যৌন নির্যাতন, হয়রানি থেকে শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি

লিপিকা তাপসী:

কিছুদিন আগে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম। অংশগ্রহণকারী ছিল ২৫ বছর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ সবমিলিয়ে ২৫ জনের মতো। প্রশিক্ষণের একটি সেশনে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো ছোটবেলায় তারা নিপীড়নের শিকার হয়েছে কিনা। দেখা গেল সবাই কোন না কোনভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের সবাই কম বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে এবং সেগুলো এতোদিন পরেও মনের মধ্যে গেঁথে হয়ে আছে, অস্বস্তি হয়ে আছে। আলোচনার এই অংশ আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে।

যেহেতু যৌন নিপীড়ন বিষয়ে কিছু সামাজিক সংস্কারের কারণে চাইলেই আলোচনা করতে পারা যায় এমন নয়, তাই এর ভয়াবহতাটাও সচরাচর চোখে পড়ে না। কিন্তু একান্ত আলোচনায় বেরিয়ে আসে এর ভয়াবহতা। তবে এর কিছু বিষয় জেনে রাখলে আমাদের সন্তানকে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে আমরা হয়তো রক্ষা করতে পারি।

যৌন নিপীড়ন শধু যে মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে ঘটে তাই নয় ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। তবে মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এর হার বেশিতাই নিজ নিজ পরিবার থেকেই দায়িত্ব নেয়াটা প্রয়োজন, খেয়াল রাখাটা প্রয়োজন, সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

নিজেদেরকেই শিশুকে চেনাতে হবে তার শরীরকে। কথা বলতে হবে খারাপ স্পর্শ, কোন কোন অংশ স্পর্শ করা যাবে, কোন অংশ স্পর্শ করা যাবে না। জানাতে হবে দুইপায়ের মাঝখানে, পিছনে, বুক, ঠোট তার শরীর গোপন অঙ্গ যারা এই জায়গাগুলো স্পর্শ করতে চায় তাদের থেকে দুরে থাকতে হবে। মনে রাখার সুবিধার্থে তিনটি শব্দ তাদেরকে শেখানো যেতে পারে, নো, গো, টেল। 

১. নো (No): না বলো। এধরনের ঘটনাকে না বলবে। শিশুকে না বলতে শেখাতে হবে। 
২ গো (go): সেখান থেকে চলে যাও। যদি এধরনের ঘটনা ঘটে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে আসতে হবে। এধরনের মানুষদের থেকে দুরে থাকতে হবে। 
৩. টেল (tell): বাবা মাকে তৎক্ষণাৎ বিষয়টি জানাও। খেয়াল রাখতে হবে নির্ভয়ে কথাটি যেন শিশু শেয়ার করতে পারে। 

ধরনের ঘটনার জন্যে শিশু যে কোনো ভাবেই দোষী নয় সে বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করতে হবে। শিশু কারও সঙ্গে মিশতে আপত্তি জানালে তার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। একই সাথে তাকে ব্যক্তির সাথে মিশতে জোর করা কোনভাবেই উচিত হবে না। বরং তার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিতে হবে। বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষার জন্যে নিপীড়নকারীর নাগালের বাইরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। নিপীড়নকারীকেও চিনে রাখতে হবে এবং জানাতে হবে যাতে সে এই ঘটনা দ্বিতীয়বার কারও সাথে না করে।

শিশু যাতে বড় হয়ে যৌন নিপীড়নকারীদের একজন না হয় তার শিক্ষাটাও ছোটবেলা থেকে দেয়া প্রয়োজন। এটি যে খারাপ কাজ, একধরনের অপরাধ তার শিক্ষা ছোট বেলা থেকে পেলেই সে আর বড় হয়ে নিপীড়নকারী হবে না।

আমাদের সমাজেপুরুষরা দশঘর মারতে পারে, আর নারীদের শরীরকে রক্ষা করতে হবে, সতী থাকতে হবে আর এধরনের স্পর্শ নারীর সতীত্ব নষ্ট করে’ এই চিন্তা পুরুষকে যেমন নিপীড়ক করে, তাই সে এই কাজ করেও কোন অপরাধ বোধে ভোগে না, স্বদর্পে বন্ধুদের সাথে গল্প বলেআর অন্যদিকে নারী এই ঘটনার স্বীকার হলে গোপন করে যায়, মনে মনে নিজেকে দোষী ভাবে। নিপীড়নকারীর শাস্তি তো হয়ই না, বরং সে বিকৃত আনন্দ নিয়ে বাঁচে, আর নিপীড়নের স্বীকার নারী সারা জীবন মনের মধ্যে অস্বস্তি, অশান্তি নিয়ে বেড়ায়। ঘটনার জন্যে নিজেদেরকে দোষী মনে করে। এর প্রভাব সারা জীবন বয়ে বেড়ায়। তাই এই মিথ ভা্ঙার শিক্ষাটা দেয়াটাও জরুরি।

আপনার পাশে কোনো শিশু নির্যাতিত হতে দেখলে চব্বিশ ঘন্টা চালু থাকা ১০৯ নম্বরে কল করেও সাহায্য নিতে পারেন। উল্লেখ্য এই নম্বরটি নারী নির্যাতনের জন্যেও প্রযোজ্য।

শেয়ার করুন:
  • 255
  •  
  •  
  •  
  •  
    255
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.