ফারিয়া লারা, তোকে ভুলিনি বন্ধু

শান্তা মারিয়া: গ্রিক পুরাণে কুশলী কারিগর ডিডেলাসের তরুণ পুত্র ইকারুস আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল। রাজশাসনে অতিষ্ঠ ও বন্দী ডিডেলাস তার ছেলে ইকারুসকে নিয়ে পালাচ্ছিলেন ক্রিট দ্বীপ থেকে। মোম আর পালক দিয়ে তৈরি পাখায় উড়ে সমুদ্রের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। আকাশে ওড়ার আনন্দে সূর্যের দিকে ক্রমেই আরো বেশি উচুঁতে উড়ছিলেন ইকারুস। একসময় সূর্যের তাপে গলে যেতে থাকে মোম। ইকারুস পড়ে যান সাগরের জলে। মৃত্যু হোক তবু কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্বাধীনতার আনন্দ অনুভব করতে পারেন ইকারুস।

fariya-lara
ফারিয়া লারা

বন্ধু ফারিয়া লারা তুমিও তো আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলে। তুমিও আমাদের ইকারুস।

ফারিয়া লারা আমার শৈশবের বন্ধু। আমরা দুজন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রথম থেকে পাঁচটি ক্লাস কাটিয়েছি পাশাপাশি বসে। আমরা ছিলাম পরষ্পরের সেরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে চারুকলায় শিশুদের ছবি আঁকার ক্লাসে যেতাম। আমরা একসাথে বিটিভিতে প্রোগ্রাম করতাম। নিজেদের টিফিন ভাগ করে খেতাম। রুশদেশের রূপকথা আর ছোটদের গল্পের বইগুলো ভাগাভাগি করে পড়তাম।  ভোরবেলা আমাদের স্কুলের ক্যাম্পাসে শিউলি গাছের নিচ থেকে দুহাত ভরে কুড়িয়ে নিতাম শিউলি ফুল। আমাদের দুজনের জন্মও একই বছরের একই মাসে।

লারার জন্ম ১৯৭০ সালের ১৬ এপ্রিল। মা কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বাবা বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন, বড় বোন লাজিনা মুনা এবং ছোটভাই অনীককে নিয়ে সুন্দর এক শৈশব কাটিয়েছে লারা।

ফারিয়া লারা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক। ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করা মেধাবী লারা আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতো ছোটবেলা থেকেই। ও নতুন কুঁড়িতে পুরস্কার পেয়েছে। শংকর পুরস্কার পেয়েছে। কোরিয়ান চিলড্রেন সেন্টার পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে লারা প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স পায়। ১৯৯৮ সালে পায় বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স। ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক পাইলট হয়। ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ফারিয়া লারার।

ওর জীবন মাত্র ২৮ বছরের। কিন্তু এই ২৮ বছরেই ও পেয়েছে সাফল্য, কৃতিত্ব। এই ২৮ বছরেই ও উদাহরণ হয়েছে অন্য অনেক মানুষের জীবনে। কোনো কোনো নক্ষত্র জ্বলে উঠেই নিভে যায়। লারা তেমনি এক অকালে নিভে যাওয়া তারা।

শরতের শিউলি ফুলের মতোই ও ঝরে গেছে সৌরভ ছড়িয়ে। কিন্তু শারীরিক মৃত্যু হলেও ফারিয়া লারা অমর। সে অমর তার আকাশে ওড়ার স্বপ্নের ভিতর। সে অমর তার সাহসী জীবনে। সে অমর নারীর পেশা বেছে নেয়ার স্বাধীনতার ভিতর। সে অমর প্রথম নারী বিমান প্রশিক্ষক হওয়ার ইতিহাসের ভিতর।

ফারিয়া লারা মিশে আছে বাংলার শারদীয় প্রকৃতিতে, নীল আকাশে, সাদা মেঘের ভেলায়, পূজার আগমনী গানে।

লারার শেষ কথা ছিল ‘আমি আর কয়েক মিনিট বেঁচে আছি পৃথিবীতে’। না রে। তুই ভুল বলেছিলি। তুই বেঁচে আছিস অনন্তকাল ধরে। তুই বেঁচে আছিস আমাদের সকলের স্বাধীন জীবনের স্বপ্নে। আমার বয়স বাড়ছে। কিন্তু তুই আমার শৈশবের সমস্ত মুগ্ধতা নিয়ে আজও থমকে আছিস চির তারুণ্যে। তোর জীবন মাত্র ২৮ বছরের। কিন্তু সেই ২৮টি বছর তুই মানুষের মতোই বেঁচেছিস।

লারা, তোকে ভুলিনি বন্ধু। আমরা কেউ তোকে ভুলিনি। কোনোদিন ভুলব না। তোকে ভুলবে না বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.