সন্তানকে যেন অসম্মান করতে না পারে বাবা

0

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

আমি তখন অনার্স পড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটের চার তলায় একজন ভদ্রলোক থাকতেন তার স্ত্রী আর একমাত্র কন্যাকে নিয়ে। কাজের ব্যস্ততায় ভদ্রলোকের বাসায় ফিরতে বেশি রাত হয়ে গেলেও মেয়েটি না ঘুমিয়ে জেগে থাকতো। বাবা আসার সাথে সাথে মেয়েটি খুশিতে চিৎকার করে বলতো, আব্বু কী এনেছো? আর বাবাও চিৎকার করে বলতো, এই যে আম্মু, তোমার জন্য কতকিছু এনেছি।

পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়ার সুবাদে তাদের সেই কথোপকথন আমাকে আমার ছোটবেলায় নিয়ে যেত, কেমন একটা ভালোলাগার আবেশ আমাকে জড়িয়ে ধরতো। আমি আমার বাবাকে বলতাম, ছোটবেলায় আমি যেরকম তোমার কলেজ থেকে আসতে দেরি হলে জেগে থাকতাম, আর এলেই বলতাম, বাবা কী এনেছো? আর তোমার হাতে কিছু না কিছু সবসময়ই থাকতো। ওরাও আমাদের মতোন বাবা।

বাবা বলতো, তা তোর বড়বেলায় কী পরিবর্তনটা হয়েছে শুনি! সেই দৃশ্যটা স্মৃতি হতে খুব সময় লাগেনি, ভদ্রলোক হঠাৎ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসার কারণে তার যখন দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল, বাসা থেকে বেরিয়ে ভদ্রলোক গাড়িতেই উঠতে পারছিলেন না, মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবাই যখন তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গাড়িতে উঠাচ্ছিল, তিনি কাঁদতে কাঁদতে আমার বাবার হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, ‘মেয়েটার জন্য বাঁচতে চাই দাদা’।

বেঁচে থাকার কী ভীষণ আকুতি নিজের সন্তানের জন্য একজন বাবার, তা নিজের চোখে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিলাম।আরেকটা পরিবারের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, যেখানে দুইটা ছেলে ছিল। শুনেছিলাম, ছোট ছেলেটার প্রথম জন্মদিনের একদিন আগে জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় হঠাৎ হার্ট এ্যাটাকে তার বাবা মারা যায়। আমার খুব খারাপ লাগতো ছেলেটার কথা ভাবলে যে, সে জানেই না বাবা কী বা বাবার ভালবাসাটাই বা কী!।

যেদিন আমি ওদের বাসায় প্রথম যাই সেদিন ছিল ছোট ছেলেটার চতুর্থ জন্মদিন। ঘরে ঢুকেই চোখে পড়লো, বাচ্চা ছেলেটা কেক কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অথচ এখানে আরও একজন মানুষের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক ছিল, কিন্তু সেটা তো অসম্ভব, তার বাবা তো পরপারে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকাতেই কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমি তখনো জানতাম না এর চেয়ে ভয়াবহ,হৃদয় বিদারক দৃশ্য আমার দৃষ্টিগোচর হওয়ার বাকি আছে। যে আমি একজন মৃত পিতার সন্তানের জন্মদিনে অনুপস্থিতির দৃশ্য দেখতে পারছিলাম না, সেই আমি যখন দেখলাম একজন জন্মদাতা জীবিত, এবং একই দেশে অবস্থান করেও অন্যান্য দিনে তো নয়ই, এমনকি নিজের সন্তানের প্রথম জন্মদিনে পর্যন্ত সন্তানের খোঁজখবর নেয়া বা তার পাশে থাকার পরিবর্তে একজন মডেলের সাথে দাঁত কেলিয়ে ছবি অত্যন্ত গর্বসহকারে ফেইসবুকে পোস্ট করছে -আমার জীবনে দেখা সেরা বিভৎস দৃশ্যের মধ্যে এটি হলো একটি।

