অনলাইন প্রজন্মের অসুস্থতা বনাম সুস্থ প্যারেন্টিং

তানিয়া মোর্শেদ:

অনলাইন জগত থেকে বিরতি, না কি সরে যাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে! এতো আক্রমণ-গালাগালি-নেতিবাচক কথা পড়লে মনে হয় এরা কাদের দেখে বেড়ে উঠেছে? এরা কি সবাই অসুস্থ সমাজের প্রতিনিধি?

কেউ বলেনি কাউকে সবার কথা বিশ্বাস করতে বা নিজের জীবনে মানতে। অথচ একে অন্যের কথা বাতিল শুধু নয় নোংরাভাবে আক্রমণ করছে! এদেশে অনেক সময় ইয়াহু বা অন্য নিউজ সোর্সের খবরের নিচে যেমন দেখা যায় আক্রমণ করে লেখা, প্রধানতই বর্ণবাদী কথা, বাংলাদেশে তার হাজার গুণ নোংরা কথা। প্রধানত নারীর প্রতি চূড়ান্ত অবমাননাকর, সাম্প্রদায়িক কথা (অমুসলমানদের প্রতি) আর ব্যক্তিগত আক্রমণ। অসভ্য সমাজের হাতে প্রযুক্তির চূড়ান্ত অপব্যবহার মনে হয় এসব দেখলে!

গতকাল দেখলাম উইমেন চ্যাপ্টারের লেখকদের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত নোংরা আক্রমণ করে লেখা, ছবিসহ! এটা চূড়ান্তভাবে সাইবার বুলিইং অপরাধ। অথচ এখন পর্যন্ত কেউ কি কোনো আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন এ’ বিষয়ে? কেন নেবেন? এখানে তো “বিশেষ” কোন বিষয়ে, বা “বিশেষ” কোন মানুষদের বুলিইং করা হয়নি! অপরাধ লাগাম ছাড়া হয়ে যায় যখন আইনের প্রয়োগ কমতে কমতে নেই হয়ে যায় বা বিশেষ বিষয় বাদে প্রয়োগ না ঘটে।

অনলাইনের নোংরা ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে, এতো বড় বিশাল জনগোষ্ঠী এতো অপরাধী! না, অসুস্থতা বলবো না। তা বললে অপরাধের মাত্রা কমে যায় শুধু নয়, অপরাধকে এক ধরনের বৈধতাও দেওয়া হয়। একদিনে সমাজের একটি বড় অংশ এ’ জায়গায় পৌঁছেনি। প্যারেন্টিং বলে যে একটি বিষয় আছে, তা আজও বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের ক’জন বোঝেন বা খেয়াল করেন? হঠাৎ করে অর্থ মানুষের হাতে আসলে অনেকেরই মাথা ঠিক থাকে না। বাংলাদেশের অনেক মানুষের হাতে অনেক টাকা এসেছে, বৈধ এবং অবৈধভাবে। যদিও অবৈধভাবেই বেশি। অনেকেই অনেক কিছু কেনার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক প্যারেন্টই কিছুই না জেনে সন্তানের হাতে তুলে দেন।

অতি অল্প বয়সে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না করে অনেকেই অপব্যবহার করছে। সারারাত ধরে ফোনে কথা বলা, মুভি দেখা, গেইম খেলা করছে সন্তান। অথচ প্যারেন্টদের কোন হুঁশ নেই! কী মুভি দেখছে, কোন ওয়েবসাইট দেখছে, কী গেইম খেলছে, কাদের সাথে মিশছে, কোন খবর নেই প্যারেন্টদের! এভাবে বেড়ে ওঠা সন্তান সাইবার বুলিইং থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী পর্যন্ত হতে পারে, হচ্ছে।

এমনিতেই গোঁড়া সমাজে নারী বিদ্বেষ, নারীর অপমান-অবমাননা, ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের যৌন নির্যাতন (শিশু সহ), বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা বেশি থাকে। সেখানে যদি আইনের প্রয়োগ কমে যায়, বিশেষ ক্ষেত্রে কেবল প্রয়োগ ঘটে, তাহলে সেই সমাজে অপরাধীর সংখ্যা মাত্রা ছাড়াবেই। অতিরিক্ত জনসংখ্যা যে সবদিক দিয়েই কত বড় বাধা সব কিছুর তা বাংলাদেশের ক’জন ভাবেন?

যেকোন ভালো কিছুর পদক্ষেপ নিতে গেলেই বাজেট একটি বিষয়। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে কোন ভালো ধারণা কার্যকরি করা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে বাজেট একটি বিষয়। পারিবারিকভাবেও এটি ভাবার বিষয়। এক বা দু’সন্তানকে বড় করা আর অনেকগুলো সন্তান বড় করার ক্ষেত্রে টাকার বাজেট শুধু নয়, প্যারেন্টদের সময়-এনার্জি-মনোযোগ সব বিষয়ের বাজেটেই টানাটানি পড়বেই।

বাংলাদেশের অধিকাংশ বিষয়েই অতিরিক্ত জনসংখ্যা অন্যতম প্রধান অন্তরায়। অথচ পরিবার পরিকল্পনা সম্ভবত চূড়ান্ত ভাবে উপেক্ষার বিষয় বেশ কিছু বৎসর ধরে! অধিকাংশ বিষয়ই মানুষের অধিকার। কিন্তু যে অধিকার মানুষের কল্যাণ তো আনেই না বরং অকল্যাণকর হয়ে যায় তখন বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়। বাংলাদেশে এক সন্তানে বাধ্য করার সময় এসেছে, বেশ আগেই। আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্যারেন্টিং বিষয়ে সচেতন হওয়া এযুগের চূড়ান্ত দাবি, তা যে দেশেই-সমাজেই হোক। প্যারেন্টিং মানে সব পরীক্ষায় এ+ পাওয়া নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.