কোভিড-১৯ ও সামাজিক স্টিগমা

জিন্নাতুন নেছা:

একজন বলছিলেন করোনা নাকি এইডস, ক্যান্সার এর চাইতেও ভয়াবহ। কিন্তু কীভাবে? এইডস এর যে উপসর্গ তার সাথে করোনা উপসর্গের কোন মিল নাই। আবার ক্যান্সারের সাথেও নাই। কিন্তু ব্যাপারটা হলো করোনা বর্তমানে এক আতংকের নাম। যা মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলছে। নানান মিথ্যা ধারণার কারণে এক শ্রেণির লোক আছেন যারা এটা দ্বারা স্টিগমাটাইজ হয়ে যাচ্ছেন। আর এক শ্রেণির লোক আছেন যারা মনেই করেন না দেশে করোনা আছে।

এক.

আমার এক পরিচিত কলিগ। নাম উহ্য রাখলাম। ঘটনার সারমর্ম হলো ওনারা তিনজন একই ফ্লাটে থাকতেন। ওনার সামান্য ঠাণ্ডা লেগেছিলো, জ্বর, কাশি কিছুই ছিলো না। এমনকি গলা ব্যথা সামান্য ছিলো, শ্বাসকষ্ট নাই -ওনার ভাষ্যমতে। তিনি আরও বলেছেন, তার ঠাণ্ডার একটু সমস্যা অনেক আগে থেকেই আছে। অল্পতেই ঠাণ্ডা লাগে।
কিন্তু তার রুমমেটরা বিষয়টি জানার পর তাকে তার রুম থেকে অন্য একটা আলাদ বিল্ডিংয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে। তাকে এক ঘর থেকে বের হতে দেয় হয় নাই। তার খাবার অন্য একজনের মাধ্যমে রুমের দরজায় পৌঁছে দেয়া হতো। তার গণ্ডি এক রুম। এমনকি তিনি নিজেও ফ্ল্যাটটির আলাদা রুমেই থাকতেন, কিন্তু তার নিজের রুমে কোন এক্সেস ছিলো না। তিনি ঐ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করবার অধিকারও রাখতেন না জরুরি প্রয়োজনেও। তিনি যে জামা-কাপড় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসবেন সেই সময়টুকুও তাকে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ তাকে সম্পূর্ণ আইসোলেশন করে রাখা হয়েছিলো।

কিন্তু প্রশ্ন হলো একজন মানুষকে কখন আইসোলেশন করে রাখা হয়? যখন তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ। কিন্তু পজিটিভ না হলে জ্বর, সর্দি, কাশি এমন উপসর্গ যদি বেশ কিছুদিন চলমান থাকে তখন তাকে হোম কোয়ারেন্টাইন এ থাকতে বলা হয়। এর অর্থ এই নয় যে তিনি ঘর থেকে বের হতে পারবেন না। তিনি তার পরিবারের বা অন্য কোন সদস্যদের সাথে কথা বলতে পারবেন না। সবই পারবেন কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। মাস্ক পরতে হবে, শারীরিক দূরত্ব মানতে হবে। তাহলেই যথেষ্ট। কিন্তু শুধু ঠাণ্ডার কারণে একজন মানুষের সাথে এরকম আচরণ কতটা যৌক্তিক আমি বোধ করি জানি না।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো তার ওই ঠাণ্ডা ব্যতীত কোন উপসর্গ ছিলো না। যা দুদিনেই ভালো হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তার উপর এই মানসিক নির্যাতন চলেছে প্রায় এক সপ্তাহের চাইতে বেশি। এমনকি তাকে কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য ফোর্স করা হয়েছে বার বার। নানান জায়গায় তাকে কোভিড-১৯ পজিটিভ হিসেবে প্রচারও করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

দুই

আমার খুব কাছের একজন মানুষ। উচ্চশিক্ষিত, উচ্চ মার্গের জবও করে। গত সপ্তাহ থেকে তার জ্বর, সর্দি, কাশি, হাঁচি, গলাব্যথা সবগুলো উপসর্গই দেখা দিয়েছে। জ্বর খুব ওঠানামা করছে। শ্বাসকষ্ট এখনো শুরু হয়নি। তিনি চাকরির সুবাদে করোনা হটস্পট জোনে থাকেন। বেশি সচেতন মানুষরাই মনে হয় ভুল করে বেশি। তার হিস্ট্রি হলো হটস্পট জোনে তিনি তার এক অসুস্থ কলিগকে দেখতে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই শুরু। যদিও উনি তার জব লোকেশনে একা থাকেন। কিন্তু এই বিষয়টি তিনি কাউকে বলতে নারাজ। আমার সাথে তার খুব ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বিশেষ করে করোনাকালীন আমার যে মানসিক ডিপ্রেশন ছিলো তাতে অনেক সাপোর্ট করেছেন আমাকে। সাইকো সোশ্যাল সাপোর্ট এর জন্য UND বন্ধু আলাপন গ্রুপে এডও করেছিলেন। কিন্তু তিনি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। কোনভাবেই তাকে ট্রেস করতে না পেরে অন্য নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে জানলাম তিনি করোনার উপসর্গ নিয়ে ঘরে সেল্ফ কোয়ারেন্টাইন এ আছেন।
আমি বললাম, আমার ফোন ধরছেন না কেন? তার উত্তর ছিলো এরকম “করোনা এখন এইডস, ক্যান্সারের চাইতেও ভয়াবহ, লজ্জার। এই কথা আমি কাকে জানাবো বলো। এইটা কি কাউকে বলার মতো কথা?” একজন উচ্চ পর্যায়ের লোকের থেকে এই কথা শোনার পর কিছু বলার ইচ্ছে আমার হয়নি।তাছাড়া এই অবস্থায় তাকে মানসিক কষ্টটাও দিতে চাইনি। ডাক্তার দেখাবেন না তিনি। শুধু তার এক বন্ধুর পরামর্শ মতো চলছেন। বাংলাদেশের কোভিড-১৯ টেস্টের যে অবস্থা তাতে হাসপাতালে যাননি কোন সমস্যা নাই। কিন্তু টেস্ট অন্তত করাবেন এটা আশা করেছিলাম। কিন্তু তিনি তার পরিবারকেও জানাননি, টেস্ট ও করাননি। গতকাল পর্যন্ত তিনি খুব অসুস্থই আছেন।

