইন নিজের হাতে নিতে পারেন না। তারপর কার কতটুকু অপরাধ যার বিচার-আচার করতেন। কিন্তু বাস্তবে জনতুষ্টিবাদীতার পথে হাঁটলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যখন একের পর এক ব্যর্থ হতে থাকেন তখনই কেবল এসব উক্তি করে থাকেন। তিনিও সেই কাজটি করেছেন। এবং তার এই কাজের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের জন্য ফেইসবুকে কিছু প্রভাব বিস্তারকারী লোকজনকেও কাজে লাগিয়েছেন। অথবা এমন হতে পারে তারা ভবিষ্যতে আখের গুছানোর আশায় স্বেচ্ছায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পক্ষ নিয়েছেন। এই পক্ষ নিতে গিয়ে তারা আদৃতা রায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের যেমন পরীক্ষা নিচ্ছেন জুলায়ের তার ভূমিকা নিয়ে, একইসাথে অন্য যেসব মেয়েরা কাল আন্দোলনে ছিল তাদের নানান প্রশ্নবানে জর্জরিত করে সততার পরীক্ষা নিচ্ছেন।
এই সততার পরীক্ষা নেয়ার ধারাবাহিকতার কারণে তাসনীম জারাও কিন্তু বাদ যাচ্ছে না। কারণ শুরু থেকে কেউ এসব অযাচিত পরীক্ষা নেয়াকে প্রশ্ন করেননি। সেজন্য এখন একদল যেমন আদৃতা রায়কে পরীক্ষায় ফেলছেন, আরেকদল তাসনীম জারাকে পরীক্ষায় ফেলছেন তাদের জুলাইয়ের কিংবা আগের ভূমিকা নিয়ে। এ ধরনের বিভক্তিগুলো দিনশেষে নারীর ওপর নোংরামিতে রসদ যুগিয়ে গেছে। পরিণতিতে নারীদের ওপর নিপীড়ন আরও বেড়েছে।
এখন আপনি বা আপনারা ঠিক করেন, সিলেক্টেড নারীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন, নাকি সকল নারীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন? আরবান মিডল ক্লাস কিন্তু আদৃতা রায়ের বিরুদ্ধে নোংরামির প্রতিবাদ যেমন করছে, একই সাথে তাসনীম জারার বিরুদ্ধে নোংরামির প্রতিবাদও করছে। দিনশেষে তারা নারীর ওপর যেকোনো ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকলে আলাদা করে ব্যক্তির পক্ষ নেয়ার দরকার হয় না।
লেখক: কবি ও অ্যাক্টিভিস্ট