‘অসাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ এক না

0

দেবজ্যোতি দেবু:

শুরুতেই বলে রাখি, ‘অসাম্প্রদায়িক’ আর ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ দুইটা শব্দের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি কঠিন পার্থক্য অনুভব করি।

অসাম্প্রদায়িক বললে আমি বুঝি এখানে সকল সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে অস্বীকার করে সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা। আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বললে বুঝি মানুষকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে তার ভিতরে সম্প্রীতি খোঁজার বৃথা চেষ্টা করা। কারণ, বাংলাদেশকে আমি যখন বলবো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, তখন আমি স্বীকার করে নিলাম এই দেশের মানুষেরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। এই বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে আবার পারস্পরিক সম্প্রীতিতে বাঁধার চেষ্টা করার নাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তখন আমি এটা প্রমাণের চেষ্টা করবো যে, এখানকার মানুষের সম্প্রদায় আলাদা হলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। অথচ সেই সময়টাতে আমি এটা ভুলে যাবো যে, বন্ধুত্বের মাঝেও ভাঙ্গন ধরে। বন্ধুত্বের সরলতার সুযোগও কেউ কেউ নেয়।

আমি সহজ ভাষায় যা বুঝি তা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক বিভক্তিকে স্বীকার করে নেয়া মানেই বিভক্ত জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হারকে স্বীকার করে নেয়া। তখন আমি না চাইলেও সেখানে সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘুত্বের প্রাচীর উঠে যাবে। আর সম্প্রদায়কে আলাদা ভাবে স্বীকার করা মানেই তাদের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকারকেও পৃথক করে দেয়া। আর সেই সাথে সংখ্যাগুরুদের তাদের অধিকারকে অধিক প্রাধান্য দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়া। সাংবিধানিক ভাবেই এই দেশ অসাম্প্রদায়িক। শুরু থেকেই এখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে অস্বীকার করা হয়েছে। অস্বীকার করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে। কিন্তু আমরা নিজেরাই দিনে দিনে এখানে ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের বদলে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র কথা বলে বলে দেশের মানুষদের বিভক্ত করে দিয়েছি। স্বীকার করে নিয়েছি সাম্প্রদায়িকতাকে। আর এখন যখন দেশে সাম্প্রদায়িকতা একটি কঠিন সমস্যায় পরিণত হয়েছে তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই দায়ী করছি।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তার মানে কি এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হচ্ছে না? তার মানে কি ধর্ম ত্যাগ করে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে?

উত্তর হচ্ছে, না। ধর্ম ত্যাগের কোনো প্রসঙ্গ এখানে আসে না। বিভিন্ন ধর্মের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করা হচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে, ধর্মীয় বিভেদ ভুলে ‘মানুষ’ পরিচয়ে এক হতে। যেমন ধরুন, আপনাকে প্রশ্ন করা হলো আপনার ছেলে-মেয়ে ক’জন। আপনি বললেন, এক ছেলে এবং এক মেয়ে। আপনার বলার মধ্যে হয়তো কোনো ভুল নেই। কিন্তু নিজের অজান্তেই আপনি ছেলে-মেয়ের মাঝে অদৃশ্য একটা দেয়াল তুলে দিলেন। সারা জীবনের জন্য তাদের পরিচয়ের মধ্যে আপনি একটা পার্থক্য তৈরি করে দিলেন। যার ফলে তাদের অধিকারের মাঝেও একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু আপনি যদি বলতেন, আমার দুই সন্তান। তাহলে সেটা ভুল হতো না, বরং আপনার সন্তানেরা সমান অধিকার এবং এক পরিচয়ে পরিচিত হতো। তারা বিশ্বাস করতে পারতো পরিবারে তাদের দু’জনের অবস্থানই সমান। বাবা-মা তাদের সমান চোখে দেখেন।

এখন বলি সাম্প্রদায়িক বিভক্তি কেন খারাপ।
সাম্প্রদায়িক বিভক্তি আমাদের এই ভূ-খণ্ডের জন্য সুখকর ছিল না কোন কালেই। দাঙ্গা, প্রাণহানি, দেশভাগসহ নানান ক্ষতিকর পরিণতির মূলে ছিল সাম্প্রদায়িক বিভক্তি। লর্ড মাউন্টব্যাটেন বলেছিল, “হিন্দু-মুসলমানদের ভেতর ঐক্যের গ্রন্থি ছিল একটাই, সেটা হলো ব্রিটিশদের প্রতি ঘৃণা। ঐ ঘৃণাই তাদেরকে পরস্পরকে ঘৃণা করা থেকে নির্বৃত্ত করেছে। আমরা চলে যাচ্ছি। এখন থেকে একে অপরকে ঘৃণা করা ছাড়াতো তাদের আর কিছুই করার থাকবে না।”