তিন

সকাল সকাল ছেলের ফোনে জানলাম তার নানা-নানীর সাথে বিয়ে খেতে গিয়েছে এই করোনা যুগে। বিয়ে হলো আমার এক কাজিনের। করোনা যুগেও বিয়ে হয় তা আবার আমার কাজিন শুনে আমি হতাশ। আমার বাবাকে আমি আজও বুঝাতে পারিনি দেশে করোনা আছে, সাবধানে চলতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। গতকাল বলছিলো বাবা, “আরে দ্যাশে করোনা-ফরোনা কিছুই নাই। যেগুলা মারা যাচ্ছে সেগুলা এমনি মারা যাচ্ছে। বয়স হলে মানুষ মারা তো যাবেই। শেষ জামানা চলে আসছেনা!” কথা বাড়াতে আর ইচ্ছে করেনি। বলা যায় আমি বলতে বলতে ক্লান্ত।
আজ ছেলেকে বললাম, বিয়ে বাড়িতে গেছো ঠিক আছে, কিন্তু কারো গায়ে হাত দিবা না, দূরে দূরে থাকবা, সাবান দিয়ে হাত ধুইবা ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলে বলেছে, দেশে করোনা নাই, লকডাউন সরকার তুলে দিয়েছে, সব ভালো হয়ে গেছে, বলেই ফোনের লাইন কেটে দিয়েছে।

কিন্তু আমার এখন শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছে। বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছি। ভাবতে পারছি না কি হবে!

উপরিউক্ত তিনটি ঘটনাকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে কী দাঁড়াবে–

# কোভিড-১৯ স্টিগমা বর্তমানে খুব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর কারণ কী? শুধুই কি অসচেতনতা অজ্ঞতা, ভীতি? আর ভীতি যদি হয় তাহলে কীসের ভীতি? গতকাল নিউজ দেখলাম করোনা রোগী ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অনেক রোগী পালিয়ে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন। এগুলো কেন হচ্ছে? সচেতনতার অভাবেই শুধু? আমি বলবো, না। শুধু সচেতনতার অভাবে কেউ মরার আগেই মরে না। কিন্তু কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা ব্যবস্থার নিম্নমান আর যে হ্যারেজমেন্ট শিকার তারা হচ্ছে এটা একটা অন্যতম কারণ এই পালিয়ে যাবার আর আত্মহত্যা করার।

স্টিগমার আর একটা কারণ হলো লোকজন খুব ভীত, একটা আতংকের মাঝে থাকতে থাকতে অনেকেই মানসিক ডিসঅর্ডার হয়ে গেছে, ফলে কোন সামান্য উপসর্গেই তারা সঠিক সিদ্ধান্ত তো নিতেই পারছেনই না, অন্যকে সহমর্মিতা, সহযোগিতা না করে বরং এই ধরনের আচরণ করছেন। এই অবস্থা চলমান থাকলে অচিরেই দেশে প্রায় এক চতুর্থাংশ লোক ডিপ্রেশনে চলে যাবে। অনেকে তো গিয়েছেন বটেই।

# আরেক শ্রেণির লোক আছে যারা গ্রামে থাকেন, সারাদিন টিভির খবর দেখেন। সব মিথ্যা নিউজ দেখেন। সরকারের মিথ্যা প্রেস ব্রিফিং দেখেন। একারণে তারা অসচেতনভাবে চলছে, এবং দেশকে আরও ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি বলা যায় যে সরকার সফল?

# আরেক শ্রেণির ধর্মান্ধ আছেন যারা ভাবেন হায়াত- মউত আল্লাহর হাতে। কপালে যা আছে হবে।

সরকারি-বেসরকারি সংস্থার এতো এতো সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মোবাইল ফোনের ম্যাসেজ,ডায়াল করলেই শোনানো ভয়েস রেকর্ড এগুলো কি কোন কাজেই আসছে না!

করোনার এই স্টিগমা থেকে বের হওয়া খুব জরুরি। এর জন্য সাইকো-সোশ্যাল সাপোর্ট চালু করা সময়ের দাবি। নতুবা নতুন এক ভয়াবহ এক দিনে প্রবেশ করতে চলেছি আমরা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.