১৮ হাজার মাদ্রাসা এবং আপনার উজ্জ্বল অনুভূতি

0

সামিনা আখতার:

ধর্ষণের পর হুজুর সাহেব কোরান শরীফ ছুঁইয়ে শপথ করাতেন, যাতে কাউকে সেকথা না বলে। আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি, এই অত্যন্ত নগণ্য হুজুর কী করে দেশের তো বটেই, এই উপমহাদেশের বড় বড় রাজনীতিবিদদের মতো এমন ধড়িবাজ হতে পারলেন! এই জঘন্য অপরাধের পর এই গ্রন্থ ব্যবহার করার অর্থ হলো ঐ ধর্ম আর গ্রন্থের প্রতি তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, কিন্তু সব করে যাচ্ছিলেন নিজের লালসাকে চরিতার্থ করার জন্য।

হ্যাঁ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনীতি নামক ব্যবসাটিতে তো এখন ধর্ম নামক উপাদানটি বেশ জমজমাটভাবে কাজ করছে। এই রাজনীতিবিদদের অনেকেই নিজে ওই ধর্ম কতটুকু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, অথবা করেন না, তার প্রমাণ ভালোভাবে না মিললেও ভোটের রাজনীতির এই দুনিয়ায় তারা ধর্ম নামক ঔষধটি যে ভালোভাবে প্রয়োগ করেন, তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেত্রী সুনীতা তার নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, মুসলিমদের জন্য একটাই সমাধান রয়েছে। হিন্দু ভাইদের ১০ জন করে দল তৈরি করে মুসলিম মা-বোনদের প্রকাশ্য রাস্তায় গণধর্ষণ করা উচিত। কোন রাজনীতিবিদ কতোটা সাম্প্রদায়িক, কতোটা অমানবিক হলে এমন কথা বলতে পারে, সেটি কি চিন্তা করা যায়?

তবে আপনি আমি যতটা অবাক হই, এই মানুষগুলো কিন্তু এইসব কাজ যে না জেনে না বুঝে করে তা কিন্তু নয়। সুনীতা নামক এই ভয়ঙ্কর মানুষটি এই কথা হঠাৎ করে বলেনি। তার এই কথার পিছনে আছে বিশাল রাজনৈতিক হিসাব। সে ভালো করেই অংক কষে নিয়েছে কোন কথায় ঠিক কতো সংখ্যক লোককে খুশি করা যায়! আর যত সংখ্যক খুশি তত সংখ্যায় ভোট। আর ভোট মানেই তো ক্ষমতা!

কয়েকদিন ধরে ফেসবুক জুড়ে বাংলাদেশে ধর্ষণের খবরের সংখ্যা আর ভয়াবহতায় আমরা বোধ করি একরকম ট্রমাটাইজড (Traumatized) হয়ে গেছি। এই ধর্ষণের খবরের একটা বিরাট অংশ ঘটেছে মাদ্রাসাগুলোতে। এই ধর্ষণের ঘটনাগুলো ছাড়াও মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নির্যাতনের সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও থেকে বোঝা যায় মাদ্রাসাগুলো এক একটা বন্দিশালা। যেখানে নির্যাতনের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়।

এখন প্রশ্ন কি করা যায় না যে, যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমে ধর্মের মতো প্রশ্নহীন বিশ্বাসকে তৈরি করা হয়, সেখানে কয়টি শিশুর সাহস হবে ভিতরের ঘটনাগুলোকে ফাঁস করে দেয়ার!

নুসরাতের মতো মারাত্মক সাহসী কিন্তু সবাই হয় না। আর তাছাড়া আমার তো মনে হয় এক নুসরাতের বীরের মতো মৃত্যুবরণের গল্প অনেকের মনেই সাহস জুগিয়েছে। যার ফলাফল পর পর অনেকগুলো একইরকম ঘটনার প্রকাশ।