বাস্তবে হয়েছেও তাই। এই ঘৃণার বলি হতে হচ্ছে আমাদের এখনো। এই ঘৃণা নামক অপ্রিয় শব্দটির সুযোগ নিচ্ছে একটা স্বার্থান্বেষী মহল। তারা মানুষের মাঝে বিভাজনের সুযোগ নিয়ে একে অপরকে লেলিয়ে দিচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে। তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে, ‘এটা মুসলমানের দেশ। হিন্দুদের দেশ ভারত’। আমরাও সেই সুরে সুর মিলিয়ে নেচে যাচ্ছি। তারা আমাদের রাষ্ট্রের একটি ধর্মীয় পরিচয় সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছে। আর তাতে সাহায্য করেছি এই আমরাই।

তার কারণ, আমরা নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দেয়ার আগে আমাদের সম্প্রদায়ের পরিচয়টাকে প্রাধান্য দেই। বিভক্তির বিষ আমাদের মগজে এতোটাই প্রখর হয়েছে যে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকেও কেটে দুইভাগ করে দিতে চাই! এই বিভক্তির সুযোগ নিয়ে তারা এক সম্প্রদায়ের ভিতরে আবার আস্তিক-নাস্তিক নামক আরো বিভক্তির জন্ম দিচ্ছে। বিভক্তির পর বিভক্তি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে আর আমরাও ভাইয়ে ভাইয়ে জড়িয়ে পড়ছি রক্তারক্তি লড়াইয়ে।

বিশ্বজুড়ে যে সহিংসতা চলছে তার মূল কোথায়, কখনো কি ভেবেছেন? কেন আজ শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে মানব সভ্যতাকে? মানুষে মানুষে বিভাজন কেন হয়েছে সেটা ভেবে দেখেছেন কখনো? কেন আজ এই দেশেরই এক নাগরিক আরেক নাগরিককে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করছে, কুপিয়ে মেরে ফেলছে, ভেবে দেখেছেন? কেন আজ জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে তা ভেবেছেন? না, আমরা কেউই তা ভাবি না। আমরা নিজেদের বিভাজিত করতেই ব্যস্ত।

মানুষ ধর্ম নিয়ে জন্মায় না। তাই শিশুদের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। কিন্তু এরপরই আমরা তাদের ধর্মের নামে, জাত-পাতের নামে, বংশের নামে আলাদা আলাদা পরিচয়ের গণ্ডির সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমরাই তাদের শেখাই “ওরা এই, ওরা সেই। ওরা আমাদের সম্প্রদায়ের না”। আর এভাবেই শিশুরা হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বলি। নাস্তিক, আস্তিক, কাফের, মালাউন নামক জঘন্য শব্দের সাথে পরিচিত হতে থাকে তারা। মাঝখানে হারিয়ে যায় তাদের ‘মানুষ’ পরিচয়। এই শিশুরাই বড় হয়ে মন্দির ভাঙছে, বৌদ্ধ মঠ জ্বালাচ্ছে, মসজিদে বোমা ফাটাচ্ছে, অনুভূতির নামে মানুষ খুন করছে, নির্যাতন করে দেশ ছাড়া করছে এই দেশেরই নাগরিকদের, জঙ্গি হচ্ছে। এরাই এখন আজানের সময় উলুধ্বনি বন্ধ রাখতে বলে, ওয়াজের নামে বিধর্মীদের গালি দেয়।

আজ আমরা যদি মানুষকে মানুষ ভাবতাম, যদি মানুষে মানুষে বিভেদ না করতাম, কাফের-নাস্তিক-বিধর্মী না ভেবে যদি মানুষ ভাবতাম তাহলে কি মানুষে মানুষে হানাহানি হতো? গাজা, ইরাক, আফগানিস্তানে কি আজ রক্তপাত হতো? মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন হোক আর চট্টগ্রামে বৌদ্ধ নির্যাতনই হোক, দুটোই অমানবিক। উভয়দিকেই সভ্যতার পরাজয় হয়েছে। উভয় জায়গাতেই মরেছে মানুষ। রোহিঙ্গাদের জন্য যদি আমরা মানবিক হতে পারি তাহলে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের জন্য কেন পারি না? এরা সবাই-ই তো মানুষ।

আমি সাম্প্রদায়িকতা চাই না। চাই না সাম্প্রদায়িক বিভাজন। চাই না ধর্মের নামে আর কোন মানুষ হত্যা হোক। আমি জানি “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”। আসুন না আরেকটু মানবিক হই। বিভেদ ভুলে মানুষ পরিচয়েই বড় করে তুলি আমাদের শিশুদের। আমাদের বিভাজনে যেন মানব সভ্যতা লজ্জা না পায়, সেইদিকে সচেষ্ট হই। আমরা যেন বলতে পারি, ‘ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু’।

লেখক: দেবজ্যোতি দেবু

(Published as part of social media campaign #BeHumaneFirst to promote Secularism in Bangladesh)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 37
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

লেখাটি ২০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.