অ-নির্যাতিত বিবাহিত নারী শুভেচ্ছা দূতদের বলছি

আলফা আরজু: গতকালের প্রায় প্রতিটি (দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন, টেলিভশন ও রেডিও) সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিরোনাম ছিল, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একটি জরিপ। এই জরিপে দেখা গেছে যে বাংলাদেশে বর্তমানে বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ কোনো না-কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার। এর অর্থ হলো- আমাদের দেশে এখন মাত্র ২০% বিবাহিত নারী আছেন যারা – নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না।

harass-2আমি জরিপের এই সূত্র ধরে একটি সহজ হিসাব মেলালাম। বিবাহিত নারীরা দুইভাগে বিভক্ত – নির্যাতিতা ও অনির্যাতিতা। এর মধ্যে যারা নির্যাতিতা – তাদের একটা দল আছে – যারা মনে করেন – “স্বামী খাবার, কাপড়, থাকার ঠাঁই (ঘর বললে ভুল হবে – ওই ঘরে নারীর কোনো অধিকার নেই!) দিচ্ছে- তাই তাদের মারার অধিকার আছে।” একদল আছেন যারা – “স্বামীর মার খেয়ে প্রতিবাদ করছেন কিন্তু যাবার কোনো জায়গা নেই বলে – স্বামীর ঘরে জ্বলছেন”।

আরেক দল আছেন যারা – নির্যাতিতা, কিন্তু সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই – তাই কোনো নারী যখন এইসব নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন – তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন। অথবা কোনো সংবেদনশীল নারী যখন “নির্যাতিতা নারীর পক্ষে” দাঁড়ান – তাকেও হেয় করেন।

অন্যদিকে যারা “অনির্যাতিতা”, তাদের দেখা পাওয়া খুব কঠিন। উনারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। নির্যাতনের বাইরে যারা আছেন – তাদের উচিত নির্যাতিতাদেরকে “কোচ” করা। কিভাবে নির্যাতনের বাইরে থাকা যায় – তার জন্য টিপস দেয়া আর কি !

আমি যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে নতুন কোন জরিপ করে অথবা অন্য কোন উপায়ে অ-নির্যাতিতাদের বের করতে পারবো না, তাই পরিচিতদের মধ্যে যারা আছেন – তাদের দুই-একটা ঘটনা বলবো।

আমি ঢাকার একটা অসম্ভব ভালো একান্নবর্তী (অনেকটা) পরিবারের কথা বলবো। ওই পরিবারের প্রতিটি মেয়ে স্বামী সংসারে সুখে-শান্তিতে রানী হয়ে আছেন। অন্যদিকে একই পরিবারের ছেলের বউরা আছেন – দুয়োরানী হয়ে। কী করে সম্ভব?

arzu-alpha-edited
আলফা আরজু, সাংবাদিক

হিসাব সহজ, মেয়েরা কেউ শ্বশুরবাড়ি থাকেন না। বিয়ের পরপরই উনারা কোনো এক অজানা জাদুমন্ত্র করে শ্বশুরবাড়ি থেকে স্বামীকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে অথবা আলাদা সংসার পেতেছেন। স্বামী-সন্তান নিয়ে আলাদা সংসারে উনারা কোনো প্রকার ঝুট-ঝামেলা (শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-জা, ননদ সাথে উনাদের ছেলেপুলে!) ছাড়াই থাকেন। ইচ্ছেমতো ছড়ি নাড়েন – ভাই-বৌদের উপর। ভাইবৌ-রা কে, কী করবে, কোন কাপড় পরবেন, কোথায় যাবেন (নিজের বাপের বাড়ি পর্যন্ত!), স্বামীদের সাথে কখন দেখা করবেন – সময় সময় সেটাও ঠিক করেন। উনারা কিন্তু প্রগতিশীল ! খুব অধিকার সচেতন (শুধু নিজেরটা!) ও শিক্ষিত। বেশিরভাগই দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত।

ভুল করেও ভাববেন না যে এই বাড়ির ছেলের বউগুলো খারাপ ও অশিক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রীও আছে। বাবার পরিবারও ভালো। কিন্তু কোথায় যেন তারছেঁড়া সম্পর্কগুলো। তাই উনারা – শ্বশুড় বাড়িতে যারপর নাই অপদস্থ হয়েও থেকে গেছেন। দেবর-ননদদের লালন-পালন শেষে এখন নিজের সন্তান-পালন করছেন। সকল অসম্মান মাথায় নিয়ে। উনাদের অবস্থা দেখে ভয়ে কোনোদিন জিজ্ঞ্যেস করা হয়নি – এতোকিছুর পরও কীভাবে আছেন?

