মা-বাবাদের বলি, সন্তানকে বুঝতে শিখুন

সুরাইয়া আবেদীন: কিছু কিছু মেয়ের mental maturity একটু দেরিতে আসে। আমি ঐ দলভুক্ত। একবার স্কুলে এক মেয়ে অনেকদিন পর আসলো। ক্লাসের আপারা জানলো, তার খুব ক্লোজ কেউ মারা গেছে। তাই আসতে পারেনি। কিন্তু আমরা যারা ইনার সার্কেলে তারা জানলাম তার ‘অ্যাবরশন’ হয়েছে।

suraiya-2
সুরাইয়া আবেদীন

”অ্যাবরশন” শব্দটা ঐ আমার প্রথম শোনা।  
যেই সময়ের কথা বলছি তখন পরিস্থিতি এখনকার মতো এতো খোলামেলা ছিল না।
কিছু হলেই আমরা এখন গুগল করি, ঐ সময় নেট তো এভেইলেবলই না, তার উপর আমার পরিবার খুবই রক্ষণশীল। তাই এগুলো নিয়ে জানার প্রশ্নই আসে না।  

‘অ্যাবরশন” নিয়ে সমবয়সীদের জ্ঞানের বহর দেখে আমি খুব হতাশ হলাম। আমি কিছুই জানি না! হায়  হায়! আমার কি হবে…  কিন্তু ভাব নিলাম আমিও খুব বুঝতেসি… (saving face আরকি), বাসায় খুব চিন্তা নিয়ে ফিরলাম।

আম্মু আমার ছায়া দেখলে বুঝে ফেলে, আর এতো চিন্তা নিয়ে খাবার টেবিলে খাচ্ছি তা দেখবে না? আম্মু জিজ্ঞেস করলো- কী হইসে?
আমি: মা, ”অ্যাবরশন” কী?
আম্মু: কিছুক্ষণ চুপ থেকে ‘কই শুনলা?’
আমি: পুরা ঘটনা বর্ণনা করলাম।
আম্মু: মা, এটা একটা অপারেশন। মেয়েদের হয়, এরকমই কিছু। আর এগুলো বড়দের আলাপ। যে বলছে তার সাথে কাল থেকে আর এগুলো নিয়ে আলাপ করবা না। কাল কোনো গল্পের বই নিয়ে যেও, এসব আলাপ শুরু হলে বই পড়বা। একটা সময় আসবে যখন নিজেই বুঝবা এগুলো…। আমাকে কথা দাও- এগুলা নিয়ে আর কথা বলবা না মা।

আমি: ওকে আম্মু।
আম্মু কী করলো?
আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করলো, প্লাস এমনভাবে আমাকে বুঝালো যাতে আমার শিশুমন এ নিয়ে আর না ভাবে…অর্থাৎ পজেটিভলি আমার মনোযোগ ঐদিক থেকে সরিয়ে দিল …

এই তো মা…যে সবকিছু জানতে পারবে…যাকে সব বলা যাবে…যে সব গাইড করবে।
৯০ ভাগ মা এই ক্ষেত্রে কী করতো?
– যাও এখান থেকে। পেকে গেছ বেশি?
অথবা
-থাপ্পর খাবা বেয়াদব মেয়ে… নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

বাচ্চাকে দূরে সরিয়ে দিত এসব বলে।
বাচ্চা তখন নিজের থেকে গুগ্লিং করে যা জানতো না তা আরও জানতো।
‘নষ্ট’ (!!) ‘মা’কে জিজ্ঞেস করার আগে ছিল, নাকি ধমক খেয়ে পরে হলো?
আমার এক পরিচিতের মেয়ে স্কুলে পড়ে, দামি ল্যাপটপ, আইপ্যাড কিনে দিসে…স্কুল থেকে এসেই রুমের দরজা বন্ধ…সারাক্ষণ ফোনে আলাপ…
মা কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে, ‘কিছু না, তুমি বুঝবা না’!!!

আই মিন সিরিয়াসলি? মা বুঝবে না? যে তোমাকে দুনিয়া দেখালো সেই তোমাকে বুঝবে না?
এই বাচ্চা কি এভাবে জন্মিয়েছে??
nope…
সে মায়ের থেকে সেই পরিবেশ পায় নাই যে পরিবেশে নির্দ্বিধায় সব শেয়ার করতে পারে।

মায়েদের বলি, বাচ্চাদের পরিবেশ দেন। যাতে সে সব শেয়ার করতে পারে আপনাদের সাথে। সন্তান আপনার।
নয় মাস ভয়াবহ কষ্ট করে যে সন্তানকে দুনিয়াতে আনলেন, কেন সে কিছু আপনার আচরণগত ভুলের কারণে বখে যাবে?? বা ‘তুমি কিছু বুঝবা না’ এমন কিছু বলতে পারবে??

