যত্রতত্র সৌন্দর্যের প্রশংসা এপ্রিসিয়েশন নয়, বরং অপমান

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

ধরা যাক একটা ছেলে বা মেয়ে ফেসবুকে লাইভে আসল বা ভিডিও পোস্ট করলো। হতে পারে সেখানে সে মোটিভেশনাল স্পিচ দিলো, গান গাইলো, কবিতা আবৃত্তি করলো, অভিনয় করলো, নাচলো কিংবা কোনো একটা বিষয়ের উপর লেকচার দিলো।

আপনার সেটি ভালো লাগলো, এবং আপনি মনে করেন যে সব ভালো কাজের এপ্রিসিয়েশন জরুরি, যাতে করে ওই ব্যক্তি আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ পায়। তাহলে এখন আপনি তাকে কীভাবে এপ্রেশিয়েট করবেন? এটা বলবেন যে, “ভাইয়া/আপু, আপনার কথা/গান/নাচ/আবৃত্তি আমার অনেক ভালো লেগেছে, এটার বিষয়বস্তু অনেক গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ”, নাকি বলবেন, “ভাইয়া/আপু, আপনি অনেক সুন্দর, আপনার হাসিটা অনেক কিউট, আমি আপনাকে ভালোবাসি?”

আপনি যদি এপ্রেসিয়েশন বা তারিফের সঠিক সংজ্ঞা জেনে থাকেন, তাহলে আপনার অবশ্যই ওই ব্যক্তির দক্ষতার জায়গাটা নিয়েই কথা বলা উচিৎ, তার মেধা ও সৃজনশীলতার প্রশংসা করাই আপনার কর্তব্য। কেননা তার দক্ষতা-মেধা-সৃজনশীলতার প্রশংসাই তাকে উদ্বুদ্ধ করবে ভবিষ্যতে এমন আরও ভালো ভালো কাজ উপহার দেয়ার।

কিন্তু তা না করে আপনি যদি তার শারীরিক বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েই শুধু কথা বলেন, তাতে তাকে কীভাবে উৎসাহ দেয়া হয়? সে যে সুন্দর, সেটা তো নতুন কিছু না। ছোটবেলা থেকেই সে সুন্দর। আর সে যে সুন্দর, এ কৃতিত্বও তার না। সুন্দর রূপেই সে জন্মগ্রহণ করেছে। এটুকু শুধু তার হাতে যে নিজের সৌন্দর্যের সঠিক পরিচর্যা সে করেছে, কিংবা নিজেকে দৃষ্টিনন্দনভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করেছে।

তারপরও তার এই সৌন্দর্য তো কোনোভাবেই এখানে আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে না। আপনার-আমার প্রশংসা সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ তার সর্বশেষ সৃষ্টিটির প্রসঙ্গেই, যেটি সে মাত্র আমাদের সামনে হাজির করেছে। কেবল তাহলেই তার মেধা ও প্রতিভার সঠিক এপ্রেসিয়েশনটা করা হয়।

এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে যদি আমরা কথা বলি, তাহলে তার সাম্প্রতিকতম সৃষ্টিটিকে অবহেলা করা হয়, সেটির প্রতি অবিচার করা হয়। এবং এর মাধ্যমে আদতে ওই ব্যক্তিকে অপমানই করা হয়। কারণ সে তার শারীরিক সৌন্দর্য দেখাতে ফেসবুক লাইভে আসেনি বা ভিডিও পোস্ট দেয়নি। সে তার কাজটা বা ধারণাটা আমাদের সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছে, অথচ আমরা সেটিকে প্রাপ্য সম্মান না দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছি, যা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। তাই আবারো বলছি, কারও কাজের প্রশংসার পরিবর্তে তার চেহারা বা হাসি নিয়ে কথা বলা তাকে অপমানেরই নামান্তর।