কিন্তু বাকি যে মাদ্রাসাগুলতে হাজার হাজার শিশু আছে, তারা কেমন আছে? কতজন ভয়ে এইসব নির্যাতন নিরবে সহ্য করে যাচ্ছে তার কোনো খোঁজ কি সরকারের কাছে আছে? আমরা জানি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাতেই এর শিক্ষাপদ্ধতি, গুণগত মান, পরীক্ষা পদ্ধতি ইত্যাদিতে আকাঙ্খিত পর্যায়ে উঠতে পারেনি। সেখানে মাদ্রাসাসহ এই পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার মনিটরিং এর কোন ব্যবস্থাই যে নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ, মাদ্রাসাগুলোকে শিক্ষার নামে শিশু নির্যাতনের অবাধ কসাইখানা করে রাখার পরও নতুন করে ১৮ হাজার মাদ্রাসা করা হচ্ছে। আমি যদি প্রশ্ন করি এই মাদ্রাসাগুলোতে কারা পড়বে? আমাদের সরকার ও রাজনীতির উচ্চ পর্যায়ে যারা আছেন, যারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা কি নিজের সন্তান এমনকি নিকট আত্মীয়স্বজনের জন্যও এইসব মাদ্রাসায় পড়ার সুপারিশ করবেন?

আমরা সবাই জানি, তারা তা করবেন না! তাদের জন্য থাকবে দেশের সবচাইতে ব্যয়বহুল স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে দেশেও কুলায় না, তারা উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়বে।

আমাদের দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল ছিল, এখনও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন দলের দুর্বলতার নানা দিকের কারণে তাদেরকে, তাদের সমর্থকদেরকে ফেসবুকের পাতায় বেশ সরব দেখা যায়। কিন্তু তারাও এই মাদ্রাসার ব্যাপারে ‘টুঁ’ শব্দটি করেন না। করবেন কেন, কারণ হিসাব তো একই রকম, সহজ সরল!এইসব বলে অসংখ্য ভোটারের অনুভূতিতে আঘাত করবেন, তাতে তো ভবিষ্যত খারাপ হবে, তাই না!

লেখক: সামিনা আখতার

আচ্ছা, একবার ভেবে বলুন তো, আপনার অনুভূতি আর এই মানুষগুলোর অনুভূতির মধ্যে এতো পার্থক্য কেন? ফেসবুকের পাতায় কুসুম কুসুম ধর্মানুভূতি দেখালেও নিজের সন্তানের জন্য তো সেই ইহুদি-নাসারাদের ভাষা ইংরেজি মাধ্যমই খুঁজেন! বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ানো আর ভালো ফলাফলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। স্বপ্ন দেখেন আপনার সন্তান মহাকাশ বিজ্ঞানের ঠিক কোন বিষয়ে, পৃথিবীর কোন প্রতিষ্ঠানে পড়লে, আধুনিক বিশ্বে তার মানসম্মান হীরে পান্নার মতো জ্বলজল করবে। আপনার অনুভূতি এক্ষেত্রে চমৎকার!

এই মাদ্রাসাগুলোতে পড়বে বেশিরভাগই একটা শ্রেণির মানুষের সন্তানেরা, যারা সন্তানের শিক্ষার চাইতে নিজের পরকালকে ঠিক রাখার উদ্দেশ্যেই তাদেরকে মাদ্রাসায় পাঠাবেন। এছাড়াও অন্যান্য মৌলিক অধিকার যেমন খাদ্য, চিকিৎসা ইত্যদির জন্যও মূলত সৃষ্টিকর্তার উপরেই নির্ভরশীল থাকবেন চিরকাল।

কোনদিন মাথা উঁচু করে প্রশ্ন করবেন না, জানতে চাইবেন না যে, আমার এই সমস্ত অধিকার বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের। ধর্মীয় আবেগ তাদের এই প্রশ্ন করতে দেবে না যে আপনাদের সন্তানেরা হবে প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী, চাকরি করবে নাসার মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে, আর আমাদের সন্তানেরা ভবিষ্যতে কী করবে?

বর্তমান আধুনিক বিশ্বের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে যেখানে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি, সেখানে ঐসব দরিদ্র (বেশিরভাগই) মুসলিম পরিবারের সন্তানেরা পিছিয়ে থাকবে, তাতে রাষ্ট্র বা সরকারের কোন মাথাব্যথা থাকবে না। থাকবেই বা কেন! কারণ এই রাষ্ট্র আর রাজনীতিবিদ্গণ ভালো করেই জানেন কত সংখ্যক মানুষকে খুশি করতে হলে কী করা প্রয়োজন, আর তাতে ভোটের পাল্লা ঠিক কতটুকু ভারি হতে পারে!

শেয়ার করুন:
  • 234
  •  
  •  
  •  
  •  
    234
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.