কারণ উনারা সবাই হার মেনেছেন – বিয়ের সাথে সাথে।

তারা খুব ভালো – কেউ কেউ গত ২৫-৩০ বছর সংসার করছেন। দাদী-নানী শাশুড়ী উনাদের হাতে সেবা-যত্ন পেয়েছেন। শয্যাশায়ী রোগীর সেবা যারা করেছেন – তারামাত্রই জানেন – কী কী করতে হয়। শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে – ৮/১০ জন ছোট ছোট দেবর-ননদ পেলেছেন। কেউ সকালে সিদ্ধ আটার রুটি, কেউ অসিদ্ধ, কেউ ডিম ভাজি, কেউ কাঁচা-কুসুমের ওমলেট, আবার কেউ একজন সুজির হালুয়া (কতভাবে যে এই বাড়ির বৌগুলো হালুয়া হয়েছেন – দিনশেষে এখনো – শুনতে হয় – সময়ে অসময়ে !)

অবাক হয়ে দেখেছি ও শুনেছি – এই বাড়ির হাজারো অসঙ্গতি। মেয়েরা যা করবে – সেটা ছেলের বউরা করতে পারবে না। মাঝে মাঝে এটা এমন রুপ নিতো যে – তা নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। ঘরোয়া সালিশ করে – গালমন্দ আবার কেউ কেউ বউ পেটাতে ছোটে যেত! অসহায় বউগুলো! সংসার তো! কোথায়ই বা যাবে। বাবার বাড়ি। সেও তো ফেরার নয়।

আমার এক বন্ধু – মানুষ হিসেবে ওর তুলনা কারোর সাথে করার নয় – এতোটাই ভালো মানুষ ও। প্রায় একটা কথা বলে – ভালো মানুষ হলেই বিবাহিত জীবন ভালো হবে – এটা সত্যি নয়। অন্য কিছু লাগে। আমার প্রশ্ন – অন্য কিছুটা কী, বল।

আমার বন্ধুর অসহায় উত্তর – “জানি না রে”। শুধু বলে – সেই ছোটবেলা থেকে আম্মা বলতো – ভালো করে পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, ভালো মানুষ হতে হবে। এই দুইটা হবার কৌশল ওর শিক্ষক মা শিখিয়েছেন। কিন্তু স্বামী-সংসারে এইসবের কোনো মূল্য আছে কি?

যাই হোক, ইদানিং প্রায় একটা প্রতিবাদ আমাদের পুরুষদের পক্ষ থেকে আসে যে “পুরুষরাও নারীদের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন”। কী জানি, এই যে ২০% অ-নির্যাতিত বিবাহিত নারী আছেন, তারা কি তবে পুরুষদের উল্টো নির্যাতন করেন? যদি সেইরকম হয় – খারাপ না। আমাদের মা-বোনদের ১০০ জনের ৮০ জন নির্যাতিত হচ্ছেন – সেখানে মাত্র ২০ জন নির্যাতন করছেন।

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো এখন থেকে “অ-নির্যাতিত বিবাহিত নারী শুভেচ্ছা দূত” নিয়োগ করতে পারেন ওই ২০% থেকে। এই শুভেচ্ছা দূতরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন – বাকিরা শিক্ষা নিবেন। যেহেতু সমাজের সম্মানিত প্রিয় স্বামী-ভাই-বাবা-মামা-চাচা-ফুফা-খালু-ভাতিজা-ভাগিনারা তাদের বউ পেটানো ও নানাধরনের মানসিক নির্যাতনের অধিকার-চর্চা থেকে বের হতে পারছেন না। আবার একদল নারী কখনো শাশুড়ি কখনো বা ননদ হয়ে এই মারার অধিকারকে শক্তিশালী করেই চলেছেন। তাই একটা রাস্তা বের করার চেষ্টা।

প্রিয় “অ-নির্যাতিত বিবাহিত নারী শুভেচ্ছা দূত”, আপনাদের প্রতি নির্যাতিতা নারীদের পক্ষ থেকে অনুরোধ – আপনারা শিখিয়ে দিন। কীভাবে আপনি আপনার স্বামীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে দিনাতিপাত করছেন! জাদুমন্ত্রটা অসহায় নারীদের কেউ শেখান দয়া করে। ওদেরকেও বাঁচতে দিন। এই নির্যাতনের হাহাকার শেষ হউক।

সত্যি বলছি – আমাদের সমাজে এখন “অ-নির্যাতিত বিবাহিত নারী” উপাধি দেয়া উচিত এবং তাদের শুভেচ্ছা দূত বানিয়ে – বাড়ি বাড়ি পাঠানোর সময় এসে গেছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২০% সেই একান্নবর্তী পরিবারের মেয়েরা যারা অন্যদের নির্যাতিত করেই নিজেকে অ-নির্যাতিত রেখেছেন। নির্যাতন কারীদের মধ্যে কিন্তু মেয়েদের সংখ্যাটা হিসাব করার মতই বটে ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.