এবার চিন্তা করা যাক সেইসব ছেলে বা মেয়ের কথা, যাদের চেহারা বা হাসি হয়তো এমন নয়, যেটি সামাজিকভাবে সুন্দর হিসেবে স্বীকৃত। নিঃসন্দেহে জগতের সকল সৃষ্টিই সুন্দর, কোনো ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়াই; এখানে কথাটা শুধু তর্কের খাতিরে বলছি।

তথাকথিত সুন্দর না হলেও তারা মেধা-দক্ষতার দিক থেকে তো অনবদ্য হতেই পারে, তাই না? যেহেতু এগুলোর সাথে ব্যক্তির বাহ্যিক সৌন্দর্যের কোনোরকম যোগাযোগ নেই। এমনকি এটাও হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে আপনি-আমি স্রেফ দেখতে সুন্দর বলে যাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছি, তাদের চেয়েও কেউ কেউ বেশি মেধাবী, এবং অপেক্ষাকৃত ভালো মানের কনটেন্ট তৈরি করছে।

অথচ নিজেদের কাজের প্রাপ্য স্বীকৃতিটা তারা পাচ্ছে না, শুধু দেখতে সুন্দর নয় বলে। আমরা দেখতে সুন্দর মানুষদের কমেন্ট বক্স আবেগের আতিশয্যে ভাসিয়ে দিচ্ছি, ফলে সেগুলোর রিচও যাচ্ছে বেড়ে, কিন্তু মানের দিক থেকে শ্রেয় কনটেন্টগুলো ন্যূনতম অডিয়েন্সের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।

আবার এমন ছেলেমেয়েও তো কম নেই যারা ছোটবেলা থেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগে, কেননা কেউ তাদের সুন্দর বলে না, বরং তাদের আউটলুক নিয়ে উপহাস করে, মজা নেয়। এ কারণে সেই ছোটবেলা থেকেই তারা সমাজের তথাকথিত সুন্দরদের থেকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে থেকেছে। এবং এখন অনলাইনে নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের ভালো ভালো প্ল্যাটফর্ম থাকলেও, তারা হয়তো নিজেদেরকে উপস্থাপনের মতো মনের জোর বা সাহসটুকুও পাচ্ছে না। কেননা তারা ভাবছে, “সব প্রশংসা তো সুন্দরদের ভাগ্যেই জুটবে, আমাদের নিয়ে তো কেউ কথা বলবে না।”

আপনার কাছে হয়তো আমার এই কথাগুলো অতিরঞ্জন মনে হতে পারে। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এমন অনেক ছেলেমেয়েই আমাদের চারপাশে ঘাপটি মেরে আছে, যারা এই করোনাকালে অনলাইনে এসে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশের কথা ভাবছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করে উঠতে পারছে না শুধু নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার কারণে। ঠিক যেমন করে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির কোনো প্রতিযোগিতায়ও তারা অংশ নিত না এই দুঃখজনক হীনম্মন্যতার ফলে। এদিকে আমরা তাদের কথা একটাবারও চিন্তা না করে, কারও কারও কমেন্ট বক্সে গিয়ে মেতে থাকছি শারীরিক সৌন্দর্যের প্রশংসার এক বিকৃত ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায়।

অথচ একবার ভেবে দেখুন তো, এই ভার্চুয়াল জগৎ, কিংবা আমাদের বাস্তব জগতও কি এমন হওয়া উচিৎ ছিল না, যেখানে কারো প্রতিভার মূল্যায়ন হবে স্রেফ তার প্রতিভার ভিত্তিতেই, শারীরিক সৌন্দর্যের ভিত্তিতে নয়? আমাদের নিজেদের মাঝে কি এমন মানসিকতার অঙ্কুরোদগম করা উচিৎ ছিল, যার আপ্তবাক্য হলো: “আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারি”?