এরকমও যে মানসিকতার জন্মদাতা হয় তথাকথিত সভ্যসমাজে, তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। এই সমস্ত ঘটনা নাটক, সিনেমায় দেখলে বা পত্রিকার পাতায় পড়লেও গা শিউড়ে উঠে, সহ্য করতে কষ্ট হয়, কিন্তু চোখের সামনে এমন দৃশ্য সহ্য ক্ষমতাকেও হার মানায়। নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এরা এতোটাই নিচে নেমে যায় যে, নিজের সন্তানের জীবন নিয়ে খেলতে, সেই জীবনটাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতেও একবিন্দু দ্বিধাবোধ করে না। সন্তান তাদের জীবনে না কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে, না তারা সন্তানের জীবনে কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়! তারা উপার্জন করে নিজের জন্য, সন্তানের পিছনে খরচের জন্য না। তারা বাঁচে নিজের জন্য, সন্তানের জন্য না। নিজের জন্য দশটা পোশাক কেনার সময়, রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নেয়ার সময়, দেশবিদেশ ঘুরে ঘুরে হাওর-বাওর দেখার সময়, গাড়ি/বাইক চালানোর সময়, নৃত্য-গীত পরিবেশনের সময় তাদের বুক একবারও কেঁপে উঠে না নিজের সন্তানটির কথা ভেবে।
তাদের অসুস্থ জীবনযাপন, বিকৃতভাবে আনন্দ উপভোগ সবকিছুই চলতে থাকে ছোট্ট শিশুর জীবনে নিজের ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতিতে। আমাকে আতঙ্কিত করে সেই ধরনের পিতৃত্ব, চোখে আঙুল দিয়ে জানান দিয়ে যায় সমাজের অবক্ষয়ের।বুঝিয়ে দেয় পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের কী ভীষণ ঘাটতি রয়েছে এদের বেড়ে উঠায়। নৈতিকতার চর্চা না এরা নিজ গৃহে দেখেছে, না বাইরে থেকে নিজ উদ্যোগে আত্মস্থ করেছে।

একজন বাবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার সন্তানই হয়, আর সন্তানের সবচেয়ে আস্থার, নিরাপত্তার স্থান হয় তার বাবা। যার কাছে নিজের জীবনের চেয়েও প্রাধান্য পায় সন্তানের জীবন। কতটা ত্যাগ একজন বাবা তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য করে, তা নিজে একজন সন্তান হিসাবে আজও প্রতি পদে অনুভব করি। বাবা সন্তানকে গর্ভে ধারণ না করলেও হৃদয়ে ধারণ করে, অন্তর দিয়ে লালন পালন করেন আজীবন।

জন্ম থেকেই সন্তানের তার মায়ের প্রতি ভালবাসা, নির্ভরতা থাকে, আর বাবার প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হয় তার প্রতি বাবার আদর, যত্ন, স্নেহ, মমতা, ভালবাসা থেকে। জন্ম দিলে জন্মদাতা হওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু বাবা হওয়া যায় না, বাবা হয়ে উঠতে হয় কর্ম দিয়ে।

আমি ভাবতাম, একমাত্র পিতার মৃত্যুই সন্তানকে পিতার স্নেহ-ভালবাসা থেকে প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিত করতে পারে, কিন্তু জীবিত পিতার কাছে সন্তান যখন বিবেচ্য বিষয় হয় না দেখলাম, তখন বুঝলাম পিতার মানসিক বিকারগ্রস্ততা, যথেচ্ছ জীবন যাপনের অভ্যস্ততাও একজন সন্তানকে তার জন্মদাতার স্নেহ বঞ্চিত করতে পারে। যে দুটি শিশুর কথা ভাবলে আগে খুব কষ্ট হতো ওদের বাবা নেই বলে, এখন আর তা হয় না। মনে হয় ওদের বাবা প্রতারক নয়, নিজের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তারা অসহায় ছিল নিয়তির কাছে। তাদের জীবনে পিতা হারানোর দুঃখ থাকলেও অপমানের কষ্ট নেই, বিচ্ছেদ থাকলেও অসম্মান নেই।

একটা ছোট্ট শিশুর মনোজগতকে তোলপাড় করার জন্য জন্মদাতার এহেন কদর্য আচরণই যথেষ্ট। যার শিশুর নিরাপত্তা বিধানের কথা, সেই যখন শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়, তাকে ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান বানাতে উঠেপড়ে লাগে, নিজের জীবনে সন্তানের অস্তিত্ব পারতে স্বীকারই করতে চায় না, নিজের সন্তানের সবচেয়ে বড় শত্রুর ভূমিকায় নিজেই অবতীর্ণ হয়, তখন শিশুর ছোট্ট হাতটিকে শক্তভাবে ধরার জন্য আইনের দরকার হয়।

আমাদের দেশে সন্তানের ভরণপোষন, দেখভাল, সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সুস্থ ও স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিন্ত করার জন্য শাস্তির বিধান রেখে কঠোর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। যাতে সমাজের নাকের ডগায় বসে কোনো জন্মদাতা বুক ফুলিয়ে সন্তানকে অসম্মান করার স্পর্ধা না দেখাতে পারে, জবাবদিহিতার জন্য হলেও ক্রোকোডাইল টিয়ারস ঝরাতে বাধ্য হয়। যেখানে চাইলেই সন্তানের স্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করা কারো পক্ষে সম্ভব না হয়।

আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। চাই প্রতিটি শিশু সুন্দর পরিবেশে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারি চমৎকার মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। ভবিষ্যতে তারা নিজেরাও স্পার্ম ডোনার বা জন্মদাতা না হয়ে বরং বাবা হয়ে উঠাকেই একটি যোগ্যতা বলে মনে করুক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৪,৬৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.