বাবাদের ব্যাপারে কিছু বলার নাই। বাবারা ক্ষেত্র বিশেষে ‘মা’, মা যা হতে পারেন না ‘বাবা’রা অনেক ক্ষেত্রেই তা হোন। কিন্তু এমন বাবা রেয়ার।
কাজেই রেয়ার অনুপাত নিয়ে কথা বলে লাভ নাই…
আমার বাবা কোলে করে আমাকে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে নিয়ে গেছেন, বইমেলায় নিয়ে গেছেন…
কয়জন বাবা বইমেলায় নিয়ে যায় সন্তানকে?
কয়জন বাবা বলেন, ‘মা রেডি হও, বাংলা একাডেমীতে যাব। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার এর বই এর প্রকাশনা হবে। বাপ-বেটী আলোচনা শুনবো’!!
যেসব বাবা এমন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা…
তবে দুঃখজনক হলেও এমন বাবা সংখ্যায় কম, খুব কম…  

চাকরিজীবী মায়েদের কষ্ট আরও বেশি, নিজ মেধা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এসব মায়েরা বাহির ঘর দুই-ই সামলান। কিন্তু তারাও অনেক সময় সন্তানের থেকে দূরে সর যান।
আমার পরিচিত এক ব্যাংকার আনটি মেয়ের বন্ধুদের নামই জানেন না।
মেয়ের সাথে মায়ের আলাপের নমুনা দেখলে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়…
কী ঠাণ্ডা সম্পর্ক!!
উষ্ণতা নাই কোন…
আবেগ নাই।
ভালোবাসা নাই…
যেহেতু মা’ই সন্তানকে নিজ নাড়ি কেটে দুনিয়ার আলো দেখান, কাজেই মায়ের ভূমিকা কোনদিন কেউ পালন করতে পারবে না।
সন্তানের কাছে আইডল হোন।
সন্তান যেন কোনদিন বলতে না পারে ‘মা নিজেই তো যা বলে তা ফলো করেন না, আমাদের বলেন কেন?’

শিশুকাল থেকেই আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এমন একজন হোন যাকে সে নির্দ্বিধায় সব বলতে পারে…শাসন করবেন।
কিন্তু তা যেন সন্তানকে দূরে সরিয়ে না দেয়…সন্তানের বন্ধু হন।

টিন এইজ সময়টা মারাত্মক।
মানসিক-শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে মেয়েরা লজ্জায় থাকে, কাউকে কিছু বলতেও পারে না। নিজে থেকে সিদ্ধান্তও নিতে পারে না।
ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা ছেলেটাকে দেখে এমন অদ্ভুত অনুভূতি হয় যার সাথে সে আগে কখনো পরিচিত ছিল না।
প্রেম কী, কেমন, তা সন্তানকে বুঝান।
মেইক আউট, রুম ডেট, নিজেদের ব্যাক্তিগত মুহূর্ত ক্ষণিকের ঝোঁকে করা ভিডিও যে প্রেম না, জীবন না -তা সন্তানকে ভুল করে ফেলার আগেই শিখিয়ে দেন।
এখানে তো লজ্জার কিছু নাই।
মা আপনি।
সন্তান পৃথিবীর প্রথম সূর্যোদয়, বর্ষা, জ্যোৎস্না দেখেছে আপনার কোলে,
কাজেই প্রেম কী, সেই দীক্ষা কেন আপনার থেকে পাবে না?

প্রেম কী সেই ধারণা সন্তানকে দেবার চাইতে সন্তানের ভিডিও আউট হলে গলায় দড়ি দেয়া আপনার কাছে বেশি সহজ?
জীবন যে ফুলের পাপড়ি ছড়ানো পথ নয়,
প্রেম যে হলিউডের ছবি নয় তা বোঝানোর দায়িত্ব বাবা-মায়ের।
সমবয়সী বন্ধুদের নয়।
আমি দ্বিতীয় কোন ঐশীকে আমাদের সমাজে দেখতে চাই না।
চাই না দ্বিতীয় কোন ফারদিনকে দেখতে, যার কাছে বাবা মায়ের চাইতে বাইক বেশি আপন মনে হয়েছে।
শুধু চাই বাবা-মা হোক সন্তানের সবচে বড় বন্ধু।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.