এই কথাগুলো কোনো পটভূমি ছাড়া, হুট করেই বলছি না। বাস্তবেই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সত্যি সত্যিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অনেককে দেখা যাচ্ছে, যারা তাদের শারীরিক সৌন্দর্য দিয়ে বিশেষায়িত হয়ে উঠছে, যাদের উপর প্রশস্তির বারিধারা অবিরত ঝরে পড়ছে, এবং যারা প্রতি দশ মিনিট অন্তর প্রেম অথবা বিয়ের প্রস্তাব পাচ্ছে।

কেউ ভাববেন না তাদের এই তারকা খ্যাতিতে আমি ঈর্ষান্বিত। তাদের কারও কারও সৃষ্টিকর্মের আমি নিজেও বিশাল বড় ভক্ত। আমি শুধু এজন্য ব্যথিত যে এই অসামান্য প্রতিভাধর মানুষগুলো তাদের মেধা ও দক্ষতার যথাযথ স্বীকৃতিটা পাচ্ছে না। সেগুলো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তাদের শারীরিক সৌন্দর্যের আলোচনায়। এবং আমি আরো বেশি আতঙ্কিত তাদের জন্য, যাদের মাঝে প্রতিভার কোনো কমতি না থাকার পরও তারা যোগ্য সম্মানে সম্মানিত হচ্ছে না, কিংবা হয়তো নিজেদেরকে মেলে ধরার সাহসটুকুই অর্জন করতে পারছে না, ফলে তাদের অমূল্য মেধা ও প্রজ্ঞা অঙ্কুরে বিনষ্ট হচ্ছে।

যে প্রসঙ্গটি উত্থাপন না করলে এ আলোচনা পূর্ণতা পাবে না তা হলো, সৌন্দর্য নিয়ে এই হীনম্মন্যতায় ছেলেরা না যতটুকু ভোগে, তার চেয়ে মেয়েরাই কিন্তু বেশি ভোগে। কেননা আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমন যে, এখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে শারীরিক সৌন্দর্যটাকেই মুখ্য ধরা হয়, অন্য সব গুণাবলি হয়ে যায় গৌণ। তাই কোনো সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণকারী ছেলের সৌন্দর্য নিয়ে যতটা চর্চা হয়, তারচেয়ে মেয়ের সৌন্দর্য নিয়ে কাঁটাছেড়া হয় বেশি, হোক সে কাঁটাছেড়া ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকভাবে।

এমনকি অনেক মেয়েকেও দেখেছি, অন্য কোনো মেয়ের সৃজনশীল কাজের প্রশংসা না করে লিখছে, “আপু আপনাকে অনেক মিষ্টি লাগছে”, “আপু আপনার শাড়িটা এত সুন্দর” ইত্যাদি। এমন যখন অবস্থা, তখন তথাকথিত কম সুন্দরী বা অসুন্দরী হিসেবে বিবেচিত মেয়েদের নিজেকে প্রকাশের আগে কতবার চিন্তা করতে হয়, একটু ভেবে দেখুন তো।

আর এই যে কোনো ব্যক্তির পোস্টে গিয়ে “আপনাকে আমি ভালোবাসি” কিংবা “প্লিজ ম্যারি মি” বলা, এগুলোও কিন্তু একপ্রকার হ্যারাসমেন্ট। বলাই বাহুল্য, মেয়েরা এক্ষেত্রেও সিংহভাগ ভুক্তভোগী। বিষয়টি এমন হয়ে গেছে যে, কোনো মেয়ের একটু পরিচিতি তৈরি হলেই, সে খানিকটা ‘পাবলিক ফিগার’-এ পরিণত হলেই, ছেলেবুড়ো সবারই যেন অধিকারবোধ জন্মে যায় তাকে প্রকাশ্যে প্রেম অথবা বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার।

আমাদের টনক শুধু তখনই নড়ে, যখন ওই মেয়ের ব্যাপারে খুব বাজে, অশালীন কোনো মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়া হয়। তার আগে পর্যন্ত সব ঠিক। বিশেষত পাবলিক প্ল্যাটফর্মে প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ের প্রস্তাব দেয়া তো খুবই রোমান্টিক, এবং ততোধিক হিউমারাস!

লেখক:
শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.